কোরাক বলল, আমাকে ওরা কোরাক বলে, তার মানে হত্যাকারি। আচ্ছা তুমিই কি সেই লোক যে বনের ধারে ফাঁকা জায়গাটায় একটি মেয়েকে নিয়ে গল্প করছিলে আর ঠিক তখনি একটা সিংহ তোমাদের আক্রমণ করে?
বেনেস বলল, হ্যাঁ।
এখানে কি করছিলে?
মেয়েটিকে চুরি করে নিয়ে গেছে। আমি তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।
কোরাক আশ্চর্য হয়ে বলল, কে তাকে চুরি করেছে?
কোরাককে তখন সব কথা খুলে বলল বেনেস। হ্যানসনের শিবিরটা কোথায় তাও বলল।
কোরাক তখন বলল, আমি তার শিবিরে যাচ্ছি।
এই বলে কোরাক রওনা হয়ে পড়ল গাছ থেকে নেমে। কোরাক অনেক দূর চলে গেলে বেনেস তার পিছু পিছু যেতে লাগল। বেনেস হঠাৎ তার পিছনে একটা ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে পাশের একটা ঝোপে লুকিয়ে রইল। আড়াল থেকে দেখল সাদা আলখাল্লা পরা একটা আরব ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল উত্তর দিকে। কিছুক্ষণ পর আবার অনেকগুলো ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পেল। কিন্তু এবার আর পথের ধারে লুকোবার কোন ঝোপ বা আড়াল পেল না।
বেনেস যখন পথ থেকে সরে যাচ্ছিল তখন আরবরা ঘোড়া থেকে নেমে তাকে ধরে ফেলল। তারা আরবী ভাষায় বেনেসকে কি বলল। কিন্তু বেনেস তা বুঝতে পারল না। তখন আরবদের সর্দার দু’জনকে হুকুম দিল তারা যেন বেনেসকে বেঁধে শেখের বাড়িতে নিয়ে যায়। বাকী আরব অশ্বারোহীরা কোরাকের খোঁজে চলে গেল।
ততক্ষণে বেনেসের নির্দেশমত কোরাক সেই নদীটার ধার দিয়ে চলতে চলতে হ্যানসনের শিবিরটার উল্টো দিকে এসে পড়েছে। কিন্তু নদীটা পার হবে কি করে? এমন সময় একটা হাতির ডাক শুনতে পেয়ে তাকে ডাকল কোরাক।
হাতিটা কাছে এলে কোরাক বলল, আমাকে নদীটা পার করে ঐ শিবিরে নিয়ে চল।
কোরাককে হুঁড় দিয়ে পিঠে তুলে সাঁতার কেটে নদী পার হয়ে শিবিরে নিয়ে হাজির হলো হাতিটা।
হ্যানসন তখন আহত অবস্থায় বাইরে শুয়েছিল। হাতিটা তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে সে ভয় পেয়ে গেল।
কোরাক হাতিটাকে সেখানে থামতে বলে পিঠের উপর থেকে হ্যানসনকে জিজ্ঞাসা করল, মেয়েটি কোথায়?
হ্যানসন শুয়ে শুয়েই বলল, এখানে কোনো মেয়ে নেই।
কোরাক বলল, শ্বেতাঙ্গ মেয়েটি কোথায়? মিথ্যা কথা বলো না। তুমি তাকে তাদের বন্ধুদের কাছ থেকে ভুলিয়ে এনেছ।
মলবিন বলল, আমি নই, বেনেস নামে একজন ইংরেজ তাকে চুরি করে লন্ডনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।
কোরাক বলল, আমি তার কাছ থেকেই আসছি। মেয়েটি তার কাছে নেই। সে আমাকে পাঠিয়েছে। মেয়েটিকে নিয়ে যাবার জন্য। মিথ্যা কথা বলো না।
এই বলে হাতির পিঠ থেকে নেমে মলবিনের কাছে এগিয়ে গেল ভীতিবিহ্বল ভঙ্গিতে।
মলবিন বলল, আমার কোন ক্ষতি করো না, আমি তোমাকে সব কথা খুলে বলছি। মেয়েটিকে আমি এখানেই এনেছিলাম। কিন্তু সে নদী পার হয়ে পালিয়ে যায়। পরে শেখের হাতে ধরা পড়ে। আমি তাকে উদ্ধার করতে গেলে শেখ আমাকে তাড়িয়ে দেয়।
কোরাক আশ্চর্য হয়ে বলল, সে তাহলে শেখের মেয়ে নয়? তাহলে কার মেয়ে?
