শেখ তখনও ঘুমোয়নি। খাওয়ার পর মিরিয়েমকে ডাকল শেখ।
শেখ মিরিয়েমকে বলল, আমি বুড়ো হয়েছি। আর বেশিদিন বাঁচব না। আমি তাই তোমাকে আমার ভাই আলি বেন কাদিনের হাতে তুলে দিচ্ছি। তুমি এবার থেকে তারই কাছে থাকবে।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আলি বেন মরিয়েমকে টানতে টানতে তার ঘরে নিয়ে গেল। মিরিয়েম প্রাণপণে তাকে বাধা দিচ্ছিল।
বেনেস তার ঘর থেকে বার হতেই একজন নিগ্রো প্রহরী তাকে বাধা দিল। বেনেস তাঁর গলাটা টিপে ধরতেই সে একটা ছুরি দিয়ে বেনেসের কাঁধে আঘাত করে। বেনেস তখন হাতের কাছে একটা পাথর পেয়ে তাই দিয়ে প্রহরীটার মাথায় আঘাত করতে থাকায় সে পড়ে গেল। তারপর মিরিয়েম যে তাঁবুতে ছিল সেই দিকে এগিয়ে গেল।
কোরাক তার আগেই সেই তাঁবুতে ঢুকে পড়েছে। আলি বেন তখনো মিরিয়েমের হাতটা ধরে ছিল। মিরিয়েম কোরাককে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল।
কোরাক নীরবে আলি বেনের গলাটা ধরে বুকের উপর ছুরি মারল। আলি বেনের নিষ্প্রাণ দেহটা লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর। এমন সময় রক্তাক্ত দেহে টলতে টলতে বেনেস ঘরে ঢুকল। তখন শেখের লোকজন খবর পেয়ে তাঁবুর দিকে ছুটে আসছিল।
কোরাক বেনেসকে দেখে চিনতে পারল। বলল, তোমরা পালিয়ে যাও।
মিরিয়েম বলল, আর তুমি?
কোরাক বলল, পরে যাব আমি।
এই বলে যারা তাঁবুতে আসছিল তাদের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল কোরাক। বেনেস মিরিয়েমকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে দলে দলে আরবরা এসে ঘিরে ধরল কোরাককে। সে একা অনেকক্ষণ ধরে লড়াই করল অনেকের সঙ্গে। কিন্তু ক্রমে সংখ্যায় ওরা অনেক বেড়ে যাওয়ায় আর পেরে উঠল না। তখন ওরা ওর হাত পা বেঁধে শেখের কাছে ধরে নিয়ে গেল।
শেখ তার লোকদের বলল, ওকে পুড়িয়ে মার।
একজন আরব শেখকে খবর দিল গাঁয়ের বাইরে গেটের কাছে একটা হাতি ঘোরাফেরা করছে। এমন সময় কোরাক একবার চীৎকার করল অদ্ভুতভাবে এবং হাতিটাও তার উত্তর দিল। ওরা কেউ কিন্তু এর মানে বুঝতে পারল না। গাঁয়ের মাঝখানে একটা খুঁটি পোঁতা ছিল।
কোরাককে সেই খুঁটিতে বেঁধে তার পাশের কাঠের গাদায় আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। কোরাক আবার চীৎকার করে হাতিটাকে সঙ্কেত জানাল। হাতিটা ততক্ষণে প্রবল গর্জন করতে করতে কাঠের গেটটা জোরে ঠেলা দিতে গেটটা ভেঙ্গে গেল। তারপর উন্মত্তভাবে কোরাকের কাছে ছুটে গেল। তারপর শুড় দিয়ে খুঁটিটাকে জড়িয়ে ধরে তাকে পিঠের উপর তুলে নিয়ে ছুটে এসে গা থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। শেখ একটা রাইফেল তুলে হাটিতার সামনে পথের উপর দাঁড়িয়ে গুলি করল হাতিটাকে। কিন্তু গুলিটা লাগল না। তখন হাতিটা রেগে গিয়ে শেখকে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে গেল।
