পরদিন সকাল না হতেই শিবির থেকে বেরিয়ে পড়ল বেনেস ঘোড়ায় করে। বেলা ন’টার সময় সে সেই ফাঁকা জায়গাটায় পৌঁছল। এদিকে কোরাকও তাকে গাছে গাছে অনুসরণ করে সেই জায়গায় পৌঁছল। অনেকক্ষণ ধরে সেখানে অপেক্ষা করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল বেনেস। কোরাকও গাছের উপর সমানে বসে রইল।
অবশেষে মিরিয়েমের ঘোড়াটা দেখা গেল বাংলোর গেটের কাছে। ক্রমে সে এগিয়ে এল। তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দুটি মানুষ।
মেয়েটি কাছে এলে তাকে চিনতে পারল কোরাক। সে-ই মিরিয়েম। তার বুকটাকে যেন কে বিদ্ধ করল। মিরিয়েম তাহলে বেঁচে আছে, মরেনি। একবার ভালব একটা বিষাক্ত তীর মেরে ইংরেজ যুবকটির প্রাণনাশ করবে সে। কিন্তু আবার ভাবল মিরিয়েম যাকে ভালবাসে তাকে হত্যা করবে না সে কখনো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বেনেস ঘোড়া ছুটিয়ে তার শিবিরের দিকে চল গেল। কোরাকও তাকে অনুসরণ করে শিবিরের কাছে একটা গাছের উপর উঠে বসে রইল। সে ভাবল নিশ্চয় আজ রাতে বেনেস আবার সেই ফাঁকা জায়গাটায় মিরিয়েমকে আনতে যাবে। কিন্তু সন্ধ্যে হতেই সে দেখল বেনেসের পরিবর্তে অন্য এক শ্বেতাঙ্গ এক নিগ্রো ভৃত্যকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চেপে রওনা হলো।
রাত্রি প্রায় নটার সময় মিরিয়েম তার ঘোড়ায় চেপে হ্যানসনের কাছে এল। বেনেসকে দেখতে না পেয়ে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল সে। হ্যানসন বলল, বেনেস ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছে। আজ রাতটা সে বিশ্রাম করবে। তাই আমাকে পাঠিয়ে দিল। নাও, তাড়াতাড়ি করো, তা না হলে আমরা ধরা পড়ে যাব।
পরের দিন দুপুরের দিকে ওরা বন পার হয়ে একটা নদীর ধারে এসে পৌঁছল। নদীর ওপারে একটা শিবির দেখা গেল। শিবিরটা দেখে মনে আশা হলো মিরিয়েমের। নদীটা পার হয়ে মিরিয়েম বলল, বেনেস কোথায়?
হ্যানসন শিবিরের একটা ঘর দেখিয়ে বলল, ঐ ঘরে।
কিন্তু ঘরের মধ্যে ঢুকে বেনেসকে দেখতে না পেয়ে ভয় পেয়ে গেল মিরিয়েম। হ্যানসনের মুখে এক ক্রুর হাসি ফুটে উঠল।
মিরিয়েম বুঝতে পারল হ্যানসন তাকে ঠকিয়েছে। হ্যানসন ক’দিন ধরে দাড়ি কামায়নি বলে তার মুখে বেশ দাড়ি গজিয়ে উঠেছে। এবার তার মুখপানে তাকিয়ে মিরিয়েম বেশ বুঝতে পারল আসলে এই হ্যানসনই শয়তান মলবিন।
যে নিগ্রো ভৃত্যটিকে বনের প্রান্তে দাঁড় করিয়ে রেখে মিরিয়েমের সঙ্গে দেখা করতে যায় মলবিন সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। রাত গভীর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সে যখন দেখল তার মালিক হ্যানসন ফিরে এল না তখন সে একটা গাছের উপর উঠে পড়ল।
এদিকে মরিসন বেনেস সারারাত একটুও ঘুমোতে পারেনি। বেনেস বুঝতে পারল মেয়ে চুরির জন্য বাওনা অবশ্যই তাদের খোঁজ করবে। তাই সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও শিবির তুলে দিয়ে রওনা হলো।
দুপুরের দিকে হ্যানসনের সঙ্গী সেই নিগ্রো ভৃত্যটি ঘর্মাক্ত দেহে ওদের কাছে এসে হাজির হলো। এসেই সে অন্যান্য নিগ্রো ভৃত্যদের হ্যানসনের শয়তানির কথা সব বলল।
তার কথা শুনে সবাই হ্যানসনের উপর রেগে গেল। বেনেস সব কথা শুনে হ্যানসনের বিশ্বাস ঘাতকতার কথা বুঝতে পারল। বুঝল তাকে এতখানি বিশ্বাস করা উচিত হয়নি।
সেই নিগ্রো ভৃত্যটিকে ডেকে বেনেস বলল, তোমার মালিক কোথায় গেছে তা তুমি জান? সেখানে তুমি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?
