টারজান দেখল একটা সিংহ মন্দিরের মাঝখানে বেদীর উপর শোয়ানো হাত পা বাঁধা এক হতভাগ্য বন্দীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর মন্দিরের পুরোহিত ও পূজারিণীরা প্রাণ ভয়ে ছোটাছুটি করছে। টারজান দেখল তার সামনে বেদীর ধারে একজন মহিলা পূজারিণী দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে যে প্রধান পূজারিণী লা তার স্মৃতিবিভ্রম ঘটায় সে বুঝতে পারল না।
ওয়ারপার হাত পা বাঁধা অবস্থায় শুয়ে শুয়ে দেখল সিংহটা তার উপর ঝাঁপ দেবার জন্য উদ্যত হয়েছে। টারজানও সঙ্গে সঙ্গে তার বর্শটা সিংহের বুকটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল। সিংহটা গর্জন করতে করতে বর্শার ফলাটা নিয়ে কামড়াকামড়ি করতে করতে তার নতুন শত্ৰু টারজানকে আক্রমণ করল। এবার টারজান সিংহের উপর উঠে তার ঘাড়টা জড়িয়ে ধরে ছুরিটা বার বার তার পাঁজরে বসিয়ে দিতেই সিংহটা লুটিয়ে পড়ল।
ওয়ারপার এবার টারজানকে চিনতে পারল।
টারজান একে একে লা ও ওয়ারপারকে খুঁটিয়ে দেখল। কিন্তু সে কাউকে চিনতে পারল না।
এদিকে প্রধান পূজারিণী লা টারজনের পানে ভাল করে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল, টারজান তুমি? তুমি অবশেষে আমার কাছে ফিরে এসেছ?
টারজান বলল, আমি টারজান? ঠিক আছে নামটা ভালই মনে হচ্ছে। কিন্তু আমি তোমাকে চিনি না। আমি তোমার জন্য এখানে আসিনি। কেন আমি এখানে এসেছি তা আমি জানি না। কোথা থেকে এসেছি তাও জানি না।
ওয়ারপার এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল। বুঝল টারজনের মাথায় আঘাত লাগায় পূর্ব স্মৃতি তার একেবারে লোপ পেয়েছে।
ওয়ারপার তাই টারজনের প্রশ্নের উত্তরে বলল, কোথা থেকে তুমি এসেছ তা ত আমি বলত পারব না। তবে আমি শুধু এইটুকুই বলতে পারি যে এখান থেকে আমরা যদি এখনি বেরিয়ে না যাই তাহলে আমাদের দুজনকেই মরতে হবে।
তখন টারজান ওয়ারপারের বাঁধন কেটে দিয়ে বলল, চল তাহলে আমরা এখনি পালিয়ে যাই।
এই বলে একটা দরজা দিয়ে টারজান বার হতেই প্রতিটা দরজার মুখেই কয়েকজন করে ভয়ঙ্কর চেহারার বেঁটে বেঁটে পুরোহিত পথ আগলে দাঁড়াল। টারজনের সামনে যে লোকটা দাঁড়িয়েছিল পথরোধ করে টারজান তার বর্শা দিয়ে তার মাথায় জোর একটা আঘাত করতে তার মাথাটা ভেঙ্গে গেলে। এরপর যেই কাছে আসতে লাগল টারজান তাকেই বধ করতে লাগল।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর নগরপ্রাচীরের মধ্যে একটা বার হবার পথ পেল টারজান। স্মৃতিবিভ্রমটা তখনো কাটেনি টারজনের। সে কে এবং কোথা থেকে এসেছে, কোথায় তাকে যেতে হবে কিছুই জানে না সে। ওয়ারপর তাকে কোনরকমে বুঝিয়ে বাংলোর পথে নিয়ে যেতে লাগল।
