নদীর পাড় ধরে বরাবর মোহানার দিকে এগিয়ে চলল টারজান। এইভাবে অনেক দূর যাওয়ার পর সন্ধ্যা হয়ে এল। কূল থেকে টারজান দেখল সমুদ্রের কাছে নদীর বুকের উপর রোকোফের কিনসেড জাহাজটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। সে বেশ বুঝতে পারল রোকোফ এতক্ষণে নিশ্চয় জাহাজটায় উঠে গেছে।
এমন সময় পরপর দুটো গুলির শব্দ আর সঙ্গে সঙ্গে নারীকণ্ঠের এক আর্ত চীৎকার শুনে থাকতে পারল না টারজান। সে কুমীরের কথা ভুলে গিয়ে নদীর জলে আবার ঝাঁপ দিল।
এদিকে রোকোফ যখন তার দলবল নিয়ে নৌকায় করে কিনসেড জাহাজের দিকে আসছিল তখন। সে অন্য একটা নৌকাতে মুগাম্বি আর তার ভয়ঙ্কর পশু সঙ্গীগুলোকে দেখতে পায়। নৌকা দুটো কাছাকাছি হলে চিতাবাঘটা আবার হাঁ করে তাদের নৌকায় ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করে। রোকোফ তখন গুলি করতে বলে। গুলিটা অবশ্য কারো গায়ে লাগেনি। তবে নৌকার ভিতরে যে একজন আদিবাসী মেয়ে ছিল সে চীৎকার করে ওঠে ভয়ে। এই চীৎকারটা আর গুলির শব্দ শুনতে পায় টারজান।
বিদ্রোহী নাবিক দুটো যখন জেনের কাছ থেকে রাইফেলটা কেড়ে নেবার জন্য ধস্তাধস্তি করছিল তখন টারজান মই বেয়ে জাহাজের উপর উঠে পড়ে। সে গিয়ে সরাসরি নাবিক দুটোকে বলে এসব কি হচ্ছে?
এই বলে সে নাবিক দুটোকে ধরে ডেকের উপর থেকে সমুদ্রের জলে ফেলে দিল। তারপর জেনকে দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রোকোফ, পলভিচ আর জনাছয়েক নাবিক সেখানে গিয়ে হাজির হলো। রোকোফ টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে গুলি করার হুকুম দিল। টারজান জেনকে পাশের একটা কেবিনে ঢুকিয়ে দিয়ে রোকোফকে আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে গেল। রোকোফের পিছনে তার লোকেরা ছিল। রোকোফের দু’জন লোক গুলি করল তাদের রাইফেল থেকে। কিন্তু তাদের হাত তখন কাঁপছিল ভয়ে। কারণ তাদের পিছন দিক থেকে একদল ভয়ঙ্কর জন্তু এগিয়ে আসছিল তাদের দিকে। প্রথমে এল পাঁচজন। বাঁদর-গোরিলা, তারপর একটা চিতাবাঘ আর সবশেষে এক দৈত্যাকার নিগ্রোযোদ্ধা। রোকোফের লোকরা গুলি করার কোন অবকাশ পেল না।
রোকোফ ভয়ে পালিয়ে গিয়ে সামনের দিকে একটা ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিল। টারজনের বাঁদর গোরিলারা মুগাম্বির নেতৃত্বে রোকোফের লোকদের আক্রমণ করল।
টারজান রোকোফকেই খুঁজছিল। পরে সে দেখল রোকোফ তার নাবিকদের তাড়া খেয়ে বেরিয়ে আসছে ঘর থেকে।
কিন্তু তাকে দেখতে পেয়ে টারজান তার দিকে এগিয়ে যাবার আগেই শীতা ছুটে গেল তার দিকে। তার উপর শীতা ঝাঁপিয়ে পড়তেই রোকোফ চিৎ হয়ে পড়ে গেল। এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধবাসনায় সর্বাঙ্গ জ্বলছিল টারজনের। কিন্তু সে যখন দেখল শীতা তাকে সে প্রতিশোধ গ্রহণের কোন সুযোগ না দিয়ে রোকোফকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে, তখন সে শীতাকে বারকতক ডাকল। কিন্তু শীতা তার প্রভুর কথা শুনল না। শীতা রোকোফের মুখে একটা জোর কামড় বসিয়ে তার বুকটা কামড়াচ্ছিল।
