যেতে যেতে কোরাক দেখল একটা তাঁবুর সামনে একটি শ্বেতাঙ্গ বালিকা বসে একটা পুতুল নিয়ে খেলা করছে আপন মনে। তা দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠল কোরাকের, হাতের উদ্ধত বর্শাটা নামিয়ে নিল।
হঠাৎ কোরাক দেখল গাঁয়ের বাইরে কিসের গোলমাল শোনা যাচ্ছে। দেখল গাঁয়ের সর্দার একজন বুড়ো আরব শেখ লোকজন ও উটসমেত দীর্ঘদিন পর গাঁয়ে ফিরল বলে গাঁয়ের লোকেরা সবাই ছুটে দেখতে যাচ্ছে তাকে।
কোরাক দেখল, একজন বৃদ্ধ শেখ কুঁড়েটার দিকে এগিয়ে আসছে। তার মনে হলো ঐ শেখই হয়ত মেয়েটির বাবা।
শেখ এসেই মেয়েটিকে লাথি মেরে ফেলে দিল। তারপর তার অভ্যাসমত সে মেয়েটিকে আবার ধরে হাত উঁচিয়ে মারতে গেল। কোরাক আর স্থির থাকতে পারল না। গাছ থেকে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে শেখের পাশে এসে দাঁড়াল। তার বা হাতে বর্শা থাকা সত্ত্বেও সে শুধু তার ডান হাত দিয়ে সজোরে ঘুষি মারল শেখের মুখে। অচৈতন্য ও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল শেখ।
এবার মেয়েটির দিকে তাকাল কোরাক। মেয়েটি কোরাককে বলল, ও চেতনা ফিরে পেলেই আমাকে মেরে খুন করবে।
সে আরবী ভাষায় কথাটা বলল। কোরাক তা বুঝতে পারল না। মেয়েটি তখন কোরাকের কাছে এসে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল। মেয়েটির চোখে জল দেখে বিচলিত হয়ে সে মেয়েটির গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, এস আমাদের সঙ্গে। তুমি আমাদের সঙ্গে জঙ্গলেই বাস করবে।
আকুৎ একটু দূরে ছিল। আকুৎ দেখল কোরাক একটা মেয়েকে কাঁধে করে বয়ে আনছে। কোরাক আকুতের কাছে এসে বলল, এ আমাদের সঙ্গে যাবে।
কিন্তু আকুতের কাছে এসেই ভয় পেয়ে গেল মিরিয়েম। কিন্তু যখন দেখল আকুৎ তার কোন ক্ষতি করছে না তখন আর ভয় করল না তাকে। ওরা মিরিয়েমকে সঙ্গে নিয়ে চলতে লাগল।
এর পর কয়েক মাস ওদের তিনজনের জীবনে বিচিত্র কোন কিছু ঘটলা না। প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও মিরিয়েম আজকাল বন্যজীবনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে।
মিরিয়েম যাতে কিছুটা আরামে ও নিরাপদে ঘুমোতে পারে তার জন্য কোরাক একটা মাচা তৈরি করেছিল একটা গাছের উপর।
ওরা দিনের বেলায় যখন শিকার করতে যেত তখন মিরিয়েম তার পুতুলটাকে নিয়ে একা একা খেলা করত আর বনের যত সব ছোট ছোট বাঁদরগুলো তার চারদিকে কিচিরমিচির করত।
একদিন কোরাক আর আকুৎ যখন শিকার করতে গিয়েছিল তখন সে একা একাই খেলা করছিল বাঁদরগুলোর সঙ্গে। দিনের শেষে তার মনে হলো কোরাক আর আকুৎ আসছে। সে ভাবল আজ ঘুমিয়ে থাকার ভান করে সে ঠকাবে কোরাককে।
