আরবরা ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলে টারজান বাঁদর-গোরিলাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, আমি আবার বাঁদর-গোরিলাদের রাজ্যে ফিরে এসেছি। আমার সঙ্গে চল তোমরা। আরবদের হাত থেকে মেয়েটাকে উদ্ধার করতে হবে।
বাঁদর-গোরিলারা বলল, এখন আমরা পূর্ব দিকে শিকার করতে যাব। দিনকতক পরে শিকার থেকে এসে আরব শিবিরে যাব।
তখন টারজান চুলুক ও তাগলৎ নামে দু’জন বাঁদর-গোরিলা নিয়ে আরব শিবিরের দিকে রওনা হয়ে পড়ল।
শিবিরের কাছে গিয়ে টারজান দেখল একজন আরব অশ্বারোহী শিবির থেকে বেরিয়ে এই দিকেই আসছে। টারজান ঠিক করল আরবটাকে মেরে পোশাকটা নিয়ে নেবে।
আরবটা ঘোড়ায় চেপে গাছটার তলায় আসতেই আচমকা গাছ থেকে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজান। তারপর আরবটার গলাটা দু’হাত দিয়ে টিপে তাকে বধ করল। তার পোশাকটা ছাড়িয়ে নিয়ে। আবার গাছে উঠে পড়ল টারজান।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখল আরবদের পোশাক পরা দু’জন কৃষ্ণকায় লোক গাছের তলা দিয়ে শিবিরের দিকে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই টারজান ঐ দু’জন নিগ্রোকেও হত্যা করে তাদের আরবী পোশকগুলো খুলে নিল। গাছের উপর উঠে তারা তিনজনেই তিনটে আরবী পোশাক পরল।
তারপর সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলে টারজান তার সঙ্গীদের নিয়ে শিবিরের গেটের কাছে গিয়ে হাজির হলো। তারা যখন বাতাসে গন্ধ শুঁকে বুঝল জেন সেই ঘরটাতেই বন্দী অবস্থায় আছে তখন তারা আগে সেখানে না গিয়ে আচমেত জেকের তাবুটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারা শুনতে পেল ভিতরে। আচমেত তার সহকারীদের সঙ্গে কথা বলছে।
টারজনের সঙ্গে চুলুক তাঁবুর ভিতরে ঢুকলেও তাগলাৎ তাদের সঙ্গে গেল না। সে একা চলে গেল জেন যে কুঁড়েটাতে বন্দিনী অবস্থায় ছিল সেইখানে। দেখল একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা হাত পা বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছে মেঝের উপর। অন্ধকারে ঘরের মধ্যে কিছু দেখা না গেলেও সে দেখতে পাচ্ছিল। জেন দেখল আরবী পোশাক পরা একটা লোক তাকে তার কাঁধের উপর তুলে নিল। পোশাকটায় তার সর্বাঙ্গ ঢাকা ছিল বলে সে তাকে চিনতে পারল না।
বাকি রাতটা গাছেই কাটাল টারজান। সকালে দেখল একদল সশস্ত্র অশ্বারোহী সেই গাছটার তলায়। বনপথটা ধরে কোথায় যাচ্ছে। সেই দলের সামনেই পলাতক ওয়ারপারও একটা ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছিল। টারজান তাকে দেখেই চিনতে পারল।
দলটা চলে যেতে টারজান তাদের অনুসরণ করতে লাগল গাছের উপর দিয়ে। কারণ সে বুঝল ঐ সশস্ত্র সেনাদলের ভিতর থেকে পলাতক ওয়ারপারকে ছিনিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
দু’দিন ক্রমাগত এইভাবে যাওয়ার পর ওরা একটা ফাঁকা সমতল ভূমিতে এসে পৌঁছল। জায়গাটা টারজনের অনেক দিনের চেনা চেনা মনে হলো। কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু মনে করতে পারল না। সে দেখল অশ্বারোহী সেনাদলটা একটা ভাঙ্গা বাড়ির পাশে একটা জায়গার মাটি খুঁড়ে অনেকগুলো হলুদ রঙের এক। ধাতুর তাল বার করল। ঝোপের আড়ালে বসে সবকিছু দেখতে লাগল টারজান।
