লেডী জেন চলে যেতে ওয়ারপারের আশা নির্মূল হয়ে গেল। সে ভেবেছিল লেডী জনের মত এক সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ মহিলা কাছে থাকলে পূর্ব উপকূলভাগে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর সাহায্যে পূর্ব ইউরোপে চলে যাবে।
যাই হোক, ঘর থেকে বেরিয়ে ওয়ারপার বনে যাবার পথ ধরল। তারপর বনে গিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
ওয়ারপার যেতে যেতে এক সময় পিছন ফিরে দেখল একজন আরব অশ্বারোহী তার খোঁজ করতে আসছে। আরবটাকে দেখেই একটা গাছের উপর উঠে ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
পথের ধারে যে গাছটার উপর বসে ছিল ওয়ারপার সে গাছটার উল্টো দিকে দেখল ঝোপের ধারে একটা সিংহ শিকারের আশায় ওৎ পেতে বসে আছে। কিন্তু হঠাৎ একজন অশ্বারোহী কাছে এসে পড়ায় তার নজর পড়ল সেই অশ্বারোহী আরবটার উপর।
সিংহটা আরবটার উপর লাফ দিতেই ঘোড়াটা লাফিয়ে ওয়ারপারের কাছাকাছি চলে এল। ওয়ারপার তখন সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটার শূন্য পিঠে উঠে তীরবেগে ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে চলে গেল।
এদিকে যে পথে মুগাম্বি আর ওয়ারপার যাচ্ছিল সেই পথের ধারে এক জায়গায় আবদুল মুরাকের নেতৃত্বে একদল আবিসিনীয় সৈন্য শিবির খাঁটিয়ে বিশ্রাম করছিল। ওয়ারপার না জেনে ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা সেই শিবিরে গিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে বন্দী করে শিবিরে রেখে দেয়া হলো।
আবিসিনীয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় মেনেলেক নামে যে সম্রাট ছিল আবদুল মুরাক ছিল তারই অধীনস্থ এক সামরিক অফিসার। আচমেত জেক মাস দুয়েক আগে মেনেলেকের রাজ্যে তার আদেশ অমান্য করে ক্রীতদাস ধরতে গিয়েছিল বলে তাকে ধরার জন্য মুরাকের অধীনে একদল সৈন্য পাঠিয়ে দেয় মেনেলেক।
ওয়ারপার বন্দী হবার পর মুগাম্বি শিবিরের কাছাকাছি বনের ভিতরে এক জায়গায় লেডী’ ‘লেডী’ বলে চীৎকার করে উঠতেই কয়েকজন সৈনিক তার ডাক শুনে তাকে ধরে নিয়ে আসে, মুগাম্বি মুরাককে বলে সে এক স্থানীয় আদিবাসী এবং শিকারের জন্য বনে এসেছে। সুতরাং ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু মুরাক দেখল মুগাম্বির মত এক শক্ত সমর্থ নিগ্রোকে ধরে নিয়ে গিয়ে সম্রাটের হাতে তুলে দিলে সে খুশি হবে তার উপর। এই ভেবে মুগাম্বিকেও বন্দী করে রেখে দেবার হুকুম দিল। মুগাম্বি ওয়ারপারকে দেখে তাকে মঁসিয়ে ফ্ৰেকুল হিসেবে চিনতে পারল। কিন্তু কোন কথা বলল না।
এদিকে ওয়ারপার যখন কথায় কথায় মুরাকের মুখ থেকে জানতে পারল আচমেত জেক তাদের শত্রু তখন সে বলল, সে আফ্রিকার জঙ্গলে শিকারে এসেছিল দলবল নিয়ে। কিন্তু পথে আচমতে জেকের লোকেরা তার দলের লোকদের অনেককে হত্যা করে বাকি লোকদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে।