মিরিয়েম তাই চুপচাপ শুয়ে রইল চোখ বন্ধ করে। কিন্তু চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মিরিয়েম দেখল একটা বাঁদর-গোরিলা তাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে আসেছ। তার পিছনে আর একটা বাঁদর-গোরিলা। সে তখন লাফ দিয়ে উপরের ডালে উঠে গিয়ে এডাল ওড়াল করে বেড়াতে লাগল। বাঁদর-গোরিলা দুটোও তাকে ধরার জন্য পিছু পিছু তাড়া করল।
এইভাবে এডাল ওডাল করতে করতে গিয়ে একবার একটা সরু ডাল মিরিয়েম ধরতেই ডালটা ভেঙ্গে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে মিরিয়েম মাটিতে পড়ে গেল।
তখন বড় গোরিলাটা মিরিয়েমের অচেতন দেহটাকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে চলে গেল।
শিকার থেকে ফিরে এসে কোরাক দেখল গাছের মাচার উপর মিরিয়েম নেই। আর চারদিকে বাঁদরগুলো কিচিরমিচির করছে। কতকগুলো বাদর বনের একটা দিকে ছোটাছুটি করছে। কোরাক বুঝল বাঁদরগুলো মিরিয়েমের বন্ধু। তার দিকে ছুটছে সেইদিকে নিশ্চয় কেউ মিরিয়েমকে নিয়ে পালিয়েছে।
কোরাকও সেই দিকে গাছে গাছে তীরবেগে যেতে লাগল। কিছুদূর গিয়ে দেখল একটা বাঁদর গোরিলা মিরিয়েমের অচেতন দেহটা কাঁধের উপর তুলে নিয়ে পালাচ্ছে।
কোরাককে দেখে বাঁদর-গোরিলাটা বুঝল কোরাক তার শিকার ছিনিয়ে নিতে এসেছে। সে তাই মিরিয়েমের অচেতন দেহটাকে মাটির উপর নামিয়ে রেখে কোরাককে আক্রমণ করল। কিন্তু তার আগেই কোরাক অতর্কিতে তাকে ধরে তার ঘাড়ে একটা জোর কামড় বসিয়ে দিয়েছে।
সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্তায় ঘাড়ে কামড় আর কয়েকটা ঘুষি খেয়ে ঘায়েল হয়ে পড়েছিল। বাঁদর গোরিলাটা। এমন সময় মিরিয়েম চেতনা ফিরে পেয়ে কোরাককে দেখেই চীৎকার করে উঠল আনন্দে। বলল, কোরাক, আমার কোরাক, ওকে মেরে ফেল। ও আমাকে নিয়ে পালাচ্ছিল।
কোরাক বর্শাটা তুলে নিয়ে তার ফলাটা তার গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে গোরিলাটার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। বাঁদর-গোরিলাটা আগেই ঘায়েল হয়েছিল। এবার সে রক্তাক্ত দেহে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
কোরাক মিরিয়েমকে কি বলতে যাচ্ছিল। এতক্ষণে আকুও চলে আসে সেখানে কিন্তু আকুৎ তাকে ইশারায় কোন শব্দ করতে বারণ করল। ওরা কাদের পদশব্দ শুনতে পেল। প্রথমে দেখল একটা বাঁদর গোরিলা অদূরে একটা ঝোপের ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে উঁকি মেরে কি দেখছে। তারপর আর একটা গোরিলাও তাই করল। এইভাবে প্রায় চল্লিশটা পুরুষ ও মেয়ে গোরিলা একে একে তাদের কাছে এসে দাঁড়াল। কোরাক বুঝল যে বাঁদর-গোরিলাটাকে ও মেরেছে এরা তারই দলের।
আকুৎ ওদের লক্ষ্য করে বলল, শক্তিশালী কোরাক তোমাদের রাজাকে হত্যা করেছে। এখন সে-ই তোমাদের রাজা। তোমাদের দলে তার থেকে শক্তিশালী আর কে আছে?
একথা শুনে বাঁদর-গোরিলারা নিজেদের মধ্যে কি বলাবলি করতে লাগল। তারপর এক যুবক শক্তিশালী বাদর-গোরিলা এগিয়ে এল কোরাকের কাছে।
