মিরিয়েম তখন জেনসেনকে বন্ধু ভেবে বলল, আমাকে মুক্ত করে দাও, আমি কোরাকের কাছে যাব।
কিন্তু জেনসেন বলল, তুমি নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলে শাস্তি পাবে।
রাত্রিটা শিবিরে কাটিয়ে পরদিন সকালে যাত্রা শুরু করল ওরা। এইভাবে তিন দিন কেটে গেল।
একদিন মিরিয়েমকে রেখে জেনসেন ও মলবিন শিকার করতে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মলবিন শিকার না করেই ফিরে এল। তাকে দেখে ভয়ে চমকে উঠল মিরিয়েম। মলবিন তাকে ধরতে গেলে জেনসেনের নির্দেশমত সে জেনসেনকে ডাকতে লাগল চীৎকার করে।
এমন সময় কার্ল জেনসেন শিকার থেকে ফিরল। মিরিয়েমের আর্ত চীৎকার সে শুনতে পেয়েছিল।
জেনসেনকে দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল মলবিন। সে তার রিভলবারটা বার করে গুলি করল জেনসেনকে লক্ষ্য করে। জেনসেন লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাবুর ভিতর এক লম্বা চেহারার অচেনা শ্বেতাঙ্গ ঢুকেই মলবিনের ঘাড়ের উপর হাত রাখল। শ্বেতাঙ্গ লোকটি বনের মধ্যে শিকার করতে থাকাকালে মিরিয়েমের আর্ত চীৎকার শুনে এই তাঁবুতে এসে হাজির হয়। সে মিরিয়েমকে জিজ্ঞাসা করল, ব্যাপারটা কি?
মিরিয়েম আরবী ভাষায় বলল, এরা আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
এরপর মলবিনকে দেখিয়ে মিরিয়েম বলল, এই লোকটা আমার ক্ষতি করতে যাচ্ছিল। যে লোকটা এই মাত্র মারা গেছে সে এই লোকটাকে বাধা দিতে গেলে তাকে হত্যা করে এই বদ লোকটা।
অপরিচিত শ্বেতাঙ্গ লোকটি মলবিনকে বলল, মৃত্যুই তোমার যোগ্য শাস্তি। অবশ্য আমি তোমায় এখন মারব না। তবে তোমাকে এখনি আমাদের এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। না গেলে এর পর বুঝবে আমি কে।
মলবিন বলে গেল সেই অপরিচিত শ্বেতাঙ্গ মিরিয়েমকে বলল, তুমি একা এই জঙ্গলে কোথায় খুঁজবে তোমার সাথীকে। তার চেয়ে তুমি আমাদের সঙ্গে আমার বাড়িতে চল। সেখানে আমার স্ত্রীর কাছে থাকবে। সে তোমাকে পেয়ে খুশি হবে।
রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত দেহে কোরাক জঙ্গলের মধ্যে এসে বেবুনদের খোঁজে এগিয়ে যেতে লাগল।
বেবুনদের রাজা কোরাককে চিনতে পেরে বলল, তুমি কোরাক। এস আমরা একসঙ্গে শিকার করব। আমি তোমার বন্ধু।
কোরাক বলল, আমি এখন শিকার করতে পারব না। গোমাঙ্গানী অর্থাৎ নিগ্রোরা আমার মিরিয়েমকে চুরি করে নিয়ে গেছে। চল আমরা একযোগে গোমাঙ্গানীদের গাঁ আক্রমণ করে মিরিয়েমকে উদ্ধার করি। তারা তাকে সাহায্য করতে রাজী হলো।
তখন একযোগে তারা সকলে মিলে কভুন্ডুদের গায়ের দিকে যাত্রা শুরু করল। পার্বত্য বেবুনদের সংখ্যা প্রায় দু’তিন হাজার হবে। ওরা যখন কভুন্ডুদের গায়ের কাছে গিয়ে পৌঁছল তখন ভর দুপুর।
