একদিন নদীর ধার দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ তারা একটা আদিবাসীদের গায়ের সামনে এসে হাজির হলো। কতকগুলো ছেলেমেয়ে গায়ের সামনেই ফাঁকা জায়গাটায় খেলা করছিল। কিন্তু ছেলেগুলো জ্যাককে দেখেই ভয়ে গাঁয়ের ভিতর পালিয়ে গেল। তাদের ভয়ার্ত চীৎকার শুনে গাঁয়ের পুরুষ যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে বেরিয়ে এল।
ব্যাপার দেখে আকুৎ একটা গাছের উপর উঠে পড়েছে। সে জ্যাককে পালাতে বলল, জ্যাকও হতাশ হয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটে পালাতে লাগল। নিগ্রো যোদ্ধারাও তাকে তাড়া করল। কিন্তু জ্যাক গাছের উপর উঠেই আকুতের সঙ্গে গাছের ডালে ডালে জঙ্গলের গভীরে চলে গেল। নিগ্রোরা জঙ্গলের ভিতরে অনেক দূর গিয়ে তাদের খোঁজ করতে লাগল। জ্যাক আকুতের সঙ্গে না গিয়ে গাছে গাছে তাদের অনুসরণ করতে লাগল। সে যখন দেখল নিগ্রো যোদ্ধারা অনেকটা এগিয়ে পড়েছে এবং তাদের একজন একা পিছিয়ে পড়েছে তখন সে গাছের উপর থেকে হঠাৎ লোকটার ঘাড়ের উপর অতর্কিতে লাফিয়ে পড়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার গলাটা জোরে টিপে ধরল। শ্বাসরোধ হয়ে লোকটা মারা গেলে সে তার সবকিছু কেড়ে নিয়ে আবার গাছের উপর উঠে পড়ল। তার বর্শাটা হাতে নিল। পরনের চামড়ার কৌপীনটা পরল। ছুরিটা কোমরে গুঁজে নিল। তারপর আকুতের কাছে সেই বেশে গিয়ে হাজির হয়ে গর্বের সঙ্গে বলল, আমি শুধু আমার হাত আর দাঁত দিয়ে একটা লোককে খুন করেছি।
আকুতের সঙ্গে জ্যাক কিছুদূর যাবার পর হঠাৎ কিসের গন্ধ পেল বাতাসে। গন্ধ শুঁকে জ্যাক বুঝতে পারল একদল মানুষ আসছে। তার মনে হলো শ্বেতাঙ্গরা নিশ্চয় কোন বন্দরের দিকে যাচ্ছে। আনন্দে অন্তরটা লাফিয়ে উঠল জ্যাকের।
ধীর গতিতে এগিয়ে আসা দলটাকে জ্যাকই প্রথমে দেখতে পেল। গাছের উপর থেকে সে দেখল সামনে একদল নিগ্রো যোদ্ধা আসছে আর তাদের পিছনে একদল পিঠে মালের বোঝা নিয়ে ধীর গতিতে পথ হাঁটছে। মালবাহী লোকগুলোর দু’ধারে দু’জন ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ হাতে চাবুক নিয়ে তাদের সঙ্গে হাঁটছে আর মাঝে মাঝে চারদিকে ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে।
জ্যাক এগিয়ে গেল শ্বেতাঙ্গদের লক্ষ্য করে। জ্যাককে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভীতিসূচক এক চীৎকার ফেটে পড়ল একজন শ্বেতাঙ্গ। সঙ্গে সঙ্গে সে রাইফেল উঁচিয়ে জ্যাককে লক্ষ্য করে গুলি করল। গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে একটা গাছের ডালে লাগল।
ব্যাপার দেখে জ্যাক গাছের আড়ালে সরে গিয়ে গাছের উপর উঠে পড়ল। আসলে ঐ দু’জন ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ হলো কার্ল জেনসেন আর সেভেন মলবিন। ওরা হাতির দাঁতের অনেক বোঝা নিয়ে। আরবদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পথ হাঁটছিল।
