টারজান আর জেন বাড়ি গিয়ে দেখল বুড়ি নিগ্রো নার্স এসমারাল্ডাই জ্যাককে মানুষ করছে পরম যত্নের সঙ্গে।
টারজনের সঙ্গে ছিল তার বিশ্বস্ত সহচর মুগাম্বি আর সেই আদিবাসী তরুণীটি যাকে একদিন একটা নৌকার পাটাতনে শুয়ে থাকতে দেখে। মেয়েটি পরিষ্কার বলে দেয় সে আর বাড়ি ফিরে যাবে না। সে টারজনের বাড়িতেই থেকে যাবে।
টারজনের এখন একমাত্র জীবিত শত্রু পলভিচ যে এখন আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
টারজনের পুত্র (দি সন অফ টারজান)
সেদিন একটা লম্বা নৌকা উগাম্বি নদীর উপর দিয়ে ভাটার টানে মোহানার দিকে ভেসে চলেছিল।
এমন সময় মাঝিরা দেখল নদীর পাড় থেকে ভূতের মত অস্থিচর্মসার একটা লোক হাত বাড়িয়ে তাদের ডাকছে। তার ডাক শুনে মাঝিরা লোকটাকে নৌকায় তুলে নিয়ে আবার মোহানার দিকে এগিয়ে। চলল। সেখানে সমুদ্রের মুখে ম্যাজোরি নামে একটা জাহাজ অপেক্ষা করছে নৌকারোহীদের জন্য।
আসলে লোকটা তার আসল নাম গোপন করে উদ্ধারকারীদের কাছে। সে হলো নিকোলাস রোকোফের সহচর পলভিচ। দশ বছর আগে রোকোফ যখন টারজনের হাতে ধরা পড়ে তখন পলভিচ জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে যায়।
ম্যাজোরি জাহাজে আশ্রয় পেয়েও ওদের সেবাযত্ন লাভ করে কিছুদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠল। পলভিচ। এখন আর তার মনে কারো প্রতি কোন প্রতিশোধ বাসনা নেই।
ম্যাজোরি জাহাজটা ভাড়া নিয়ে আফ্রিকার জঙ্গলে এসে এক বিশেষ কাঁচা মালের সন্ধান করতে থাকে একদল ধনী ব্যবসায়ী।
পলভিচকে নিয়ে ম্যাজোরি জাহাজটা অবশেষে সেই দ্বীপের কূলে গিয়ে ভিড়ল। দ্বীপটা নানারকম সারবান গাছের জঙ্গলে ভরা।
একদিন পলভিচ বনে শিকারীদের সঙ্গে গিয়ে একটা গাছতলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। এমন সময় কার স্পর্শে জেগে উঠে দেখে একটা বিরাট বাদর-গোরিলা তার পাশে বসে তার মুখটা খুঁটিয়ে দেখছে। পলভিচ ভয় পেয়ে গেল। পলভিচ বাঁদর-গোরিলাটা তার কোন ক্ষতি করছে না। তাই সে ভাবল একে যদি কোন শহরে নিয়ে যাওয়া যায় তবে তাকে বিক্রি করে অথবা খেলা দেখিয়ে অনেক টাকা পাওয়া যাবে।
নাবিকরা পলভিচের একটা বিরাটকায় বাদর দেখে তাদের দিকে ছুটে এল।
নাবিকরা পলভিচকে বাঁদরটা সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করতে লাগল।
কিন্তু পলভিচ শুধু সব সময় একটা কথা বলতে লাগল, বাঁদরটা আমার।
এরপর জাহাজের সবাই মিলে বাঁদরটার নাম দিল এ্যাজাক্স।
তারা দেখল এ্যাজাক্সের বয়স হয়েছে। কিন্তু বয়সে বুড়ো হলেও তার গায়ে তখনো প্রচুর শক্তি।
অবশেষে ইংল্যান্ডে গিয়ে জাহাজ ভিড়তেই বাঁদরটার প্রশিক্ষণের জন্য একজন ওস্তাদের কাছে গেল পলভিচ।
হারল্ড মূর নামে এক গৃহশিক্ষক কোন এক ব্রিটিশ লর্ডের বাড়িতে তার ছেলেকে পড়াত। কিন্তু শত চেষ্টাতেও সে ছেলেটির পড়ার কোন উন্নতি ঘটাতে পারছিল না। তাই সে একদিন ছেলেটির মার কাছে তার সম্বন্ধে অভিযোগ করল।
সে বলল, ওর আসল আগ্রহের বস্তু হলো দৈহিক শক্তির চর্চা আর আফ্রিকার জঙ্গলের আবিষ্কার সম্বন্ধে কোন বই পেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নিবিষ্ট মনে পড়ে যাবে।
ছেলের মা বলল, আপনি নিশ্চয় এসব বই পড়তে দেন না?