তবু ওকে ছাড়ল না মুরাক। ওয়ারপার মুরাককে বলল, আচমেত জেকের কাছে অনেক আরব সৈন্য আছে আর সে তার সেনাদল নিয়ে এই দিকেই আসছে। সেকথা শুনে মুরাক তার লোকদের পরদিন সকালেই শিবির গুটিয়ে দেশে রওনা হতে হুকুম দিল। সঙ্গে ওয়ারপার আর মুগাম্বিকেই বন্দী অবস্থায় নিয়ে যাবে ঠিক করল।
পরদিন সকালে রওনা হবার সময় মুরাক দেখল তার শিবির থেকে গতরাতে পালিয়ে গেছে মুগাম্বি। ওয়ারপার তার পকেটে হাত দিয়ে দেখল তার মুক্তার থলিটা ঠিকই আছে।
আচমেত জেক তার দু’জন সহচরকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ওয়ারপারের খোঁজ করতে করতে বনের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গার ধারে চলে এসেছিল। তার মন মেজাজ মোটেই ভাল ছিল না। ওয়ারপার তাকে ফাঁকি দিয়ে তার চোখে ধুলো দিয়ে চলে গেছে। তার উপর তার মুক্তার থলিটাও নিয়ে গেছে।
জঙ্গলে কিসের একটা খস্ খস্ শব্দ শুনে আচমেত জেক তার সহচরদের একটা ঝোপের আড়ালে লুকোতে বলে নিজেও লুকিয়ে রইল।
সহসা দেখল গাছের আড়াল থেকে এক নারীমুখ বেরিয়ে এল। আচমেত জেক আশ্চর্য হয়ে দেখল এই নারীই তার বন্দিনী যে আজও তার শিবিরে বন্দী অবস্থায় আছে বলে সে একটু আগে ভাবছিল। সে নিজেকে কখন মুক্ত করে পালিয়ে এসেছে বনে তার কিছুই জানে না সে।
হঠাৎ জেন তার পিছনে কিসের শব্দ পেয়ে পিছন ফিরে দেখল একটা বাঁদর-গোরিলা তার পিছু পিছু আসছে। জেন তাই ঘুরে অন্য দিকে পালাবার চেষ্টা করতেই আচমেত জেক আর তার দু’জন সহচর তাকে ধরে ঘোড়ার উপর ওঠাবার চেষ্টা করতে লাগল।
এমন সময় দেখা গেল কোথা থেকে টারজান কতকগুলো বাঁদর-গোরিলাকে সঙ্গে করে সেইদিকে ছুটে আসছে। জেন টারজানকে দেখতে পেয়ে চীৎকার করে বলল, জেন, ঠিক সময়েই এসে পড়েছ।
কিন্তু টারজান তাকে দেখে চিনতে পারল না। তার স্মৃতিবিভ্রম তখনো কাটেনি। তবু তার মনে হলো মুখটা যেন তার কত চেনা এবং তাকে যেমন করেই হোক উদ্ধার করতে হবে।
এই ভেবে আরবদের হাত থেকে জেনকে উদ্ধার করার জন্য তার বাঁদর-গোরিলাদের নিয়ে ছুটে গেল টারজান। কিন্তু আচমেত জেক নিজে টারজানকে লক্ষ্য করে তার রাইফেল থেকে একটা গুলি করে তার সহচরদেরও গুলি করতে বলল। তাদের গুলিতে টারজান পড়ে গেল।
এই অবসরে আরবরা জেনকে ঘোড়ায় চাপিয়ে চলে গেল। তাদের শিবিরে নিয়ে গিয়ে জেনকে এবার সেই কুঁড়ে ঘরটায় হাত পা বেঁধে রেখে দিল। ঘরের দরজায় এবার দু’জন পাহারাদার রাখল।
এদিকে আচমেত জেকের যে সব আরব অনুচরেরা ওয়ারপারকে খুঁজতে গিয়েছিল তারা একে একে ফিরে এল বিফল হয়ে। তারা এসে জানাল ওয়ারপারের কোন খোঁজ পাওয়া গেল না কোথাও। এই খবর শুনে আচমেত জেকের রাগ আরো বেড়ে গেল।
