টারজান তাদের লক্ষ্য করে বলল, বিদায় বন্ধু, তোমরা ছিলে আমার বিশ্বস্ত বন্ধু। তোমাদের ভুলতে পারব না জীবনে কখনো।
জেন বলল, ওরা কি আবার ফিরে আসবে?
টারজান বলল, আসতে পারে, আবার নাও আসতে পারে।
উপকূলের উপর নেমে দেখল কিনসেড জাহাজটা তখন সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জ্বলছে। এইভাবে দু’ঘন্টা জ্বলার পর জাহাজটা ডুবে গেল একেবারে।
দ্বীপের মধ্যে টারজনের প্রথম কাজ হলো ভাল জলের জায়গার কাছাকাছি শিবির স্থাপন করা। কোথায় জল আছে তা সে জানত এবং সেই জায়গায় শিবির স্থাপন করল। দলের নাবিকরা যখন শিবির স্থাপনের কাজ করছিল টারজান তখন মুগাম্বি আর সেই আদিবাসী মেয়েটিকে জেনের কাছে রেখে বনের মধ্যে শিকার করতে গেল।
দলের মধ্যে কে কি কাজ করবে তা সব ভাগ করে দিল টারজান। ঠিক হলো সারাদিন শিবিরের কাছে একটা বড় পাথরের উপর থেকে একজন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকবে, কোন জাহাজ আসছে কি না তা দেখবে। কোন জাহাজ দেখতে পেলেই পাহারাদার নাকিবদের কাছ থেকে নেওয়া একটা লাল জামা উড়িয়ে সংকেত দেখাবে। রাত্রিতে সেইখানে শুকনো ডালপালা দিয়ে একটা আগুন জ্বালিয়ে রাখা হলো।
কিন্তু কয়েকদিন কেটে গেলেও দিগন্তে সমুদ্রের উপর কোন জাহাজ দেখতে পাওয়া গেল না। টারজান তখন বলল, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে একটা বড় নৌকা তৈরি করতে হবে। তাই দিয়ে ওরা এই দ্বীপ থেকে মূল মহাদেশে গিয়ে উঠবে। সেখানে কোন জাহাজের দেখা পাওয়া যেতে পারে। টারজান নৌকা তৈরি কিভাবে করতে হয় তা জানে। কিন্তু তাকে সাহায্য করার জন্য লোকের দরকার। এ কাজে প্রচুর পরিশ্রম আর লোকের দরকার। এ ব্যাপারে সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করতে গিয়ে বন্দী নাবিকরা ক্রমে অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল।
টারজানদের শিবিরে যখন এইরকম গোলমাল চলছিল তখন তাদের উত্তর-পূর্ব দিকে কিছু দূরে কাউরি নামে একটা ছোট জাহাজ উপকূলভাগের একটা শাড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকতে শুরু করে। কারণ। এই জাহাজের দশজন নাবিক কিছু মুক্তোর লোভে সহসা বিদ্রোহী হয়ে উঠে অফিসারদের হত্যা করে। অফিসারদের পক্ষে কিছু অনুগত নাবিক যোগদান করলে তাদেরও হত্যা করা হয়। বিদ্রোহী নাবিকদের নেতা ছিল তিনজন, গান্ট নামে এক সুইডিশ, মমুলা মাওরি নামে এক নিগ্রো আর কাইশাং নামে একজন। চীনদেশীয় লোক।
যেদিন এই জঙ্গলদ্বীপের উপকূলভাগের খাড়ির মধ্যে কাউরি জাহাজটাকে ওরা লুকিয়ে রাখে তার আগের দিনই ওরা দক্ষিণ দিগন্তে একটা যুদ্ধ জাহাজের চিমনি দিয়ে ধোয়া উড়তে দেখে। যুদ্ধ জাহাজটাকে দেখে ওদের ভয় হয়। ওরা ভাবে ওদের বিদ্রোহ ও অফিসার হত্যার খবর পেয়েই হয়তো। যুদ্ধ জাহাজটা খোঁজ করছে ওদের।
