মূর একথা বলতে না বলতেই জ্যাক তাকে জোর করে তুলে নিয়ে তার বিছানার উপর শুইয়ে দিল। তারপর একটা বিছানার চাদর দিয়ে দড়ি করে মূরের হাত পা বেঁধে ফেলল খাটের সঙ্গে। তারপর দরজায় ভিতর থেকে তালাবন্ধ করে দিয়ে জানালা দিয়ে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে গেল।
কিছু পরে টারজান ও জেন এসে দরজায় ঘা দিয়ে জ্যাককে ডাকতে লাগল। কিন্তু কোন সাড়া না পেয়ে টারজান দরজা ভেঙ্গে ফেলল। ঘরে ঢুকে দেখল হাত পা বাঁধা অবস্থায় মূৰ্ছিত হয়ে ঘরের মেঝের উপর পড়ে আছে মূর।
মুখে চোখে জল দিতেই মূর চেতনা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকাল। তাকিয়েই বলে উঠল, আমি গৃহশিক্ষকতার পদ থেকে অব্যাহতি চাইছি। আমি আপনার ছেলেকে আর পড়াতে পারব না।
টারজান বলল, কিন্তু জ্যাক কোথায়?
মূর বলল, সে আমাকে এইভাবে বেঁধে রেখে এ্যাজাক্সকে দেখতে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে তার গাড়ি বার করতে বলল টারজান। তারপর সোজা মিউজিক হলের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
মিউজিক হলে টারজানকে দেখে তার মনের মানুষকে খুঁজে পেয়ে তাদের ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করতে করতে এ্যাজাক্স ছুটে গেল তার দিকে। টারজানও তাকে চিনতে পেরে স্তম্ভিত বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখ থেকে শুধু একটা কথা বেরিয়ে এল, আকুৎ তুমি?
আকুৎ বলল, দীর্ঘদিন ধরে তোমাকেই খুঁজছি টারজান। তোমাকে যখন পেয়ে গেছি তখন আমি তোমাকে নিয়ে আবার জঙ্গলে গিয়ে বাস করব তোমার সঙ্গে।
টারজান নীরবে আকুতের মাথায় হাত বোলাতে লাগল। আফ্রিকার জঙ্গলের সব ঘটনা মনে পড়ল তার একে একে। টারজান আকুৎকে বলল, তুমি আজ ওদের সঙ্গেই যাও আকুৎ। কাল আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব।
বাড়ি যাবার পথে তার পূর্ব জীবনের সব কথা সংক্ষেপে বলল টারজান জ্যাককে।
পরদিন পলভিচ আর আকুৎ যেখানে ছিল সেখানে গিয়ে দেখা করল টারজান। টারজান আকুৎকে টাকা দিয়ে কিনতে চাইল। পলভিচ তার উত্তরে বলল, কথাটা ভেবে দেখব।
টারজান বাড়ি ফিরে জেনকে বলল, আমি ভাবছি আকুৎকে কিনে নিয়ে আফ্রিকার জঙ্গলে পাঠিয়ে দেব।
জ্যাক বলল, ওকে কিনে আমাদের বাড়িতে রেখে দাও। আমার বন্ধু হিসেবে থাকবে ও এখানে।
একথা জেন বা টারজান কেউ সমর্থন করতে পারল না।
জ্যাক তখন আকুৎকে দেখতে যাবার অনুমতি চাইল। কিন্তু সে অনুমতি তার বাবা মা কেউ দিল না।
তখন জ্যাক একদিন কোনরকমে ঠিকানা যোগাড় করে খুঁজে খুঁজে শহরের একপ্রান্তে পলভিচের আস্তানায় চলে গেল। সেখানে গিয়ে পলভিচকে কিছু টাকা দিয়ে জ্যাক বলল, আমার বাবাকে একথা বলো না। আমি মাঝে মাঝে এখানে এসে ওকে দেখে যাব। ওর জন্য আমি তোমাকে কিছু করে টাকা দেব।
