বাওনা এবার কোরাকের দিকে মুখ করে বলল, জ্যাক!
কোরাক বলল, বাবা! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তুমি এসে পড়েছিলে। তুমি ছাড়া আর কেউ হাতিটাকে থামাতে পারত না।
এবার টারজান নিজের হাতে জ্যাকের হাত পায়ের বাঁধন কেটে মুক্ত করে দিল।
হঠাৎ হাতিটা চীৎকার করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ওরা সবাই দেখল বনের একদিক থেকে কতকগুলো বাঁদর-গোরিলা টারজনের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের সকলের সামনে আছে আকুৎ। আকুৎ অভিবাদন জানাল টারজানকে। তাদের ভাষায় বলল, জঙ্গলের রাজা টারজান আবার ফিরে এসেছে।
বাংলোর কাছাকাছি সেই মাঠটায় পৌঁছতে ওদের দু’দিন লেগে গেল।
বাংলোতে গিয়ে টারজান তার স্ত্রী জেনকে সুখবরটা দিয়ে বলল, ছেলে আর মেয়ে দুটোকেই পাওয়া গেছে।
হারানো ছেলে আর মেয়ের মত মিরিয়েমকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল জেন।
কোরাক আর মিরিয়েম আসতে দু’হাত দিয়ে দুজনকে জরিয়ে ধরল জেন। তারপর মিরিয়েমকে বলল, একটা দুঃখের বিষয় বেনেস সেই অসুখেই মারা গেছে।
জেন একবার তার ছেলের দিকে তাকাল। তার ছেলেই একদিন লর্ড গ্রেস্টোক হবে। মিরিয়েমের যোগ্যতা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই তার। সে শুধু জানতে চায় জ্যাক মিরিয়েমকে সত্যিই ভালবাসে কি না।
কিন্তু জ্যাকের চোখেই এ কথার উত্তর খুঁজে পেল জেন।
জেন বলল, আজ আমি আমার সত্যিকারের মেয়েকে পেলাম।
নিবটবর্তী কোন চার্চে বিয়েটা হবার পরই ওরা দেশে ফিরল। ওরা লন্ডনের বাড়িতে ফিরলে পর টারজনের বন্ধু দার্ণতের চিঠি নিয়ে একদিন জেনারেল আর্মন্দ জ্যাকৎ এসে দেখা করল টারজনের সঙ্গে।
জেনারেল জ্যাকৎ একটা ফটো দেখিয়ে টারজানকে তার মেয়ে চুরি যাওয়ার ঘটনার কথা সব বলল। তারপর বলল, সপ্তাহখানেক আগে আবদুল কামাক নামে এক আরব তার কাছে গিয়ে বলে তার মেয়েকে মধ্য আফ্রিকার এক আরব শেখ তার ঘরে বন্দিনী করে রেখেছে। তাই আমার মেয়ের উদ্ধারের ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই।
ফটোটা দেখে টারজান মিরিয়েমকে তাদের কাছে ডেকে পাঠাল।
মিরিয়েম তাদের কাছে এলে জ্যাকৎ তাকে চিনতে পারল। বলল, কিন্তু ও হয়ত আমায় চিনতে পারবে না।
এই বলে মিরিয়েমকে বলল, আমার মেয়ে, তুই আমার মেয়ে।
মিরিয়েমও এবার তার বাবাকে চিনতে পেরে বলল, আমার বাবা। এবার আমি চিনতে পেরেছি। সব কথা মনে পড়েছে আমার।
এই বলে সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। মিরিয়েম তার বাবা মাকে ফিরে পাওয়ায় তারা সবাই খুশি হলো।
টারজান ও ওপারের ধনরত্ন (টারজান এ্যাণ্ড দি জুয়েলস অফ ওপার)
লর্ড গ্রেস্টোক, ওরফে টারজান একদিন তার আফ্রিকার বিরাট জমিদারী তদারক করে ফিরে আসার পরই বাংলো থেকে দেখতে পেল একদল লোক জঙ্গল প্রান্তের ফাঁকা মাঠটা পার হয়ে তার বাংলোর দিকেই এগিয়ে আসছে।