কিন্তু ওরা যার সম্বন্ধে আলোচনা করছিল সেই ছেলেটি ঘরের পাশে একটি গাছের ডালে চেপে বাঁদরের মত হুপ করে একটা শব্দ করে উঠল। তার মা ও গৃহশিক্ষক তাকে দেখে জানালার কাছে যেতে নাযেতে সে গাছ থেকে বারান্দায় লাফিয়ে পড়ে ঘরে চলে এল।
এরপর সে নাচতে নাচতে বলল, শহরের মিউজিক হলগুলোতে একটা আশ্চর্য বাঁদর-গোরিলাকে দেখানো হচ্ছে। কথা বলা ছাড়াও সে মানুষের মত অনেক কিছুই করতে পারে। আমি আজ গিয়ে দেখব মা? দয়া করে আমাকে যাবার অনুমতি দাও।
মা ছেলেটির গাল ধরে আদর করে বলল, না জ্যাক, তুমি ত জান, এসব প্রদর্শনীতে যাবার অনুমতি আমি কখনো দিই না।
হঠাৎ দরজা ঠেলে ছেলেটির বাবা এসে ঘরে ঢুকলো। ছেলেটির বাবা বলল, কোথায়? মা বলল, ও একটা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঁদর-গোরিলা দেখতে একটা মিউজিক হলে যেতে চায়। ছেলেটির বাবা বলল, কে এ্যাজাক্স? ছেলেটি ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ। তার বাবা বলল, চল আমিও যাব তোমার সঙ্গে। জেন, তুমিও চল না।
জেন ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে গৃহশিক্ষক মূরকে স্মরণ করিয়ে দিল, এখন তাকে পড়ার ঘরে গিয়ে জ্যাককে আবৃত্তি শেখাতে হবে।
মূর আর জ্যাক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে জেন তার স্বামী টারজানকে বলতে লাগল, দেখ জন, যেমন করে হোক জ্যাকের মন থেকে তোমার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রবৃত্তিগুলো দূর করে ফেলতে হবে যাতে বন্যজীবনের প্রতি কোন আকাক্ষা দানা বেঁধে উঠতে না পারে।
টারজান বলল, বন্যজীবনের প্রতি একটা আসক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার মধ্যে কোন সত্যিকারের বিপদ আছে বলে আমি মনে করি না।
সন্ধ্যের সময় জ্যাক আবার তার বাবার কাছে এ্যাজাক্সকে দেখতে যাবার কথাটা তুলল। কিন্তু টারজান বলল, তোমার মা যখন এটা চায় না, তখন আমি তোমাকে অনুমতি দিতে পারি না।
সন্ধ্যের পর এক সময় হঠাৎ মূর জ্যাকের ঘরের পাশ থেকে দেখল জ্যাক পোশাক পরে বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। মূর দরজার কাছে গিয়ে বলল, কোথায় যাচ্ছ জ্যাক।
জ্যাক বলল, আমি এ্যাজাক্সকে দেখতে যাচ্ছি।
মূর বলল, আমি তোমার ব্যবহারে লজ্জিত।
