গান্ট তাদের পথ দেখিয়ে উপকূলের কাছে নিয়ে গেল। কিন্তু সামান্য একটুর জন্য দেরী হয়ে গেছে। কাউরি জাহাজটা এইমাত্র ছেড়ে দিয়েছে। ওরা দেখল জাহাজটা পূর্ব দিকে এগিয়ে চলেছে ধীর গতিতে। জীবনে কখনো কোন ক্ষেত্রে হার মানেনি, আশা হারায়নি টারজান। কিন্তু জীবনে আজ প্রথম যেন হতাশার বেদনা অনুভব করল সে।
টারজান যখন তার শিবিরে ফিরে গেল সবার সঙ্গে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে।
হঠাৎ অন্ধকার বনভূমির মধ্যে একটা চিতাবাঘের ডাক শুনতে পেল ওরা। সে ডাক শুনে টারজানও জন্তুদের মত অদ্ভুতভাবে চীৎকার করে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শীতা এসে হাজীর হলো টারজনের সামনে। টারজান তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
হঠাৎ সমুদ্রের উপকূলভাগের কাছাকাছি একটা আলো দেখতে পেয়ে বলল, দেখ দেখ, আলো। নিশ্চয় ও আলোটা কাউরি জাহাজের। জাহাজটা এখন দাঁড়িয়ে আছে শান্ত হয়ে। একটা নৌকা যোগাড় করো কোনরকমে। আমরা ও জাহাজে হানা দিয়ে জাহাজটা দখল করে নেব।
গান্ট বলল, কিন্তু ওদের সকলের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র আছে। কিন্তু আমরা মাত্র পাঁচজন।
টারজান তার চিঅবাঘটার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার এই শীতা কুড়িটা সশস্ত্র লোকের সমান। এরপর যারা আসবে তারা সব একশোজন লোকের কাজ করবে।
এই বলে টারজান দাঁড়িয়ে মুখ তুলে বাঁদর-গোরিলাদের মত একটা জোর আওয়াজ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকুতের সঙ্গে ভয়ঙ্কর একদল বাঁদর-গোরিলা সেখানে এসে গেল। গান্ট তাদের ভয়ে। কাঁপতে লাগল।
একটু খুঁজতেই বেলাভূমির উপর কিছু দূর সরে যাওয়া নৌকা দুটা পেয়ে গেল তারা। আকুৎ ও তার। দলের সবাই আর শীতা নৌকাতে গিয়ে উঠল। এছাড়া ছিল গান্ট, টারজান, মুগাম্বি, সানিভাল আর জোনস। সমুদ্রের শান্ত জলের উপর দিয়ে কাউরি জাহাজের আলোটা লক্ষ্য করে তীর বেগে ছুটে যেতে লাগল নৌকা দুটো।
টারজান যা ভেবেছিল ঠিক তাই। কাউরি জাহাজটাই তখন দাঁড়িয়ে ছিল। ডেকের উপর একটা নাবিক ঝিমোচ্ছিল।
জাহাজের নিচের তলায় একটা কেবিনে তখন স্নাইদার জেনকে বশীভূত করার চেষ্টা করছিল। যে ঘরে জেনকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেই ঘরের একটা টেবিলের ড্রয়ারে একটা রিভলবার পেয়ে গিয়েছিল জেন। স্নাইদারের হাতে তখন কোন অস্ত্র না থাকায় স্নাইদারকে গুলি করার ভয় দেখিয়ে বেকায়দায় ফেলেছিল জেন।
এমন সময় ডেকের উপর থেকে একটা গোলমালের আওয়াজ আসতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে জেন আর সঙ্গে সঙ্গে রিভলবারটা কেড়ে নেয় স্নাইদার।
ডেকের উপর যে লোকটা পাহারা দিচ্ছিল সে ঝিমোতে ঝিমোতে একটা অচেনা লোককে জাহাজের মই বেয়ে উঠতে দেখে চীৎকার করে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা গুলি করে তার রিভলবার থেকে। শব্দ। শুনেই চমকে ওঠে জেন।
