সন্ধ্যে হতেই লা টারজনের পাশে ছুরি হাতে পায়চারি করতে করতে এক সময় বসে ছুরির তীক্ষ্ণ ডগাটা টারজনের পাঁজরের উপর ঠেকিয়ে অল্প অল্প করে চাপ দিতে লাগল। কিন্তু তাকে মারতে গিয়েও মারতে পারল না।
পরদিন সকালে পুরোহিতদের সমবেত স্তোত্রগানের শব্দ কানে আসতে ঘুম ভেঙ্গে গেল টারজনের। পরে লা-এর ঘুম ভাঙ্গল। ঘুম ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে লা চীৎকার করে তার লোকদের ডাকল, কই, জ্বলন্ত দেবতার পুরোহিতরা এস। বলিদানের জন্য প্রস্তুত হও।
আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অদ্ভুত চেহারার পুরোহিতগুলো লা-এর শিবিরের মধ্যে ঢুকে টারজানকে ধরে বাইরে নিয়ে এল।
ছুরিটা হাতে তুলে এগিয়ে এল লা। টারজান নীরবে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল।
এমন সময় জঙ্গলে একটা হাতির শব্দ শোনা গেল। টারজানও জোরে অদ্ভুতভাবে একটা চীৎকার করল। এবার সবাই দেখল জঙ্গলের ঝোপঝাড় ভেঙ্গে একটা হাতি গর্জন করতে করতে ক্রমশই এগিয়ে আসছে। এবার লা টারজনের মুখপানে তাকিয়ে বুঝতে পারল টারজানই চীৎকার করে হাতিটাকে ডেকেছে এবং তাকে উদ্ধার করার জন্য হাতিটা আসছে।
টারজান বলল, হাতিটা আসছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ও আমাকে উদ্ধার করতে আসছে। কিন্তু এখন ওর ডাক শুনে বুঝেছি ও পাগলা হয়ে গেছে। এখন ও আমাকে বা যাকে পাবে তাকেই মেরে ফেলবে।
লা বুঝল, টারজান ঠিকই বলেছে। সে অসহায়ভাবে পাথরের প্রতিমূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। টারজান বলল, দেখ লা, এখনো সময় আছে, তুমি আমার বাঁধন খুলে দাও। আমি তোমাকে বাঁচাব।
লা দেখল উন্মত্ত হাতিটা ডালপালা ভেঙ্গে ক্রমশই তীব্র বেগে এগিয়ে আসছে।
লা তার পুরোহিতদের বলল, তোমরা সবাই পালাও।
এই কথা বলেই লা টারজনের বাঁধনগুলো সব কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিতরা চীৎকার করে উঠল। তারা সবাই ছুটে এল লা-এর দিকে।
প্রধান পুরোহিত তার হাতের খাড়া উঁচিয়ে লাকে বলল, বিশ্বাসঘাতক, নাস্তিক, অধর্মাচারী বন্দীকে তুমি ছেড়ে দিলে। এর জন্য তোমাকেও মরতে হবে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে লাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এল টারজান। সে প্রধান পুরোহিতের হাত থেকে খাঁড়াটা কেড়ে নিয়ে তাকে শূন্যে তুলে ধরে সজোরে পুরোহিতদের মাঝখানে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
এমন সময় পাগলা হাতিটা সেখানে এসে হাজির হলো। টারজান সঙ্গে সঙ্গে লাকে তুলে নিয়ে শূন্যে লাফ দিয়ে আর একটা গাছে চলে গেল। এইভাবে গাছে গাছে অনেকটা দূরে চলে গেল।
হাতিটা তখন আর কাউকে না পেয়ে চলে গেল।
হাতিটা অনেক দূরে চলে গেলে টারজান লাকে নিয়ে গাছ থেকে নেমে পড়ল। বলল, তোমার পুরোহিতদের ডাক।
