রাত্রি হতেই টারজান তার দল নিয়ে একটা পাহাড়ে উঠে পাহাড়টার ওপারে চলে গেল।
ওয়ারপার লক্ষ্য করল টারজান একটা খাড়াই উঁচু পাথরের উপর উঠে পড়ল। পরে ওয়ারপার অতি কষ্টে উঠল সেখানে।
ওয়ারপার দেখল বড় পাথরটার ওদিকে কতকগুলো পাথরের সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গিয়ে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মুখ দেখতে পেল।
এদিকে টারজান সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গপথটা ধরে অনেকটা এগিয়ে যাবার পর একটা কাঠের দরজার সামনে এসে হাজির হলো। দরজাটা চাপ দিয়ে খোলার সঙ্গেই সঙ্গে ধনাগারটা পেয়ে গেল সে। টারজান দেখল ঘরটার চারদিকের দেওয়ালে অসংখ্য সোনার তাল সারবন্দীভাবে সাজানো আছে থরে থরে।
টারজান তার লোকদের ডাকার জন্য একবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওয়ারপার তাকে দূর থেকে লক্ষ্য করে অন্ধকারে সরে গেল।
সুড়ঙ্গপথ পার হয়ে পাহাড়টার উপরে উঠে সিংহের গর্জনের মত জোর চীৎকার করে তার ওয়াজিরি লোকদের ডাকল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দূর থেকে ওয়াজিরি সর্দার বাসুলি চীৎকার করে সাড়া দিল তার ডাকে।
টারজান আবার সেই ধনাগারে ফিরে এসে সোনার তালগুলো বয়ে নিয়ে গিয়ে সুড়ঙ্গপথের প্রান্তে সেই পাথরটার উপর রাখল। সে ভাবল বাসুলিয়া এসে পৌঁছবার আগে যতদূর সম্ভব কাজ এগিয়ে রাখবে।
বাসুলি নগর প্রাচীরের ওধারে এসে পড়লে টারজান দড়ি দিয়ে তাদের পাথরের উপর তুলে নিল। তারপর তাদের সকলকেই ধনাগারে নিয়ে গেল। এবার টারজান ওয়াজিরিদের প্রত্যেকের হাতে সোনার তাল দিয়ে শেষ বারের মত ধনাগারটা একবার ভাল করে দেখে নিল। তারপর যে বাতিটা সে হাতে করে এই ঘরে জ্বেলেছিল সে বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
এদিকে টারজান ধনাগার থেকে বার হয়ে সুড়ঙ্গপথে কিছুটা এগোতেই পিছন থেকে অদৃশ্যভাবে ওয়ারপার ধনাগারে ঢুকে সেই সোনার তালগুলোকে আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল।
এমন সময় অকস্মাৎ বজ্রপাতের মত জোর একটা শব্দ হলো। টারজান তখন সুড়ঙ্গপথে যাচ্ছিল। সহসা সেই জোর শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ছাদ ভেঙ্গে একটা পাথর তার মাথার উপর পড়ায় তার মাথার কিছুটা কেটে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে সে অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেল মাটির উপর।
আসলে তখন অল্প সময়ের মধ্যে জোর একটা ভূমিকম্প হয়।
ওয়ারপার প্রথমে টারজনের রেখে যাওয়া মোমবাতিটা জ্বালল। তারপর বাতিটা হাতে ধরে দরজার বাইরে আসতেই দেখল টারজনের অচৈতন্য দেহটা পড়ে রয়েছে সামনে। বাতির আলোতে আরও দেখল ভূমিকম্পের ফলে সুড়ঙ্গপথে অনেক বড় বড় পাথর পড়ে থাকায় পথ একেবারে বন্ধ।