শেখদের গাঁ থেকে কার্ল জেনসেন আর মলবিন শিবির গুটিয়ে চলে যাবার পর থেকে দু’ছর কেটে গেছে। তখন শেখ বাড়িতে ছিল না। কি একটা কাজে বিদেশে গেছে।
এদিকে জ্যাক আর আকুৎ ক্রমাগত বাঁদর-গোরিলাদের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে লাগল বনের মধ্যে। জ্যাক বর্শা ছেঁড়া শিখে বর্শা দিয়ে চিতাবাঘ, হরিণ, জেব্রা প্রভৃতি শিকার করতে লাগল। পথে যেতে যেতে এইভাবে শিকারের অভিজ্ঞতা বেড়ে যেতে লাগল তার।
একদিন রাত্রিবেলায় একটা বিরাট গাছের উপর শুয়ে ঘুমোচ্ছিল ওরা দু’জনে। এমন সময় জয়টাকের শব্দে দু’জনেরই ঘুম ভেঙে গেল, আকু বলল, বাঁদর-গোরিলাদের ঢাকের শব্দ। ওরা দমদম নাচ নাচছে। এস কোরাক, আমাদের জাতির লোকদের কাছে এস।
কিছুদিন হলো জ্যাকের এক নতুন নাম রেখেছে আকুৎ। জ্যাককে আজকাল কোরাক বলে ডাকে। আকুৎদের ভাষায় কোরাক’ শব্দের মানে হলো হত্যাকারী। ওরা দমদম নাচের বাজনার শব্দ অনুসরণ করে এগোচ্ছিল। কিছুটা গিয়ে ওরা আবার গাছের উপর উঠে ডালে ডালে যেতে লাগল।
নাচের জায়গাটার কাছাকাছি গিয়ে আকুৎ একটা শব্দ করতেই বাঁদর-গোরিলাদের রাজা এগিয়ে এল। আকুৎ বদরদলের রাজাকে বলল, আমি হচ্ছি আকুৎ, বাঁদরদলের রাজা ছিলাম। আর এর নাম কোরাক, এর বাবা টারজান বদরদলের রাজা ছিল। আমরা তোমাদের দলেই থাকব, তোমাদের সঙ্গে শিকার করে বেড়াব, শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করব।
বাঁদরদলের নবনির্বাচিত রাজা আকুৎ ও কোরাককে একবার দেখে নিল। ওদের দেখে মনে মনে ভয় হলো রাজার। সে গর্জন করতে করতে বলল, তোমরা চলে যাও, তা না হলে তোমাদের মেরে ফেলব।
কোরাকের মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে আকুতের পিছনে দাঁড়িয়েছিল। সে চীৎকার করে বলল, আমি কোরাক। আমি হচ্ছি মহা হত্যাকারী। আমি চলে যাব ঠিক, তবে যাবার আগে দেখিয়ে দিয়ে যাব আমি আমার পিতা টারজনের মতই শক্তিশালী এবং আমি তোমাদের বা তোমাদের রাজাকে ভয় করি না।
বাঁদর-গোরিলাদের রাজা কোরাকের কথা শুনে বিস্ময়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কোরাকের দিকে গর্জন করতে করতে এগিয়ে এল। কোরাক একটা জোর লাফ দিয়ে বাঁদররাজাকে আক্রমণ করল। সে হাত দুটো বাড়িয়ে কোরাকের গলাটা ধরতে এলে দুটো হাতের ঘুষি সজোরে এক সঙ্গে রাজার তলপেটে মারল। যন্ত্রণায় চীৎকার করতে করতে সে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য সব বাঁদর গোরিলাগুলো তাদের রাজাকে মারার জন্য কোরাককে একযোগে আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসতে লাগল। আকুৎ তখন কোরাককে কাঁধে চাপিয়ে একটা গাছের উপর উঠে পড়ল। তারপর ডালে ডালে লাফিয়ে বনের গভীরে চলে গেল। বাঁদর-গোরিলাগুলো কিছুক্ষণ ধরে তাদের পিছু পিছু তাড়া করে গেলেও তাদের ধরতে পারল না।
