বাঁদর-গোরিলাটাই প্রথমে আক্রমণ করল। কোরাক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। গোরিলাটা তার কাছে হাত বাড়িয়ে তার গলাটা ধরতে এলেই কোরাক জোরে তার মুখে আর একটা জোর ঘুষি মারল। তার চোয়াল থেকে রক্ত ঝরতে লাগল এবং সে পড়ে গেল মাটিতে। এরপর গোরিলাটা যতবার উঠতে চেষ্টা করতে লাগল ততবারই কোরাক একটা করে ঘুষি মারতে লাগল। অবশেষে একেবারে কায়দা হয়ে পড়লে তার ঘাড় ধরে কোরাক বলল, ‘কাগোদা অর্থাৎ হার মেনেছ?
এবার বাঁদর-গোরিলাটা বলল, কাগোদা। অর্থাৎ হ্যাঁ, হার মেনেছি।
কোরাক তখন বলল, তাহলে উঠে চলে যাও। যারা আমাকে একবার দল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে তাদের দলে গিয়ে আর রাজা হতে চাই না আমি।
কোরাক আকুতের দিকে তাকিয়ে ওদের বলল, তবে এই হবে তোমাদের রাজা।
আকুৎ দীর্ঘদিন পর তার মনের মত এক দল খুঁজে পেয়ে তাদের দলের সঙ্গে বাস করতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সে বলল, কোরাককে ছেড়ে কোথাও যাবে না। সে কোরাককে ঐ দলেল সঙ্গে থাকতে বলল। কিন্তু কোরাক মিরিয়েমের কথা ভেবে রাজী হলো না।
কোরাক তাই বলল, তুমি ওদের সঙ্গে যাও আকুৎ। আমি তোমাদের কাছাকাছি থাকব। তোমরা যেখানে যাবে আমিও সেখানে যাব। তবে দলে থাকব না।
ফলে আকুৎই ওদের দলের রাজা হলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আকুৎ তার দলের সঙ্গে ধীরে ধীরে চলে গেল। কিন্তু এমন সময় কোরাকের পিছনে একদল মানুষের চীৎকার শুনে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল একদল সশস্ত্র কৃষ্ণকায় মানুষ তাকে আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসছে। মিরিয়েমের হাতে তখনো বর্শাটা ধরা ছিল।
যে গাঁ থেকে কোরাক আর আকুৎ পালিয়ে আসে এই নিগ্রোরা হলো সেই গাঁয়েরই লোক। এদের সর্দার ছিল কভু। মিরিয়েমকে দেখে কভুন্ডু তার লোকদের বলল, আমি যখন একদিন আরব বস্তিতে এক শেখের ক্রীতদাস ছিলাম তখন শেখের বাড়িতে এই মেয়েটাকে দেখেছি। একে ধরে শেখকে দিতে পারলে সে মোটা পুরস্কার দেবে।
এই বলে সে পর পর দুটো তীর মারল কোরাককে লক্ষ্য করে। তীর দুটো তার ঘাড়ে আর একটা পায়ে লাগল। কোরাক পড়ে যেতেই নিগ্রোদের সর্দার কভুন্ডু কোরাককে বধ করে মিরিয়েমকে নিয়ে পালিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে এল।
কিন্তু এমন সময় তাদের চীৎকার ও হৈ চৈ শুনে আকুৎ তার দলবলকে নিয়ে ছুটে এল। বাঁদর গোরিলাদের এক বিরাট দল দেখে কভুডু কোরাককে ছেড়ে দিয়ে শুধু মিরিয়েমকে নিয়ে পালিয়ে গেল।
একটু সুস্থ হয়ে উঠলে মিরিয়েমের খোঁজে অবশেষে কোরাক যখন কভুন্ডুদের গাঁয়ে গিয়ে পৌঁছল তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। একটা ঘরের কাছে গিয়ে সে বুঝল এই ঘরেই বন্দী আছে মিরিয়েম।
অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে ঘরটার সামনের দিকে এসে কোরাক দেখল ঘরখানার ভিতরে হাত পা বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছে মিরিয়েম আর ঘরের দরজার উপর একটা নিগ্রো বসে পাহারা দিচ্ছে।
কোরাক নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে অতর্কিতে লোকটার গলাটা জোরে টিপে ধরল। ক্রমে তার দেহটা অসাড় হয়ে ঢলে পড়ল। কোরাক তখন ঘরে ঢুকেই মিরিয়েমের হাত-পায়ের সব বাঁধন কেটে দিল।
কিন্তু কোরাক নিঃশব্দে মিরিয়েমকে কাঁধের উপর তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই একটা কুকুর কোরাককে দেখেই ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তখন সেই শব্দে গাঁয়ের লোকেরা সচকিত হয়ে ছুটে এল ঘরখানার দিকে। ততক্ষণে কোরাক মিরিয়েমকে কাঁধে নিয়ে পালিয়ে গেছে।
এরপর তারা কোরাক যে পথে গিয়েছিল সেই পথে তাড়া করল তাকে। কভুন্ডুর লোকেরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ধরে ফেলল তাদের। তখন কভুন্ডু তাদের লোকদের বলল, আমাদের দরকার শুধু মেয়েটাকে, ওকে কেড়ে নিয়ে লোকটাকে তাড়িয়ে দাও। ওকে মারার দরকার নেই।
মিরিয়েমের হাত পা বেঁধে আবার ওকে ওরা গায়ের ভিতরে নিয়ে গিয়ে তাদের সর্দার কভুন্ডুর ঘরের মধ্যে রেখে দিল।
কিন্তু মিরিয়েম জানত না কভুন্ডু তাকে আর গাঁয়ের মধ্যে বেশি দিন রাখতে চায় না। সে শেখের কাছে দূত পাঠিয়েছে। মিরিয়েমকে তার হাতে তুলে দিলে সে কি পুরস্কার তাদের দেবে একথা জানতে চেয়েছে।
এদিকে কভুন্ডু জানতে পারেনি তার দূত কার্ল জেনসেন আর মলবিনের হাতে ধরা পড়ে। কার্লদের ক্রীতদাসদের কাছে কভুন্ডুর দূত মিরিয়েমের কথাটা ফাঁস করে দেয়। এরপর কার্লরা মিরিয়েমকে পাবার জন্য কভুন্ডুদের গায়ের দিকে রওনা হলো।
কিন্তু ওদের গায়ে গিয়ে বন্দিনী মিরিয়েম সম্পর্কে কিছু বলল না কার্লরা। তবে কভুন্ডুর সঙ্গে একথা সেকথা বলতে গিয়ে মলবিন শেখের মৃত্যুর খবরটা দিয়ে ফেলল। কভুন্ডু আশ্চর্য হয়ে মাথা চুলকাতে লাগল। মলবিন বলল, সেকি! তুমি জান না?
কভুন্ডু তখন দেখল বন্দিনী মেয়েটার আর দাম নেই। শেখের হাতে মোটা পুরস্কারের বিনিময়ে তুলে দেবার জন্যই ও রেখেছিল মেয়েটাকে। সে তাই কার্লদের বলল, তোমরা কিনবে মেয়েটাকে?
জেনসেন বলল, পথে ওকে নিয়ে যেতে আমাদের কষ্ট হবে, তাছাড়া মেয়েটা বুড়ি।
কভুন্ডু বলল, আমি তোমাদের দেখাব। ও মোটেই বুড়ি নয়, তরুণী এবং সুন্দরী।
এই বলে কভুন্ডু ওদের ঘরটার মধ্যে নিয়ে গিয়ে মিরিয়েমকে দেখল। তার বাঁধন খুলে দিল। তারপর কভুন্ডু মিরিয়েমকে বিক্রি করে ওদের শিবিরে পাঠিয়ে দিল।
ওদের কথাবার্তা মিরিয়েম বুঝতে না পারলেও একটা কথা বুঝতে পারল। বুঝল মলবিন লোকটা খারাপ এবং তার কবল থেকে জেনসেন তাকে উদ্ধার করেছে। জেনসেন তাকে বলল, যদি ও কখনো তোমার কোন ক্ষতি করতে যায় তাহলে আমাকে চীৎকার করে ডাকবে।