কিন্তু প্রহরীর গুলিটা কারো গায়ে লাগেনি বলে সে ভয়ে চীৎকার করে জাহাজের লোকজনদের ডাকতে থাকে। কিন্তু তার আগেই টারজান আর তার জন্তু-জানোয়ারগুলো ডেকের উপর উঠে ঘুরে। বেড়াতে থাকে ভয়ঙ্করভাবে।
কাউরি জাহাজের সশস্ত্র নাবিকরা জন্তু-জানোয়ারগুলোকে দেখে ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে। তারা। কম্পিত হাতে গুলি ছুঁড়লেও সে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে স্বাভাবিকভাবে। আকুতের বাদর-গোরিলাগুলো। তাদের দু-এক জনের গলা টিপে ধরতেই তারা ভয়ে পালিয়ে সামনের ঘরটাতে গিয়ে আশ্রয় নিল।
কাইশাং ছুটে পালাচ্ছিল। কিন্তু শীতা একটা নাবিককে শেষ করার পর কাইশংকে ধরল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেহের সব মাংস খেয়ে ফেলল সে।
এদিকে স্নাইদার যখন নিচের তলায় কেবিনটার মধ্যে জেনের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে জেনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার রিভলবারটা কেড়ে নিতে যাচ্ছিল ঠিক সইে সময় দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল টারজান। আদিবাসী মেয়েটি তখন ভয়ে নতজানু হয়ে জেনের কাছে বসেছিল।
কিছু না বলে পিছন থেকে স্নাইদারের গলাটা টিপে ধরল টারজান। স্নাইদার মুখ তুলে টারজানকে দেখেই ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। টারজান এত জোরে গলাটা তার টিপে ধরেছিল যে কোন কথা বলার সুযোগ পেল না সে। তার জিভটা বেরিয়ে আসতে লাগল। মুখটা নীল হয়ে গেল।
স্নাইদারের নিষ্প্রাণ দেহটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জেন আর আদিবাসী মেয়েটিকে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল টারজান। এসে দেখল সব লড়াই শেষ। মাত্র চারজন ছাড়া শত্রুদের সবাই খতম হয়েছে। তারা হলো স্মিথ, মাওরি আর তাদের দলের দু’জন নিগ্রো নাবিক।
টারজান তাদের বলল, হয় জাহাজে নাবিকের কাজ করো, না হয় মৃত্যুবরণ করো।
তারা সবাই নাবিকের কাজ করতে লাগল।
টারজনের নির্দেশমত জাহাজটাকে আবার জঙ্গল-দ্বীপের উপকূলে একবার আনা হলো। ঐ উপকূলে জন্তুগুলোকে ছেড়ে দেয়া হলো। তারা আবার জঙ্গলে চলে গেল। এবার জাহাজ চলল লন্ডনের পথে।
তিনদিন পর শোরওয়াটার নামে একটা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজের সংস্পর্শে এল কাউরি। সেই জাহাজের বেতারের মাধ্যমে লর্ড গ্রেস্টোক তার লন্ডনের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করল। জানল, তার ছেলেকে রোকোফ নিয়ে আসতে পারেনি। মোটা টাকার লোভে ছেলেটাকে রোকোফের হাতে তুলে না দিয়ে পলভিচ অন্য একজনের কাছে রাখে ছেলেটাকে। ঠিক করে মোটা টাকার ঘুষ নিয়ে ছেলেটাকে ফিরিয়ে দেবে। তাই সে জ্যাকের পরিবর্তে একই রকমের অন্য একটি ছেলেকে জাহাজে নিয়ে গিয়ে তুলে দেয় রোকোফের হাতে। আফ্রিকার কোন এক আদিবাসীদের গায়ে জেনের কোলে মারা যায় সেই ছেলেটি।