জ্যাক যখন বলল, সে টারজনের ছেলে তখন পলভিচের মাথায় ষড়যন্ত্রের একটা পরিকল্পনা খেলে গেল। সে ভাবল টারজান রোকোফকে হত্যা করেছে, তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তাই তার ছেলের মধ্য দিয়ে টারজনের উপর প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা করল মনে মনে।
দিন দুইয়েকের মধ্যেই টারজনের কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে আকুৎকে বিক্রী করতে রাজী হয়ে গেল পলভিচ। ঠিক হলো দু’দিন পর ডোভার থেকে আফ্রিকাগামী একটা জাহাজে তুলে দেবে আকুৎকে পলভিচ।
এই ঘটনার কিছু পরেই জ্যাক এসে কিছু টাকা পলভিচের পকেটে গুঁজে দিয়ে বলল, তোমাকে আর কষ্ট করে ডোভারে যেতে হবে না। আমিই আকুৎকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আজই সন্ধ্যায় আমার স্কুল বোর্ডিং-এ যাবার কথা। সুতরাং আমি ওভাবে গেলে তাতে বাবার কোন সন্দেহ হবে না। ডোভারে আকুৎকে পৌঁছে দিয়েই আমি স্কুলে চলে যাব।
পলভিচ মনে মনে শয়তানির হাসি হেসে রাজী হয়ে গেল জ্যাকের কথায়।
কিন্তু তার বাবা মা স্টেশান ছেড়ে চলে গেলেই জ্যাক ট্রেন থেকে নেমে সোজা পলভিঢের বাসায় চলে গেল। গিয়ে দেখল আকুৎকে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে বিছানার উপর ফেলে রাখা হয়েছে। পলভিচ ঘরের মধ্যে অশান্তভাবে পায়চারি করছে।
পলভিচ এবার জ্যাককে বলল, তুমি আমার কাছে এসে পিছন ফিরে দাঁড়াও।
জ্যাক তখন তার সামনে এসে পিছন ফিরে দাঁড়াতেই পলভিচ তার পিছন থেকে একটা মোটা দড়ির ফাঁস তার দুটো হাতের কব্জিতে শক্ত করে লাগিয়ে দিল। মুহূর্তমধ্যে পলভিচের মুখের চেহারা অন্য রকম হয়ে গেল। সে ভয়ঙ্করভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অতর্কিতে জ্যাককে মেঝের উপর চিৎ করে ফেলে দিয়ে তার বুকের উপর বসল। তারপর দুটো হাত দিয়ে তার গলাটা টিপে ধরে বলল, তোর বাবা আমার সর্বনাশ করেছে। এইভাবে আমি তার প্রতিশোধ নেব।
জ্যাক কিন্তু চীৎকার করল না। সে হাত নাড়তেও পারল না। অসহায়ভাবে শুয়ে রইল সে আর তার গলাটা টিপতে লাগল পলভিচ।
এদিকে আকুৎ হাত পা বাঁধা অবস্থায় শুয়ে সবকিছু দেখছিল। সে এবার তার বন্ধুর অবস্থা দেখে গর্জন করতে লাগল। টানাটানি করতে করতে সে বাঁধনগুলো খুলে যেতেই পলভিচের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে ভয়ে সাদা হয়ে গেল পলভিচ। আকুৎ এক ঝটকায় জ্যাকের উপর থেকে পলভিচকে ফেলে দিয়ে নখ দিয়ে তার গাটাকে চিরে দিয়ে তার গলায় দাঁত বসিয়ে এক সাংঘাতিক কামড় দিল। সঙ্গে সঙ্গে পলভিচের প্রাণটা বেরিয়ে গেল।
অনেক কষ্টে জ্যাকের হাতের বাঁধনগুলো খুলে দিল আকুৎ। জ্যাক উঠে দাঁড়িয়ে আর অপেক্ষা না করে আকুৎকে সঙ্গে করে ডোভারের পথে চলে গেল।