আধ ঘণ্টার মধ্যে মঁসিয়ে ফ্রেকুলত নামে একজন ভদ্রলোক টারজনের বাংলোতে এসে বলল, আমি জঙ্গলের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমার ভাগ্যবলে আমি ঈশ্বরের বিধানে এখানে এসে পড়েছি।
ঠিক হলো মঁসিয়ে ফ্রেকুলত তার লোকজন নিয়ে কিছুদিন এই বাংলোতে থাকবে। তারপর টারজনের লোকেরা তাকে পথ দেখিয়ে দিয়ে আসবে। এইভাবে একজন ভদ্র শিকারীর ছদ্মবেশে টারজানকে ঠকিয়ে ওয়ারপার আশ্রয় পেয়ে গেল তার বাংলোতে।
ওয়ারপার আসার পর থেকে এক সপ্তাহ কেটে গেল। কিন্তু তার পরিকল্পনা কার্যকরী করার কোন উপায় খুঁজে পেল না। কিন্তু একদিন একটা ঘটনা ঘটল যাতে সে একটা আশার আলো খুঁজে পেল।
সেদিন বিকেলে টারজান জেনের সঙ্গে আলোচনা করতে লাগল তার পড়ার ঘরে বসে। ওয়ারপার বারান্দা থেকে তাদের কথাবার্তা শুনতে পেল।
টারজান বলল, এত সহজ পথ আর নেই। এখন ওপারে গিয়ে সেখানকার গুপ্তভাণ্ডার থেকে কিছু সম্পদ আনতেই হবে। তবে খুবই সাবধানে একাজ করব। ওপারের অধিবাসীরাও আমার যাওয়ার ব্যাপারটা জানতে পারবে না।
পরদিন সকালে ওয়ারপার টারজানকে বলল, সে এবার ফিরে যাবে। টারজান তাতে রাজী হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
পরদিন ওয়ারপার তার দলবল আর একজন ওয়াজিরি পথ-প্রদর্শক নিয়ে রওনা হয়ে গেল বাংলো থেকে। কিছুদূর যাওয়ার পরই ওয়ারপার অসুস্থতার ভান করে এক জায়গায় শিবির স্থাপন করে রয়ে গেল। তারপর টারজনের ওয়াজিরি পথ-প্রদর্শককে বলল, এখন তুমি যাও। আমি সুস্থ হলে তোমাকে ডেকে পাঠাব।
ওয়ারপার তখন আচমেতের একজন বিশ্বস্ত নিগ্রো ভৃত্যকে ডেকে বলল, তুমি টারজনের গতিবিধি লক্ষ্য করে এস।
পরের দিন দূত ফিরে এসে ওয়ারপারকে বলল, টারজান তার পঞ্চাশজন ওয়াজিরি অনুচর নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যাত্রা করেছে সেই দিনই সকালে।
কথাটা শোনার পর আচমেত জেককে একটা চিঠি লিখে লোক মারফৎ আচমেত জেকের কাছে চিঠি পাঠিয়ে দিল। তারপর ছয়জন কুলি আর ছয়জন সাহসী বলবান যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে গোপনে টারজনের পিছু পিছু তাকে অনুসরণ করে যেতে লাগল একটু দূর থেকে।
সেদিন রাত্রিতে টারজান পথের ধারে লতাপাতা ও কাঁটাগাছের একটা শিবির তৈরি করে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে যখন টারজান তার দলবল নিয়ে যাত্রা শুরু করল তখন ওয়ারপারও রাত্রির বিশ্রামের পর তার শিবির থেকে তাকে অনুসরণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ল।
অনেকটা পথ যাওয়ার পর বনের প্রান্তে এক শূন্য উপত্যকায় এসে উপনীত হলো টারজান। সেই উপত্যকাটার ওপারে অনেক সোনার গম্বুজওয়ালা ওপার নগরী। টারজান ঠিক করল রাত্রিবেলায় সে একা গিয়ে কোথায় সোনা আছে তার সন্ধান করে আসবে।
