মাসখানেক পর টারজান খবর পেল স্কুল থেকে জ্যাক সেখানে যায়নি। খোঁজ নিয়ে একটা কথা শুধু জানতে পারল তারা জ্যাককে স্কুলে যাওয়ার জন্য ট্রেনে তুলে দেওয়ার পর ট্রেন ছাড়ার আগেই সে ট্রেন। থেকে নেমে একটা গাড়ি ভাড়া করে পলভিচের বাসায় আসে।
পলভিচের মৃত্যুর পরদিনই ডোভার থেকে একটি ছেলে তার অসুস্থ বুড়ি ঠাকুরমাকে রোগীর গাড়িতে করে জাহাজে চাপিয়ে একসঙ্গে যাত্রা করল।
যাত্রীদের মধ্যে কন্ডন নামে একজন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বড় বড় শহরগুলোতে অপরাধমূলক কাজ করে বেড়াত। লোকটা দুষ্ট প্রকৃতির। সে একদিন জ্যাকের হাতে বড় এক তাড়া নোটের গোছা দেখে তা চুরি করার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে।
এমন সময় জাহাজটা আফ্রিকার জঙ্গলবর্তী এক ছোটখাটো বন্দরে দু-একদিনের জন্য নোঙর করে। এই সময় জ্যাকের বাড়ির জন্য সহসা মন খারাপ করে ওঠে। সে তাই সেই বন্দরে নেমে ইংলন্ডগামী একটা জাহাজে করে বাড়ি ফিরে যাবে ঠিক করে।
বুড়ি ঠাকুরমাবেশী আকুৎকে চেয়ারে করে জাহাজ থেকে নামাবার সময় জ্যাকের পকেট থেকে নোটের তাড়াটা কখন পড়ে যায় তা সে দেখতেই পায়নি। ছোটখাটো একটা হোটেলে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে জ্যাক ইংল্যান্ডে জাহাজে করে যাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
সে রাত্রিতে জ্যাক আকুৎকে বুঝিয়ে বলল, তুমি জঙ্গলে চলে যাও আকুৎ, আমি বাড়ি ফিরে যাব। এখান থেকে।
আকুৎ নীরবে মেনে নিল জ্যাকের কথাটা। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল বিছানায়। আকুৎ মেঝের উপর শুল।
জ্যাকরা ঘুমিয়ে পড়লে চুপি চুপি দরজাটা খুলে ঘরে ঢুকল কডন। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জ্যাকের প্যান্টের পকেট থেকে নোটগুলো বার করে নেওয়া। কিন্তু কোথাও কোন নোট পেল না। এবার সে গলাটা টিপে ধরতেই জ্যাক জেগে উঠে চোখ মেলে তাকাল। সেও তখন উঠে বসে কন্ডনের হাতের কব্জিটা চেপে ধরল।
এদিকে কন্ডন এতক্ষণ বুঝতে পারেনি ঘরের মধ্যে অন্ধকারে কে খুব নিঃশব্দে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিল অশান্তভাবে। এবার তার লোমশ হাতদুটো কন্ডনের ঘাড়ের উপর পড়তেই সে চমকে উঠল।
কন্ডন এবার তার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে জ্যাকের মুখের উপর একটা ঘুষি মারল। সঙ্গে সঙ্গে আকুৎ তাকে বিছানা থেকে টেনে এনে মেঝের উপর ফেলে দিল। কন্ডন একটা অদ্ভুত গর্জন শুনতে পেল। তার গলাটা কে এক হাতে ধরে তার মুণ্ডুটা ঘোরাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে না বুঝতেই চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে সব চেতনা হারিয়ে ফেলল সে আর তার প্রাণহীন দেহটা মেঝের উপর ঢলে পড়ল।
এবার বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল জ্যাক।
