বনের আড়াল থেকে টারজান আর ওয়ারপার দেখল বাংলোর কাছে একটা বড় খাল কেটে সোনার তালগুলো সব পুঁতে রাখল ওয়াজিরিরা। তারপর একটা অস্থায়ী শিবির গড়ে তুলে বিশ্রাম করতে লাগল।
টারজান অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর যখন বুঝল ওয়ারপার সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে রত্নভরা থলিটা রেখে মাটি চাপা দিয়ে দিল। ওয়ারপার তা দেখল।
অনেকক্ষণ পর ওয়ারপার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল টারজান ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন সে তার খড়টা দিয়ে সেই জায়গার মটি খুঁড়ে থলিটা বার করে নিয়ে নিজের পকেটে ভরে রাখল।
ওয়ারপার একবার ভাবল যাবার আগে তার হাতের খটা দিয়ে ঘুমন্ত টারজনের গলাটা কেটে দিয়ে যাবে।
এই ভেবে ঘুমন্ত টারজনের গলার উপরে তুলে ধরল তার হাতের খাটা।
এদিকে মুগাম্বিও আরবদের খোঁজে পথ চলে চলে শিবিরের কাছে এসে দেখে ওয়ারপার ছেঁড়া ময়লা পোশাক পরে হাঁপাতে হাঁপাতে সেই গাছের তলা দিয়ে শিবিরের দিকে যাচ্ছে। প্রথমে সে ওয়ারপারকে দেখেই চিনতে পারে। এই শ্বেতাঙ্গই তাদের মালিক বড় বাওনার বাড়িতে একদিন অতিথি হিসেবে ছিল। তাকে দেখে ডাকতে যাচ্ছিল সে।
কিন্তু মুগাম্বি যখন দেখল ওয়ারপার স্বচ্ছন্দে আরবদের শিবিরে ঢুকে গেল এবং শিবিরে সবাই তাকে চেনে তখন সে বুঝতে পারল আসলে সে বিশ্বাসঘাতক। সে খবর দেয়াতেই বড় বাওনার অনুপস্থিতিতে আরবরা বাংলো আক্রমণ করে তাদের প্রভুপত্নীকে ধরে নিয়ে আসে এবং বাংলো আর খামারটা পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।
আচমেত জেকের তাঁবুতে ওয়ারপার ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল আচমেত। বলল, কি ব্যাপার?
ওয়ারপার টারজনের কাছ থেকে যে মুক্তোর থলিটা চুরি করে আনে তার কথা ছাড়া যা যা ঘটেছিল সব বলল। থলিটা সে সাবধানে লুকিয়ে রেখেছিল। সোনার তালগুলো বাংলোর পাশে ওয়াজিরিরা পুঁতে রেখেছে শুনে আচমেতের লোভ বেড়ে গেল। ওয়ারপার আরো জানাল ওয়াজিরিরা তার শিবির আক্রমণ করতে আসছে।
আচমেত বলল, আগে ওরা আসুক। ওদের সবাইকে হত্যা করার পর সোনাগুলো তুলে আনার কাজ খুবই সহজ হবে।
ওয়ারপার বলল, টারজনের স্ত্রীকে কি করবে?
আচমেত বলল, ওকে উত্তরাঞ্চলের কোন দেশে বিক্রি করে দেব। মোটা দাম পাওয়া যাবে।
ওয়ারপার ভাবল আচমেতকে বলে তার মত করে সে লেডী গ্রেস্টোককে নিয়ে উত্তরের দিকে রওনা হয়ে তার মুক্তির পথ করে নেবে।
সে তাই আচমেতকে বলল, কে তাকে নিয়ে যাবে উত্তর দিকে?