লা বলল, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
টারজান বলল, আমি যতক্ষণ আছি কেউ তোমার গায়ে হাত দিতে পারবে না। ওদের ডাক, আমি কথা বলব ওদের সঙ্গে।
লা পুরোহিতদের ডাকতেই তারা টারজনের কাছে এসে দাঁড়াল। টারজান তখন ওদের বলল, তোমাদের প্রধান পূজারিণী লা এখন নিরাপদ। সে আমাকে হত্যা করলে সে বাঁচতে পারত না এবং তোমাদের অনেকেই মারা যেত। আমিই তাকে বাঁচিয়েছি। এবার তাকে নিয়ে তোমরা দেশে ফিরে যাও। আমি আবার জঙ্গলে ফিরে যাব। তাছাড়া তোমরা তোমাদের রানীর আদেশ অবশ্যই মেনে চলবে। তাকে নিয়ে ওপারে চলে যাও। যদি একথায় রাজী না হও তাহলে আমি জঙ্গলের সব জন্তুদের ডাকব। তারা এসে তোমাদের সকলকেই মেরে ফেলবে।
পুরোহিতরা টারজনের কথায় রাজী হয়ে গেল, কারণ তারা সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
ওরা চলে যেতেই টারজান গাছের উপর উঠে দূরে চলে গেল।
ওয়ারপার টারজনের কাছ থেকে পালিয়ে যাবার দুদিন পর মুক্তার থলিটার কথা মনে পড়ল টারজনের। তার মনে পড়ল সেটা সে এক জায়গায় মাটির ভিতর পুঁতে রেখেছে। তখন সেখানে গিয়ে ঠিক সেই জায়গাটা ছুরি দিয়ে খুঁড়ল। কিন্তু থলিটা পেল না টারজান। সে বুঝতে পারল ওয়ারপারই তার থলিটা চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেছে। তাই সে আর অপেক্ষা না করে সোজা পলাতক চোর ওয়ারপারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।
যেতে যেতে এক আরব শিবিরের সন্ধান পেল। টারজান যখন আরবদের শিবিরের কাছে গিয়ে পৌঁছল তখন শিবিরের কাছাকাছি একটা গাছ থেকে বাতাসে গন্ধ শুঁকে বুঝল সে যার খোঁজ করছে সেই ওয়ারপার এই শিবিরেই আছে।
গাছের উপর পাতার আড়ালে বসে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করল টারজান। তারপর যখন রাত গম্ভীর হল, শিবিরে লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেল, তখন গাছ থেকে নেমে পড়ল টারজান।
একটা ঘরের সামনে এসে ওয়ারপারের কিছুটা গন্ধ পেল সে। কিন্তু টারজান তাঁবুর একটা দিক তুলে ভিতরে প্রবেশ করে দেখল ঘরের মধ্যে কেউ নেই।
তখন সেই কুঁড়েটা থেকে বেরিয়ে টারজান শিবির সংলগ্ন আদিবাসীদের বস্তিতে চলে গেল। সেখানে একটা ঘরের কাছে এসে আবার পলাতক ওয়ারপারের কিছুটা গন্ধ পেল সে। গুঁড়ি মেরে ঘরটার মধ্যে ঢুকে দেখল ঘরটার পিছন দিকে একটা লোক বার হবার মত ফাঁক রয়েছে। বুঝল ঐ ফাঁকটা দিয়ে কিছু আগে ওয়ারপার পালিয়ে গেছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে আবার সে গন্ধের সূত্র ধরে ওয়ারপারের খোঁজে এগিয়ে যেতে লাগল।
ওয়ারপার সেদিন রাতে তাঁবু থেকে বেরিয়েই জেন যে কুঁড়েটাতে বন্দী হয়ে ছিল সেই কুঁড়েটার সামনে সোজা চলে যায়। কিন্তু ঘরের ভিতর ঢুকেই ওরপার দেখল সেখানে জেন নেই। ওয়ারপার বুঝল লেডী জেন পালিয়ে গেছে।