মলবিন বলল, তুমি তাকে আগে খুঁজে বার করো। তারপর আমি সব বলব। কিন্তু আমাকে যদি মেরে ফেল তাহলে তার কথা কিছুই জানতে পারবে না।
কোরাক বলল, আমি এখন শেখের গাঁয়ে যাব। সেখানে সে না থাকে ফিরে এসে তোমাকে হত্যা করব।
মলবিনকে দেখার পরই হাতিটার মনে সন্দেহ জাগে। তখন সে তার দেহটা শুঁকে বুঝতে পারল এই লোকটাই কয়েক বছর আগে তার সাথীকে হত্যা করে। হাতিরা কখনো তাদের শত্রুকে ভোলে না, সে তাই একবার রাগে গর্জন করে মলবিনের দেহটা শুড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে তুলে নিল। মলবিন ভয়ে চীৎকার করে কোরাককে বলল, আমাকে বাঁচাও, মেরে ফেলল।
কোরাক ছুটে এসে হাতিটাকে বিরত করার চেষ্টা করলেও হাতিটা তার গুঁড় থেকে মলবিনকে মাটিতে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল। তারপর তার রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডটা তাঁবুর উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল।
শেখের বাড়িতে বেনেসকে বেঁধে তার লোকেরা ধরে নিয়ে গেলে শেখ বেনেসকে ফরাসী ভাষায় জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি?
বেনেস বলল, আমি লন্ডনের মরিসন বেনেস।
শেখ বলল, তুমি আমার দেশে কি করছিলে?
বেনেস বলল, তার বাড়ি থেকে অপহৃতা এক তরুণীর খোঁজ করছিলাম আমি। পথে তোমার লোকেরা আমাকে ধরে।
শেখ বলল, তরুণী? তবে কি এই মেয়েটা?
মিরিয়েম তখন তাদের পিছনের সেই তাঁবুরই এক দিকে বসেছিল। তাকে চিনতে পেরে বেনেস ডাকল, মিরিয়েম।
মুখ ঘুরিয়ে মিরিয়েম বলল, মরিসন!
বেনেস বুঝতে পারল না মিরিয়েম হ্যানসনের কাছ থেকে এখানে কিভাবে এল।
শেখ তখন তার লোকদের বেনেসকে একটা ঘরে বন্দী করে রাখার হুকুম দিল। তারা হাত দুটো বেঁধে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে মেঝের উপর ফেলে দিল।
এমন সময় বেনেস শুনতে পেল পাশের ঘরে একজন পুরুষের সঙ্গে মিরিয়েমের জোর কথা কাটাকাটি আর ধস্তাধস্তি চলছে। তা শুনে আর থাকতে পারল না বেনেস। সে অনেক চেষ্টা করার পর একটা হাতের বাঁধন খুলে ফেলল। পাশের ঘরে যাবার জন্য ঘর থেকে বার হতেই একটা নিগ্রো প্রহরী তার পথ রোধ করে দাঁড়াল।
এদিকে কোরাক তার সেই হাতির পিঠে চেপে মিরিয়েমের খোঁজে শেখের গায়ের কাছে এসে হাতির পিঠ থেকে নেমে পড়ল। তার কাছে একটা লম্বা দড়ি আর একটা ছুরি ছাড়া আর কিছু ছিল না। তারপর মিরিয়েমের খোঁজে আরবদের তাঁবুগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল। তখন অনেক আরব খাওয়ার পর তামাক খাচ্ছিল তাঁবুর ভিতরে বসে।