আচমেত জেক ভেবে বলল, তুমিই লেডী গ্রেস্টোককে নিয়ে রওনা হয়ে যাও। আমি নিজে যাব গুপ্তধনের সন্ধানে। আমাদের সকলেরই আপন আপন কাজ হয়ে গেলে এখানেই আবার দেখা হবে।
এক সময় তাঁবুতে কেউ নেই দেখে কোমর থেকে মুক্তোর থলিটা বার করে সেগুলো গুণতে লাগল। ওয়ারপার। এমন সময় দেখল দরজার বাইরে থেকে আচমেত জেক তাকে দেখছে। ওয়ারপার এবার ভয়। পেয়ে গেল। বুঝতে পারল আর তার পরিত্রাণ নেই। আচমেত জেক যখন মুক্তোগুলো দেখতে পেয়েছে তখন সে সেগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করবে তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। তাই রাতের অন্ধকারে শিবির থেকে গোপনে বেরিয়ে গেল ওয়ারপার।
এদিকে গভীর রাতে আচমেত একটা ছুরি নিয়ে ওয়ারপারের তাঁবুতে ঢুকে বারবার বিছানাটার উপর তার ছুরিটা বসাতে লাগল। কিন্তু যখন সে দেখল ওয়ারপার বিছানায় নেই, পালিয়ে গেছে, তখন সে। সবাইকে ডেকে ঘোড়ায় চেপে বেরিয়ে পড়ল ওয়ারপারের খোঁজে।
মুগাম্বি শিবিরের কাছে একটা গাছের উপর পাতার আড়াল থেকে সবকিছু দেখছিল। আরবরা সবাই বেরিয়ে পড়লে গাছ থেকে নেমে শিবিরে গিয়ে তাদের প্রভুপত্নী জেনের খোঁজ করতে লাগল। কিন্তু লেডী জেনকে কোথাও দেখতে পেল না।
ঘুমন্ত টারজনের গলা কাটার জন্য ওয়ারপার উদ্যত হতেই অদূরে একটা সিংহের শব্দ পেয়ে পালিয়ে গেল। ঝোপঝাড় ভেঙ্গে সিংহটা যখন এগিয়ে আসছিল তখন তার শব্দে টারজান জেগে ওঠে ঘুম থেকে।
কিন্তু সিংহটা কি মনে করে পিছন ফিরে বনের মধ্যে ঢুকে গেল। টারজান এবার খেয়াল করে দেখল তার সঙ্গী কাছে নেই। সে একবার ভাবল তার সঙ্গী ওয়ারপার হয়ত সিংহের ভয়ে পালিয়ে গেছে।
পরদিন টারজান যখন একটা গাছের উপর শুয়ে ঘুমোচ্ছিল তখন তারই সন্ধানে ওপার নগরীর মন্দিরের প্রধান পূজারিণী লা পুরোহিতদের এক সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে সেইখানে চলে আসে।
পুরোহিতদের প্রত্যেকেরই হাতে একটা করে ছুরি আর একটা করে খাঁড়া ছিল। লা-এর দলে যে ক’জন বাঁদর-গোরিলা ছিল তাদের মধ্যে একজন বাতাসে গন্ধ শুঁকে বলল, সেই বড় শ্বেতাঙ্গ বাঁদরটা একটা গাছে ঘুমোচ্ছে, আমরা তাকে মেরে ফেলতে পারি।
এই বলে ওরা পা টিপে টিপে বনের ভিতর দিয়ে গিয়ে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দেখল সেই গাছের একটা ডালে টারজান তখনো ঘুমোচ্ছিল। তিনটে বাঁদর-গোরিলা গাছের উপর উঠে গিয়ে টারজানকে ধরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সকলে মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজনের উপর। তখন লা এসে হুকুম করল, ওকে মেরো না, বেঁধে ফেল। তারপর আমার কাছে নিয়ে এস।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল বনভূমিতে। শিবিরের ভিতরে হাত পা বাঁধা অবস্থায় শুয়ে থাকা টারজনের সামনে ছুরি হাতে পায়চারি করতে লাগল লা। লা একবার বড় গলায় টারজানকে বলল, আমাদের দেবতার খড় নিয়ে পালিয়ে এসেছ তুমি। সে খড়া কোথায়? টারজান বলল, আমার সঙ্গে যে লোকটা ছিল সে, তা নিয়ে পালিয়েছে। আমাকে ছেড়ে দিলে আমি তাকে ধরে আনতে পারি এবং খটাকে ফিরিয়ে দিতে পারি। সেকথা শুনে লা হেসে উঠল হো হো করে।
