কোরাক দেখল একজন শ্বেতাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গ মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু মেয়েটি যে। মিরিয়েম এটা সে বুঝতে পারল না। তবে দেখতে পেল ঝোপের উপর একটা সিংহ ওৎ পেতে আছে। সে যাই হোক, মেয়েটিকে ক্ষুধার্ত সিংহের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য হাতি নিয়ে অপেক্ষা করছিল সে। এবার সিংহটা হঠাৎ গর্জন করে উঠতেই তার উপর চোখ পড়ল তাদের।
মিরিয়মে ছুটে গিয়ে তার ঘোড়াটার উপর চাপতেই সিংহটা লাফ দিয়ে তাকে ধরার জন্য আর সঙ্গে সঙ্গে কোরাকও হাতির পিঠ থেকে একটা বর্শা ছুঁড়ে সিংহের একটা কাঁধ বিদ্ধ করল। মিরিয়েম ততক্ষণে ঘোড়ার পিঠ থেকে এক লাফে একটা গাছের উপর উঠে পড়েছে। বেনেসও তার ঘোড়ার উপর চড়ে তীর বেগে পালিয়ে গেল। কোরাক বর্শাটা ছুঁড়েই হাতির পিঠে চড়ে চলে গেছে।
এদিকে সিংহটা আহত হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করল মিরিয়েমকে। কিন্তু সে গাছের উপর উঠে যাওয়ায় তার আর নাগাল পেল না। সিংহটা তবু আবার লাফ দিতেই তার পিছন থেকে। হ্যানসন তার রাইফেল থেকে একটা গুলি করল সিংহটাকে লক্ষ্য করে। সিংহটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে পড়ে মরে গেল।
হ্যানসন তখন মিরিয়েমের নাম ধরে ডাকতেই মিরিয়েম গাছের উপর থেকে সাড়া দিল। বলল, এই যে, আমি এখানে। সিংহটা মরেছে?
হ্যানসন বলল, হ্যাঁ, নেমে এস। খুব বেঁচে গেছ। রাত্রিতে জঙ্গলে আর বেড়িও না। তোমার এতে শিক্ষা হওয়া উচিত।
সিংহটা মরে যেতে বেনেস ওদের কাছে এগিয়ে এল। তখন তিনজনে বাংলোর পথে রওনা হলো।
এদিকে ওদের জন্য বাংলোর বারান্দাতে তখন বাওনা অধীর আগ্রহে এবং গভীর উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল। হ্যানসনের রাইফেলের গুলির আওয়াজ শুনে তার হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। উঠে দেখে বাড়িতে মিরিয়েম বা মরিসন কেউ নেই। তাদের ঘোড়া দুটোও নেই। বাংলোর গেট খোলা।
কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা তিনজন বাংলোতে এসে পড়ল। হ্যানসন ঘটনার যে বিবরণ দিল তাতে সন্তুষ্ট হলো না বাওনা। মিরিয়েম দেখল বাওনা খুব রেগে গেছে। বাওনা তাকে বলল, তোমার ঘরে যাও মিরিয়েম।
তারপর বেনেসকে বাওনা বলল, আমার পড়ার ঘরে এস, একটা কথা আছে।
এই বলে বাওনা হ্যানসনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, তুমি কোথায় এবং কি করে দেখলে হ্যানসন?