আকুতের বাঁদর-গোরিলাগুলো তখন ভয়ঙ্করভাবে ঘোরাঘুরি করছিল জাহাজে। তারা জেনকে চিনতে না পেরে তার দিকেও দাঁত বার করে এগিয়ে আসছিল। টারজান তখন তাদের জেনের পরিচয়টা দিতে তারা শান্ত হলো।
রোকোফের দলের মধ্যে শুধু পলভিচকে পাওয়া গেল না। যে চারজন ঘরের মধ্যে ঢুকে ছিল তাদের প্রাণে না মেরে বন্দী করে রাখল টারজান। তারা নাবিক, জাহাজ চালনার কাজে লাগতে পারে। বাকি সবাই লড়াইয়ে নিহত হয়েছে।
সেদিন সন্ধ্যায় জেন আর টারজান যখন কিনসেড জাহাজের ক্যাপ্টেনের কেবিনের মধ্যে বসে পরস্পরের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছিল তখন তাদের অলক্ষ্যে অগোচরে কূলের উপর দাঁড়িয়ে একটা। লোক এক উন্মত্ত প্রতিহিংসায় জাহাজটার পানে তাকিয়েছিল। লোকটা হলো পলাতক পলভিচ।
সকাল হওয়ার কিছু পরে ঘুম থেকে জেগে উঠল টারজান। সে দেখল ঝড় থেমে গেছে। আকাশ পরিষ্কার সুতরাং জাহাজ ছাড়ার পথে আর কোন বাধা নেই।
টারজান নাবিকদের জাহাজ ছাড়ার নির্দেশ দিল।
জাহাজটা অবশেষে চলতে শুরু করল। উগাষি নদীর মোহানা পার হয়ে সেটা আটলান্টিক মহাসাগরে পড়ল। টারজান আর জেনের মনে তখন শুধু একটাই দুঃখ, তাদের ছেলেটার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না।
এমন সময় হঠাৎ একটা প্রবল বিস্ফোরণে একটা কেবিনের ছাদ উড়ে গেল। সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকাল সেইদিকে। কিন্তু এই বিস্ফোরণের কারণ কি তা বুঝতে পারল না। কিন্তু সকলেই সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করতে লাগল। একমাত্র টারজানই সাহস দিতে লাগল সকলকে। একমাত্র একটা নাবিক বুঝতে পারল এ হলো শয়তান পলভিচের কাজ। রাত্রিবেলায় পলভিচ লুকিয়ে তার কেবিনে ঢুকে জিনিসপত্র নেবার সময় কোন বিস্ফোরক পদার্থ রেখ যায়। কিন্তু সে কথা ভয়ে আর প্রকাশ করতে পারল না নাবিকটা।
টারজান দেখল তাদের বিপদ কাটেনি। জাহাজের কাঠে আগুন ধরে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা জাহাজটাই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। পাম্প করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দেখা গেল আগুন কমার থেকে বেড়ে যাচ্ছে আরো। ইঞ্জিন ঘরেও আগুন ধরে গেছে।
তখন টারজান নাবিকদের বলল, জাহাজটাকে আর বাঁচানো যাবে না। সুতরাং এখানে থেকে আর লাভ নেই। আর যে দুটো নৌকা আছে জাহাজে তা নামিয়ে দাও। এখান থেকে কূল বেশি দূরে নয়।
দুটো নৌকায় করে সকল মালপত্র নিয়ে বেলাভূমির দিকে এগিয়ে গেল ওরা। মাটিতে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকুতের দলের বাঁদর-গোরিলারা আর শীতা ছুটে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল।