বেনেস আর মিরিয়েম গাঁয়ের বাইরে গিয়ে কোরাকের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা এক সময় দেখল হাতিটা কোরাককে পিঠে চাপিয়ে ছুটে পালাচ্ছে আর গাঁয়ের লোকগুলো ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। এই অবসরে তারা সুযোগ বুঝে দুটো ঘোড়া নিয়ে তার উপর চেপে সোজা বড় বাওনার বাংলোর দিকে যেতে লাগল।
ওরা উত্তর দিকে ক্রমাগত সারারাত ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে চলল। সকাল হতেই দেখল বড় বাওনা নিজেই একদল নিগ্রো যোদ্ধা নিয়ে তাদের খোঁজে এগিয়ে আসছে। বেনেসকে দেখেই রাগে কুঞ্চিত হয়ে উঠল বাওনার দুটো। কিন্তু মিরিয়েমের মুখ থেকে সব কথা না শোনা পর্যন্ত মুখে কিছু বলল না।
মিরিয়েমের কাছ থেকে সব কথা শুনে বাওনা কোরাকের জন্য চিন্তিত হয়ে উঠল।
বাওনা তখন তার প্রধান ভূত্যকে বলল, মিরিয়েম আর বেনেসকে বাংলোতে নিয়ে যাও। আমার ঘোড়াটাও নিয়ে যাও। আমি জঙ্গলে যাচ্ছি।
মিরিয়েম প্রথমে তার ঘোড়ায় করে বাওনার লোকদের সঙ্গে বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল। কিন্তু কোরাকের কথাটা কিছুতেই ভুলতে পারল না সে। সে নিগ্রো ভৃত্যদের সর্দারকে বলল, আমি বাওনার সঙ্গে জঙ্গলে যাচ্ছি।
কিন্তু সর্দার আপত্তি জানালে মিরিয়েম ঊর্ধ্বশ্বাসে শেখের গাঁয়ের দিকে গাছে গাছে যেতে লাগল। অনেক দূর যাওয়ার পর সে বাতাসে হাতির গন্ধ পেল।
মিরিয়েম দেখল কোরাক হাতির পিঠে চেপে তার পথেই আসছে। কাছে আসতে গাছের উপর থেকে ডাকল কোরাককে। কোরাক আসতেই মিরিয়েম তার দিকে ছুটে গেল তার বাঁধন খোলার জন্য। কিন্তু হাতিটা শত্রু ভেবে খুঁড় উঁচিয়ে তেড়ে এল মিরিয়েমকে। কোরাক চীৎকার করে বলল, চলে যাও মিরিয়েম, ও তোমাকে মেরে ফেলবে।
কোরাক আবার বলল, তুমি এখন চলে যাবার ভান করো। আমি হাতিটাকে নদী থেকে জল আনতে পাঠাব। তখন তুমি এসে আমার বাঁধন খুলে দেবে।
হাতিটা প্রথমে চলে গেল। কিন্তু ওরা ভীষণ চালাক। কিছুটা যাওয়ার পর দেখল মিরিয়েম গাছ থেকে নেমে কোরাকের কাছে এল। হাতিটা যেতে যেতে হঠাৎ থেমে একবার অপেক্ষা করল। তারপর মিরিয়েমের দিকে ছুটে গেল। মিরিয়েম প্রাণ ভয়ে গাছটার দিকে ছুটে যেতে লাগল। কিন্তু হাতিটা উন্মত্ত হয়ে ছুটতে লাগল। কোরাক দেখল মিরিয়েমকে এখনি ধরে ফেলবে হাতিটা। তার বাঁচার আর কোন আশা নেই।
এমন সময় একটা গাছ থেকে এক দৈত্যাকার শ্বেতাঙ্গ হাতিটার সামনে নেমে পড়ে হাত বাড়িয়ে থামতে বলল তাকে। হাতিটা মন্ত্রমুগ্ধের মত থেমে গেল। মিরিয়েম নিরাপদে গাছে উঠে পড়ল। মিরিয়েম শ্বেতাঙ্গকে চিনতে পেরে বলে উঠল, বাওনা!