ভৃত্যটি বলল, হ্যাঁ, পারব মালিক। অনেক দূরে একটা বড় নদীর ধারে সে তার কিছু লোককে পাঠিয়ে দিয়ে এক নতুন শিবির গড়ে তুলেছে।
এরপর বেনেস সর্দারকে বলল, তোমরা উত্তর দিকে যাও। আমি পরে ফিরে যাব।
এদিকে কোরাক যখন গাছের উপর উঠে দেখল ইংরেজ যুবক বেনেস সকালবেলায় উল্টো দিকে যাত্রা করল তখন সে একাই মিরিয়েমকে দেখার জন্য সেই বনের ধারে ফাঁকা জায়গাটার কাছে গিয়ে হাজির হলো। কিন্তু সেখানে মিরিয়েমকে দেখতে পেল না।
মিরিয়েম মলবিনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হঠাৎ তার রিভলবারটা হাতে পেয়ে যায়। কিন্তু রিভলবারে কোন গুলি ছিল না। তখন মলবিন তাকে আবার ধরে ফেলে। কিন্তু নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মলবিনের রাইফেলটা তুলে নিয়ে তার বাঁট দিয়ে মাথায় সজোরে আঘাত করতেই অচেতন হয়ে পড়ে যায় সে।
সঙ্গে সঙ্গে শিবির থেকে বেরিয়ে বনের দিকে ছুটতে থাকে মিরিয়েম। সে ভাবল আবার তার বাওনার কাছে ফিরে যাবে। কিন্তু সে অনেক দূরের ও অনেক দিনের পথ।
এই ভেবে সে আবার শিবিরের কাছাকাছি গিয়ে গাছ থেকে দেখল মুখ থেকে রক্ত মুছতে মুছতে মলবিন তার সব লোক নিয়ে শিবির থেকে বেরিয়ে গেল। শিবিরে কেউ নেই দেখে সে সোজা শিবিরের মধ্যে চলে গেল। তাঁবুর কোণে একটা বাক্সের মধ্যে কিছু গুলি, একটি বাচ্চা মেয়ের ফটো আর কিছু খবরের কাগজের কাটা টুকরো পেল। এই সব কিছু তার পকেটে ভরে নিল সে। কিন্তু তার এই ছেলেবেলাকার ফটোটা মলবিনের কাছে কি করে এল, কি করেই বা তা খবরের কাগজে ছাপা হলো তা সে বুঝতে পারল না।
এমন সময় মলবিনের গলা শুনতে পেল। ও তাঁবুর দিকে ফিরে আসছে। তখন মিরিয়েম তাঁবুর পিছন থেকে ত্রিপলটা উঠিয়ে গুঁড়ি মেরে বাইরে চলে গেল। তারপর ভৃত্যদের ঘরের পাশে যে একটা বড় গাছ। ছিল তার উপর উঠে পড়ল।
সেখান থেকে লক্ষ্য করল মিরিয়েম নদীর ঘাটে দু-তিনটে ছোট ডিঙ্গি নৌকা রয়েছে। নদীর ওপারে ঘন বন। নদীটা পার হয়ে সেই বনে যেতে পারলে সে অনেকটা নিরাপদ হবে। ভাবল এখন দিনের শেষ। অন্ধকার হলেই নদীটা পার হবে সে।
