সে দেখল মলবিন আর একবার তার খোঁজ করে তার লোকদের নিয়ে দুটো নৌকায় করে ওপারে চলে গেল। একটা নৌকা রয়ে গেল।
ওদিকে মলবিন ওপারে গিয়ে লক্ষ্য রাখছিল নৌকাটার উপর। সে জানত আজ হোক কাল হোক ঐ নৌকাটা করে মিরিয়েম নদী পার হয়ে পালাবে। হটাৎ সে দেখল সত্যিই মিরিয়েম নৌকায় করে নদীর প্রায় মাঝখানে এসে পড়েছে।
তখনি মলবিন তার লোকদের নিয়ে নৌকায় চেপে মিরিয়েমের নৌকাটাকে ধরতে গেল। মিরিয়েমের নৌকাটা কূলের কাছাকাছি যেতেই নৌকা থেকে নেমেই মিরিয়েম জঙ্গলের দিকে ছুটতে লাগল। মলবিন যখন দেখল মিরিয়েমকে ধরার আর কোন উপায় নেই তখন সে তার রাইফেলটা নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করল। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। মিরিয়েম জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
এদিকে বেনেস সেই ভূত্যকে নিয়ে নদীটার ধারে এসে পড়ল। ভৃত্যটি বলল, আমরা এসে পড়েছি মালিক। কিছুক্ষণ আগেই তারা মলবিনের রাইফেরের গুলির আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। নদীর ধারে এসে বেনেস বলল, নদীটা পার হব কি করে?
নিগ্রো ভূত্যটি তখন নদীর কোলের কাছে একটা গাছের তলায় একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকা দেখতে। পেল। ওরা দু’জনে নৌকাটায় উঠতেই নৌকাটা তীর বেগে ছুটে যেতে লাগল ওপারের দিকে। নদীর মাঝখানে গিয়ে বেনেস দেখতে পেল ওপারের ঘাটে একটা নৌকা থেকে কয়েকজন লোক নামছে। প্রথমে যে নামল সে হলো মলবিন।
এবার মলবিনও দেখতে পেল মাঝ নদীতে একটা নৌকাতে করে বেনেস ও একজন নিগ্রো লোক তাদের দিকে আসছে।
তাই মলবিন চীৎকার করে বলল, কি চাও?
বেনেস উত্তরে বলল, শয়তান কোথাকার, কি চাই?
এই বলে সে রিভলবার থেকে গুলি করল মলবিনকে লক্ষ্য করে। মলবিনও তার রাইফেল থেকে গুলি করল বেনেসকে লক্ষ্য করে। মলবিনের একটা গুলি বেনেসের নিগ্রো ভৃত্যটির কপালে বিদ্ধ হওয়ায় সে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। বেনেসের নৌকাটা স্রোতের টানে ভেসে চলল। বেনেস আবার গুলি করল এবং তার আঘাতে নদীর ঘাটে পড়ে গেল মলবিন।
ক্রমে, নদীর বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল বেনেসের নৌকাটা।
গাঁয়ের পথ অর্ধেকটা পার হবার আগেই কতকগুলো সাদা পোশাক পরা নিগ্রো পাশের কুঁড়েগুলো থেকে অকস্মাৎ লাফিয়ে উঠল। মিরিয়েম পালাবার চেষ্টা করতেই একজন তাকে ধরে ফেলল। মুখ ঘুরিয়েই মিরিয়েম দেখল তার সামনে সেই বুড়ো শেখ দাঁড়িয়ে আছে। ভূত দেখে যেন চমকে উঠল মিরিয়েম।
শেখ বলল, তাহলে আবার ফিরে এসেছ তুমি আমার কাছে। এসেছ খাদ্য আর আশ্রয়ের সন্ধানে।
মিরিয়েম বলল, না, আমি কিছুই চাই না। আমি শুধু আমার বড় বাওনার কাছে ফিরে যেতে চাই।
শেখ বলল, বড় বাওনার কাছেই তুমি তাহলে এতদিন ছিলে? বড় বাওনাই নদী পার হয়ে এখন তোমাকে খুঁজতে আসছে।
মিরিয়েম বলল, না, যে সুইডিস লোকটাকে তুমি একদিন গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে এবং যে একদিন আমাকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য মবিদার সঙ্গে চক্রান্ত করেছিল ও হচ্ছে সেই।
সঙ্গে সঙ্গে শেখ তার লোকদের হুকুম দিল তারা যেন নদীর ধারে মলবিনকে দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মেরে ফেলে।
কিন্তু শেখ সদলবলে নদীর দিকে যাবার আগেই মলবিন পালিয়ে যায়। সে মরেনি। বেনেসের নৌকাটা অদৃশ্য হয়ে যাবার পর সে উঠেই শেখকে দেখতে পায়। শেখকে সে দারুণ ভয় করত। তাই মুহূর্তের মধ্যে গা-ঢাকা দেয়।
মলবিনকে না পেয়ে শেখ মিরিয়েমকে বন্দী করে তার গায়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
দু’দিন ক্রমাগত পথ চলার পর শেখ তার গায়ে গিয়ে পৌঁছল।
গাঁয়ে যেতেই অনেক লোক ভিড় করে এল মিরিয়েমকে দেখার জন্য। মিরিয়েম এখন অনেকটা বড় হয়েছে।
অচৈতন্য বেনেসকে নিয়ে নৌকাটা স্রোতের টানে ভেসে চলছিল। চেতনা ফিরে পেয়ে বেনেস দেখল তখন রাত্রিকাল। আহত অবস্থায় নৌকাতে সে সম্পূর্ণ একা।
সে কোনরকমে একটু বসে হাত দিয়ে জল কেটে নৌকাটাকে কূলের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
কিন্তু বনের কাছে কোন রকমে যেতেই একটা সিংহের গর্জন শুনতে পেল সে। তার মনে হলো সিংহটা নদীর পারে যেন তারই জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কুলের কাছে একটা গাছের ডাল দেখতে পেয়ে নৌকার উপর থেকে ডালটা ধরে ফেলল বেনেস। কিন্তু নৌকাটা থেকে পা দুটো তুলতেই নৌকাটা স্রোতের টানে চলে গেল। সে ঝুলতে লাগল। একবার ভাবল নদীতেই সে ঝাঁপ দেবে। কিন্তু পায়ের কাছে একটা কুমীরের হাঁ দেখে ভয়ে হিম হয়ে গেল সে। এমন সময় তার হাতের উপর একটা মাংসল বস্তু অনুভব করল। সঙ্গে সঙ্গে কে যেন তাকে ধরে গাছের উপর তুলে নিল।
এদিকে কোরাক বনের মাঝে হাতির দল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে সেই গাছটার উপর শুয়েছিল। সেদিন সে এই গাছটার উপর যখন শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তখন একটা সিংহের ডাকে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে দেখতে পায় নদীর পাড়ে একটা সিংহ গর্জন করছে আর নদীর উপর সেই গাছটার একটা ডাল ধরে একটা লোক ঝুলছে। লোকটা অসহায় ভেবে সে তাকে গাছের উপর তুলে নেয়।
বেনেস ভাবল একটা উলঙ্গ গোরিলা তাকে ধরেছে। সে রিভলবারটা খাপ থেকে বার করে গুলি করতে যাচ্ছিল এমন সময় কে তাকে মানুষের ভাষায় জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি?
বেনেস বলল, হা ভগবান! তুমি মানুষ? আমি ত ভেবেছিলাম তুমি গোরিলা।
কোরাক বলল, তুমি কে?
বেনেস বলল, আমি এক ইংরেজ। নাম বেনেস। কিন্তু তুমি কে?