হ্যানসন বলল, আমি রাত্রিতে মাঝে মাঝে ফুলবাগানে এসে বসে থাকি। আজও ছিলাম। এমন সময় দেখি ওরা ঘোড়ায় চেপে দু’জনে বেরিয়ে গেল। এত রাতে এভাবে বেড়াতে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয় ভেবে আমিও গোড়ায় করে অনুসরণ করতে লাগলাম ওদের। তারপর ওরা যখন বনের ধারে এক জায়গায় বসে গল্প করছিল তখন হঠাৎ একটা সিংহ ওদের আক্রমণ করে। আমি তখন সিংহটাকে গুলি করে মারি।
হ্যানসন আরও বলল, সন্ধ্যের সময় প্রায়ই বাগানে আসায় ওদের অনেক কথাই শুনতে পাই। বেনেস মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়ে যাবার একটা পরিকল্পনা করছিল। আমি বলি কি, আগামীকাল সকালে আমি যখন এখান থেকে উত্তরাঞ্চলে চলে যাচ্ছি তখন আপনি ওকেও আমার সঙ্গে যেতে বলুন।
বাওনা বলল, শুধু এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে বেনেসের উপর আমি কোন অভিযোগ আনতে পারি না। সে আমার অতিথি।
এরপর পড়ার ঘরে গিয়ে বনেসকে বাওনা বলল, কাল সকালে হ্যানসন উত্তর দিকে রওনা হচ্ছে। সে বলছিল তুমি যদি তার সঙ্গে যাও ত সে খুশি হবে।
পরদিন হ্যানসন যখন বেনেসকে সঙ্গে করে তার শিবিরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন বেনেস এক নীরব গাম্ভীর্যে স্তব্ধ হয়ে ছিল।
এক সময় হ্যানসন বলল, আমি হলে মেয়েটাকে কিছুতেই ছাড়তাম না। তবে এ ব্যাপারে আমার সাহায্যের যদি দরকার হয় তাহলে বলবে। মেয়েটি যদি তোমাকে ভালবাসে তাহলে অবশ্যই সে তোমার সঙ্গে যাবে।
বেনেস বলল, এখানে তা সম্ভব নয়। চারদিকে ওর লোকজন পাহারায় আছে। ধরে ফেলবে আমাদের।
হ্যানসন বলল, না ধরতে পারবে না। আমিও এ অঞ্চলে দশ বছর ধরে ব্যবসা করছি। আমারও জানাশোনা কম নেই এখানে। আমি বলছি তুমি একটা চিঠি লিখে দাও। আমি একটা লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি মেয়েটিকে লিখে দাও ও এসে পত্রপাঠ যেন দেখা করে তোমার সঙ্গে।
কথাটা মানতে মন চাইছিল না বেনেসের। তবু সে বুঝল হ্যানসন ঠিকই বলেছে। সে তখন একটা চিঠি লিখল মিনিয়েমকে। একটা লোক মারফৎ চিঠিটা পাঠিয়ে দিল হ্যানসন। তারপর আবার এগিয়ে চলল ওরা।
পথের ধারে একটা গাছ থেকে ওদের দেখে চিনতে পারল কোরাক। সে বুঝতে পারল বেনেস নামে ইংরেজ যুবকটাকে মেরিয়েমের মত দেখতে সেই মেয়েটির সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে সে। মেয়েটা দেখতে ঠিক মিরিয়েমের মত। তাকে দেখলেই মিরিয়েমকে মনে পড়ে যায় তার। কোরাক তাই ভাবল এই যুবকরা কোথায় শিবির স্থাপন করে তা সে লক্ষ্য রাখবে।
এদিকে মিরিয়েম সেদিন সন্ধ্যায় বাংলোর বারান্দাতে অশান্তভাবে পায়চারি করছিল আর বেনেসের কথা ভাবছিল।
চাঁদের আলোয় বাগানে বেড়াতে বেড়াতে বেড়ার কাছে চলে গেল। সহসা কার চাপা পদশব্দ শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ালো। সে চাঁদের আলোয় দেখতে পেল একটা নিগ্রো বেড়ার ওধার থেকে একটা চিঠি দিয়ে চলে গেল। চিঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে সেটা পড়ে দেখল মিরিয়েম। তাতে বেনেস লিখেছে, তোমার সঙ্গে একবার দেখা না করে আমি যেতে পারছি না। কাল সকালে বনের ধারে ফাঁকা জায়গাটায় এস। একা আসবে।