তখন ওয়ারপার নিরুপায় হয়ে ধনাগারের মধ্যে ঢুকে অন্য কোন দরজা আছে কি না তার খোঁজ করতে লাগল। হঠাৎ দেখতে পেল ঘরটার পিছন দিকের দেওয়ালে একটা দরজা আছে। সেই দরজাটা খুলে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ পেল সে। সেই পথে যেতেই সামনে একটা পাঁচিল পেল। পাঁচিলটার ওপারেও এই পথটা নিশ্চয় চলে গেছে। এই ভেবে বাতির আলোয় ওয়ারপার দেওয়ালটা পরীক্ষা করে দেখল পাথরের কতকগুলো হঁট সাজানো আছে দেওয়ালটাতে। ওয়ারপার কতকগুলো ইট সরিয়ে তার ওপারে যাবার মত পথ করে নিল।
আবার এগিয়ে চলল ওয়ারপার। অল্প কিছুটা গিয়েই সে দেখল তার সামনে একটা ঠাকুরের বেদী রয়েছে। বেদীটা পাথরের এবং তার উপরে রক্তের দাগ রয়েছে। বুঝল এখানে অতীতের অনেক মানুষকে বলি দেয়া হয়েছে। সে আরও দেখল বেদীর পিছন দিকে কয়েকটা দরজা রয়েছে।
কিন্তু একটা দরজা খুলে ওয়ারপার বাইরে বেরোতে যেতেই এক সঙ্গে প্রায় একডজন দরজা খুলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো বেঁটে বেঁটে ভয়ঙ্কর আকৃতির লোক বাইরে থেকে ঢুকে পড়ল উঠোনটায়।
ভয়ে চীৎকার করতে করতে যে পথে এসেছিল সেই পথে পালাবার চেষ্টা করল ওয়ারপার। কিন্তু তার মতলব বুঝতে পেরে সেই সব ভয়ঙ্কর চেহারার পুরোহিতরা ধরে ফেলল তাকে। তারা ওয়ারপারকে বেঁধে ফেলে মন্দিরের ভিতরের দিকের ঘরটার মেঝের উপর ফেলে দিল। এরপর প্রধান পূজারিণী না। খগড় হাতে বেদীর সামনে এসে দাঁড়াল। ওয়ারপার বুঝতে পারল একটু পরেই তার দেহনিঃসৃত রক্ত ওদের অমানবিক রক্ত পিপাসা নিবৃত্ত করবে।
এমন সময় একটা ভয়ঙ্কর গর্জন শুনে চমকে উঠল ওয়ারপার। অনেকে ভয়ে পালিয়ে গেল। প্রধানা পূজারিণীর হাত থেকে খগড় পড়ে গেল, সে ওয়ারপারের পাশে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল। ওয়ারপার কোনরকমে পাশ ফিরে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল মন্দিরের মাঝখানে কোথা থেকে একটা সিংহ এসে একজন পুরোহিতকে ধরেছে।
ছাদ থেকে ধসে পড়া পাথরের আঘাতে টারজান অনেকক্ষণ মরার মত শুয়ে রইল। মাথায় জোর আঘাত লাগায় মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তার। আর অতীতের কথা সব ভুলে গিয়েছিল সে।
ধীরে ধীরে উঠে বসল টারজান। কিন্তু এখানে কখন কিভাবে এল, সে কে তার কিছুই মনে করতে পারল না।
টারজনের কোমরে একটা থলি ছিল। সেই থলিটাতে যতগুলো পারল রংবেরঙের মণি-মাণিক্য ভরে নিল। তারপর সেই ঘরটা পেরিয়ে আবার সুড়ঙ্গ পথটা ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। সুড়ঙ্গ পথটা যেখানে শেষ হয়েছে টারজান সেখানে গিয়ে কয়েকটা সিঁড়ি পেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতেই একটা সিংহের গর্জন শুনতে পেল সে। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো নর-নারীর সমবেত ভয়ার্ত চীৎকার কানে এল তার। টারজান তার বর্শাটা হাতে শক্ত করে ধরল।