মহা বিপদে পড়ল জ্যাক। একে ঘরের মধ্যে মৃতদেহ। মাথার উপর ঝুলছে খুনের দায়! তার উপর। নোটের বান্ডিলটাও খুঁজে পেল না। হোটেলের ভাড়া মেটাবে তারও কোন উপায় নেই। বাড়ি ফিরবে তার জাহাজ ভাড়াও নেই। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে জ্যাক দেখল ঘরের পাশে একটা গাছ রয়েছে, তার ওপাশ থেকেই জঙ্গল শুরু হয়েছে। সে আকুৎকে তার অনুসরণ করতে বলে জানালা থেকে বিড়ালের মত লাফ দিয়ে গাছটার ডালে গিয়ে উঠে জঙ্গলে চলে গেল।
ফরাসী সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন আর্মন্দ জ্যাক নামে একজন অফিসার মরুভূমির মাঝখানে একটা তালগাছের তলায় পা ছড়িয়ে বসেছিল। সেনাদলের কাছে সাদা পোশাক পরা পাঁচজন আরব দস্যু বন্দী। অবস্থায় বসেছিল। বন্দীদের মধ্যে তাদের সর্দার আচমেত বেন হুদিনও ছিল। এই দস্যুদের ধরার জন্য এক সপ্তা ধরে প্রচুর বেগ পেতে হয়েছে আর্মন্দ জ্যাককে।
সহসা একদল আরব ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা ফরাসী সেনাদলের শিবিরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। একজন ফরাসী সার্জেন্ট এগিয়ে গিয়ে আগন্তুক দলের প্রধানকে ক্যাপ্টেন আর্মন্দের কাছে নিয়ে এল। আগন্তুকের নাম শেখ অরম বেন খাতুর।
আর্মন্দ বলল, বল কি ব্যাপার।
খাতুর বলল, আচমেত বেন হুদিন আমার বোনের ছেলে। তুমি যদি তাকে আমার হাতে ছেড়ে দাও তাহলে সে আর কখনো এ কাজ করবে না।
ক্যাপ্টেন বলল, তা সম্ভব নয়। তাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে মরতেই হবে।
যাবার সময় শেখ বলে গেল, মনে রেখ আজ রাতেই আমার বোনের ছেলে পালাবে।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সার্জেন্টকে ডাকল আর্মন্দ। বলল, এই কালো কুকুরটাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। আর রাত্রিবেলায় শিবিরের কাছে কোন আরবকে দেখামাত্র গুলি করবে।
এই ঘটনাটা ঘটে তিন বছর আগে। তখন আচমেত হুদিনের বিচার হয় এবং তাতে তার প্রাণদণ্ড কার্যকরী হয়। আর তার এক মাস পরেই ক্যাপ্টেন আর্মন্দের সাত বছরের মেয়ে জা জ্যাক রহস্যজনকভাবে অন্তর্হিত হয়। আরবরা তাকে চুরি করে নিয়ে যায়।
একটি উপনদীর ধারে গভীর জঙ্গলের মধ্যে তালপাতার ছাউনিওয়ালা কুড়িটি কুঁড়ে ঘরে ভরা একটি গাঁ ছিল। সেই কুঁড়েগুলোর মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গায় আধডজন চামড়ার তাঁবুতে কতকগুলো আরব অস্থায়ীভাবে বাস করত।
আরবদের সেই তাঁবুগুলোর একটিতে সেদিন দশ বছরের একটি মেয়ে তার পুতুলের জন্য ঘাসের একটি জামা তৈরি করছিল। তার চোখদুটো এবং মাথার চুলগুলো ছিল কালো এবং গায়ের রংটা ছিল ফর্সা। তার নাম ছিল মিরিয়েম।
জীবনে প্রথম আফ্রিকার জঙ্গলে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতাটা কখনো ভুলতে পারবে না জ্যাক।
সকালে সূর্য উঠতে তার মনে আশা জাগল নতুন করে। রাত্রিতে একটা গাছের ডালে আকুতের গায়ে গা দিয়ে রাত কাটিয়েছে। সকাল হতেই জ্যাক আকুৎকে ডেকে বলল, ওঠ, আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। কিছু খাবারের সন্ধান করতে হবে।