সেদিন রাত্রিতে তাদের ছোট্ট শিবিরে আগুনের আলোয় টারজান তার থলিটা খুলে সেই রত্নগুলো আবার দেখতে লাগল। ওয়ারপর তাকে জিজ্ঞাসা করল সে কোথায় ওগুলো পেয়েছে। টারজান তার উত্তরে বলল, ওপার নগরীর মন্দিরের তলায় একটা ঘরে সে এগুলো পেয়েছে। কিন্তু ওগুলো রংবেরঙের কতকগুলো পাথর ছাড়া আর কিছুই নয়।
ওয়ারপার দেখল টারজান ঐসব রত্নগুলোর দাম জানে না। এ বিষয়ে তার কোন ধারণা নেই। ফলে সেগুলো তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়া সহজ হবে। ওয়ারপার টারজানকে বলল, আমাকে ওগুলো একবার দেখতে দাও।
টারজান তখন সেগুলোর উপর একটা হাত চাপা দিয়ে পশুর মত দাঁত বার করে তেড়ে এল ওয়ারপারকে।
ওয়ারপার ভাবল, সে যেমন করে হোক টারজনের দৃষ্টি এড়িয়ে আচমেত জেকের কাছে চলে যাবে। দুটো কারণে সে যেতে পারছিল না। প্রথম কথা, তার হাতে মাত্র একটা খঙ্গ ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই। এই ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বিনা আগ্নেয়াস্ত্রে পথ চলা অসম্ভব। তাছাড়া মূল্যবান ধাতুগুলো ছেড়ে যেতে মন সরছিল না তার।
ওপার থেকে বার হবার পর তিন দিনের দিন টারজান পথে যেতে যেতে তাদের পিছন দিক থেকে আসতে থাকা কিছু লোকের পায়ের শব্দ শুনতে পেল।
ঝোপের আড়াল থেকে তারা দেখল পঞ্চাশজন কৃষ্ণকায় নিগ্রো দুটো করে হলুদ রঙের সোনার তাল বয়ে নিয়ে আসছে। ওয়ারপর তাদের দেখে বুঝতে পারল এই লোকগুলোকেই টারজনের সঙ্গে ওপার নগরীর পথে যেতে দেখেছে সে। কিন্তু সে দেখল টারজান বাসুলি ও ওয়াজিরিদের চিনতে পারল না।
ওয়ারপার ভাবল, ওয়াজিরিরা ঠিক টারজনের বাংলোর দিকে যাবে এবং সোনার তালগুলো বাংলোর কাছাকাছি কোথাও রাখবে। সেই জায়গাটা ও দেখে নেবে। তাহলে আচমেত জেককে নিয়ে এসে সেই সোনা সহজেই উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারবে।
এইভাবে অনেকক্ষণ ধরে অনুসরণ করে বাংলোটার কাছে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল ওয়ারপার। বাংলোটার এখানে সেখানে কিছু ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না সে। বিরাট খামারবাড়িরও কোন চিহ্ন নেই। সে যেন নিজের চোখকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু টারজান কিছুই চিনতে পারল না।
বাংলোর কাছে গিয়ে তার অবস্থা দেখে বাসুলি আর ওয়াজিরিরাও হতবুদ্ধি হয়ে গেল।
বাসুলি তার লোকদের বলল, আরবরাই নিশ্চয় এ কাজ করেছে।
একজন ওয়াজিরি বলল, আমাদের লেডী কোথায়?
টারজনের স্ত্রী লেডী গ্রেস্টোককে তারা লেডী বলত। বাসুলি বলল, আমাদের মালিকের স্ত্রী ও আমাদের স্ত্রীদের ধরে নিয়ে গেছে আরবরা।
ওয়াজিরিরা তখন প্রতিশোধ বাসনায় উন্মত্ত হয়ে উঠল।
বাসুলি বলল, এখন কাজের সময় বৃথা চীৎকার করে লাভ নেই। এখন কিছু খাওয়ার পর আরবদের সন্ধানে বেরিয়ে যেতে হবে আমাদের। নইলে আমাদের স্ত্রীদেরও উদ্ধার করতে পারব না।