কাইশাং আর মাওরি গান্টকে তাদের জাহাজটা ছেড়ে দিতে বলল ধরা পড়ার ভয়ে। কিন্তু গান্ট বলল, ও জাহাজ আমাদের ধরতে আসবে কেন? আমাদের বিদ্রোহের কথা কেউ জানে না।
একদিন টারজান দুপুরের দিকে হরিণ শিকার করতে যায় মুগাম্বিকে শিবিরে রেখে। মুগাম্বির সঙ্গে জোনস আর সালিভান নামে দু’জন অনুগত নাবিকও ছিল।
টারজান বেরিয়ে যেতেই কাইশাং ও তার দলের পাঁচজন লোককে শিবিরের কাছে এক জায়গায়। লুকিয়ে রেখে স্নাইদার হঠাৎ একসময় ব্যস্ত হয়ে শিবিরে গিয়ে মুগাম্বিকে বলে তার সঙ্গী স্মিথসকে বাঁদর গোরিলারা ধরেছে। তাকে মেরে ফেলবে। তুমি এখনি জোনস আর সালিভানকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যাও।
কথাটা শুনে মুগাম্বি শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই স্নাইদার কাইশাং-এর কাছে চলে গেল। বলল, চলে এস, শিবির ফাঁকা।
কাইশাং গিয়ে প্রথমে জেনকে বলল, চলে এস আমাদের সঙ্গে।
জেন কিছু বুঝতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। জেন উঠেই স্মিথসকে দেখতে পেল। বুঝল একটা দারুণ ষড়যন্ত্র চলছে। সে স্মিথসকে বলল, এর মানে কি?
স্মিথস বলল, আমরা একটা জাহাজ পেয়েছি। এখন আমরা এখান থেকে মুক্তি পেতে পারি।
জেন স্নাইদারকে বলল, তুমি তাহেল মুগাম্বিকে কোথায় পাঠালে?
স্নাইদার বলল, তারা আসবে না।
তখন কাইশাং-এর লোকজনরা জেন আর আদিবাসী মেয়েটিকে তুলে নিয়ে কাউরি জাহাজটার দিকে চলে গেল। কিছুটা দূরে থেকে গান্ট সব দেখল।
এদিকে মুগাম্বি যখন স্নাইদারের কথামত নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখল স্মিথস বা কোন বাঁদর-গোরিলা নেই, তখন সে বুঝতে পারল এর পিছনে কোন একটা চক্রান্ত আছে। তখন সে উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে শিবিরে ফিরে এসে দেখল শিবির শূন্য।
এমন সময় হরিণ না পেয়ে টারজান ফিরে এলে তার দুটো কুঁচকে উঠল।
টারজান বলল, কিন্তু জঙ্গলে ওরা জেনকে নিয়ে যাবে কোথায়? পালাবার জাহাজই বা পাবে কোথায়? এখন এস, ওদের খোঁজ করা যাক।
ওরা শিবির থেকে বার হতেই গান্ট এসে টারজনের সামনে দাঁড়াল।
গান্ট সরাসরি টারজানকে বলল, তোমাদের মেয়েদের ওরা চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে। যদি তাদের ধরতে চাও তাড়াতাড়ি এস আমার সঙ্গে। তা না হলে কাউরি জাহাজটা এখনি ছেড়ে দেবে।
টারজান বলল, কে তুমি? আমার স্ত্রীর অপহরণের কথা তুমি কি করে জানলে?
গান্ট বলল, আমি নিজে দেখেছি আমাদের দলের কাইশাং আর মমুলা মাওরি তোমাদের দলের দু’জন লোকের সঙ্গে চক্রান্ত করছিল। তাদের কথা আমি সব শুনেছি। কাইশাং আর মাওরি আমাকে তাদের শিবির থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তারা আমাকে খুন করতে চেয়েছিল। আমি পালিয়ে এসেছি শিবির থেকে।