বেবুনদের চীৎকার শুনে কভুন্ডুদের গায়ের নিগ্রোরা বেরিয়ে এল। মেয়েরা তাদের ছেলেদের নিয়ে গা ছেড়ে ভয়ে পালাতে লাগল।
কোরাক তখন প্রতিটা ঘর খুঁজে দেখল। কিন্তু মিরিয়েমকে কোথাও পাওয়া গেল না।
বেবুনরাও তখন ক্লান্তদেহে এক জায়গায় বসে বিশ্রাম করতে লাগল। অবশেষে মিরিয়েমকে না পেয়ে হতাশ হয়ে কিছু নিগ্রোকে বন্দী করে তাদের সঙ্গে নিয়ে গেল।
নতুন বাড়িতে এসে মিরিয়েমের দিনগুলো ভালই কাটতে লাগল। বাড়ির মালিক যে তাকে উদ্ধার করেছে তাকে সে আরবী ভাষায় বাওনা’ বলে ডাকত। মালিক ও তার স্ত্রী ইংরেজিতে কথা বলত। কিছুদিন পরে মরিসন বেনেস নামে এক ইংরেজ যুবক তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে জঙ্গলে শিকারের আশায়। মিরিয়েমের বেশ ভাব হয়ে যায় তার সঙ্গে।
সেদিন মিরিয়েম আর বাওনা বাংলোর বারান্দাতে বসেছিল। এমন সময় দূরে একজন শ্বেতাঙ্গ অশ্বারাহী বাংলোর গেটের কাছে এসেই বাওনাকে অভিবাদন জানিয়ে বলল, আমি দক্ষিণ থেকে আসছি। শিকার আর ব্যবসার জন্য আফ্রিকার এ অঞ্চলে এসেছি আমি। আমার লোকজন দক্ষিণাঞ্চলে এক শিবিরে আছে। আমি আপনার নাম শুনেছি। আপনার অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ শিকার করতে পায় না। আমি কয়েক সপ্তাহ এর অঞ্চলে শিবির স্থাপন করে শিকার করতে চাই।
বাওনা বলল, আপনি তাহলে নদীর ধারে আমার খামারের কাছাকাছি শিবির স্থাপন করতে পারেন এবং সেখান থেকে শিকার করে বেড়াতে পারেন।
আগন্তুক বলল, আমার শিবির যেখানে আছে সেখানেই থাক, কারণ আমার লোকেরা বড় ঝগড়াটে।
আগন্তুক তার নাম বলল, হ্যানসন।
ক্রমে হ্যানসন পরিবারের বন্ধু হয়ে দাঁড়াল।
হ্যানসন প্রায়ই বাংলোর ফুলবাগানে এসে একা একা বেড়াত। বলত সে খুব ফুল ভালবাসে।
একদিন রাত্রিবেলায় ঘুম আসছিল না মিরিয়েমের। আজ সন্ধ্যার সময় মরিসন বেনেস তার কাছে তার প্রেমের কথাটা আবার তোলে। ফলে সেকথা ভাবতে গিয়ে ঘুমোতে পারেনি সে। সে তাই একা একা বাগানে চলে আসে। এসে দেখে হ্যানসন বাগানে এক জায়গায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনতে পেল মিরিয়েম। দেখল বেনেস ঘোড়ায় চেপে তার দিকে এগিয়ে আসছে। মিরিয়েম বলল, আমার ঘুম আসছে না। চল জঙ্গলে গিয়ে একটু বেড়িয়ে আসি।
ফাঁকা মাঠ পার হয়ে জঙ্গলের ধারে গিয়ে মিরিয়েম বলল, চল বনের ভিতর যাই, বনের এদিকটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা, কোন অসুবিধা হবে না।
বেনেসের ভয় লাগলেও সে বলল, হ্যাঁ, তাছাড়া এ অঞ্চলে মানুষখেকো সিংহের বড় একটা দেখা পাওয়া যায় না।