আবদুল মুরাকের আবিসিনীয় সৈন্যরা সোনার তালগুলো নিয়ে যেমনি ঘোড়ায় উঠতে যাবে এমন সময় আচমেত জেক একদল আরব অশ্বারোহী ঘোড়া ছুটিয়ে সেদিকে আসতে দেখা গেল। ওয়ারপার ভয় পেয়ে মুরাককে বলল, আরবরা এই সোনা নেবার জন্য আসছে।
মুরাক তার লোকদের ঘোড়ায় চেপে লড়াই-এর জন্য প্রস্তুত হতে বলল।
আচমেত জেক ওয়ারপারকে দেখেই সব বুঝতে পারল। আচমেত জেক সবাইকে ছেড়ে ওয়ারপার এর দিকে ছুটে গেল। ওয়ারপার বেগতিক দেখে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল।
এক সময় লড়াই করতে করতে টারজান যে ঝোপের ধারে লুকিয়ে ছিল সেই ঝোপের কাছে এক আবিসিনীয় সৈন্য ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে টারজান সেই ঘোড়াটার উপর লাফ দিয়ে উঠেই ঘোড়াটা তীর বেগে ছুটিয়ে বনের দিকে চলে গেল।
এদিকে দেখতে দেখতে সব আবিসিনীয় সৈন্যরা মারা গেল। আরবরা ঠিক করল সোনাগুলোকে এইখানে রেখে তারা আচমেতের খোঁজে বনে যাবে। পরে তার দেখা পেলে এগুলো এসে নিয়ে যাবে।
আরবরা সোনার তালগুলো মাটির উপর সেইখানে রেখে চলে যেতে নদীর ধারে লুকিয়ে থাকা একদল নিগ্রো যোদ্ধা সেখান থেকে উঠে এল ধীরে ধীরে।
ওয়ারপার পিছন ফিরে যখন দেখল আচমেত নিজে তাকে ধরতে আসছে। তখন সে ঘোড়াটার। গতিবেগ আরো বাড়িয়ে দিল। কিন্তু সরু বনপথে ঘোড়াটা ছুটতে পারছিল না ভালভাবে। এক সময় পথের ধারে একটা গাছের ডালে পড়ে গেল ওয়ারপারের ঘোড়াটা। এদিকে আচমেত তার অনেক কাছে। চলে এসে ওয়ারপারকে লক্ষ্য করে গুলি করতে গেল।
তখন ওয়ারপার আচমেত জেককে বলল, শোন আচমেত জেক, এই মারামারিতে আমাদের মধ্যে কার মৃত্যু হবে তা কেউ বলতে পারে না। তুমি ত আমার মুক্তার থলিটা চাও। সুতরাং এটা আমি আমার ঘোড়ার উপর রেখে দিয়ে চলে যাচ্ছি। আমি এই মুক্তার বিনিময়ে শুধু আমার মুক্তি চাই। তুমি এত রাজী হলে তোমার রাইফেলটা তোমার ঘোড়র উপর রেখে এসে নিয়ে যাও এটা।
এই বলে তার থলিটা ঘোড়ার উপর রেখ চলে গেল ওয়ারপার।
আচমেত জেক থলিটা খুলে দেখল তাতে মুক্তা নেই, আছ শুধু কতকগুলো নদীর ধারে পাওয়া ছোট ছোট পাথর। সেগুলো রেগে ফেলে দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল আচমেত।
বনের মধ্য তাগলাৎ যখন অচেতন জেনের হাত পায়ের বাধন খুলছিল তখন একটা সিংহ তার খুব কাছ থেকে গজন করে উঠল সহসা। তাগলাৎ দেখল সিংহটা তার উপর ঝাঁপ দেবার জন্য তৈরি হচ্ছে। সে দেখল পালাবার আর উপায় নেই। তাই সে সিংহটার আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে রইল। সিংহটা তাগলাতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই তাগলাৎ তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে সিংহটার কেশর ধরে তার গায়ের বিভিন্ন জায়গায় দাঁতগুলো বসিয়ে দিতে লাগল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠল না। সিংহটা তার পেটের মধ্যে দাঁত বসিয়ে নাড়ীভুড়ি বার করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাগলাৎ মারা গেল।
