রোকোফের শিবির থেকে বেরিয়ে বনপথে উগাম্বি নদীর দিকে আসতে আসতে মাঝ পথে তার দলের সঙ্গে দেখা হলো টারজনের। কিন্তু তারা জেন বা রোকোফের কথা কিছু বলতে পারল না। অথচ টারজান বাতাসের গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারল কিছু আগে জেন আর রোকোফ দুজনেই এই পথে নদীর দিকে গেছে।
তখন টারজান ওদের সঙ্গে করে নদীর ধারে এল। নদীর পারে একটা গাছের উপর চড়ে টারজান দেখতে পেল দূরে একটা ছোট নৌকায় রোকোফ একা দাঁড় বাইছে। টারজান তখন নদীর ধারে ধারে রোকোফকে লক্ষ্য করে উধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। রোকোফের কাছাকাছি এসে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। তার দলের সবাই নদীর ধারে এগিয়ে চলল।
এদিকে টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মত মনে হতে লাগল রোকোফের। সে দেখল টারজনের সঙ্গে সেই সব ভয়ঙ্কর জন্তুগুলোও রয়েছে।
নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে রোকোফের নৌকার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান। নৌকার কাছে গিয়ে নৌকাটাকে হাত বাড়িয়ে ধরতেই রোকোফ দাঁড়ের কাঠটা দিয়ে টারজনের মাথায় জোর একটা ঘা দিল আর এমন সময় একটা কুমীর টারজনের একটা পা ধরে তাকে জলের ভিতর দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। রোকোফ দেখল টারজান হঠাৎ জলে ডুবে গেল। সে তখন নৌকাটাকে জোরে চালাতে লাগল। তবু তার ভয় গেল না।
ক্রমে রোকোফের নৌকাটা কিনসেড জাহাজের কাছে এসে পড়ল। জাহাজটা তখনো দাঁড়িয়ে আছে দেখে আশা হলো তার।
ক্ষিপ্ত হাতে দাঁড় বেয়ে জাহাজের কাছে এসে নৌকার উপর থেকে ডাকতে লাগল পলভিচকে। কিন্তু কেউ তার ডাকে সাড়া দিল না। মনে হলো জাহাজে কোন লোক নেই। এদিকে নদীর পাড়ে সেই ভয়ঙ্কর জন্তুগুলো তখনো গর্জন করছিল। তার ভয় হলো নিগ্রোটা হয়ত কোন নৌকা যোগাড় করে জাহাজে গিয়েও তাকে ধরবে।
কিন্তু কোথায় গেল পলভিচ? তবে কি ওরা জাহাজে কেউ নেই।
তবু সাহসে ভর করে জাহাজের কাছে দাঁড় বেয়ে গিয়ে জাহাজের গায়ে লাগানো মইটাকে ধরে ফেলল রোকোফ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের ডেকের উপর থেকে রাইফেল হাতে জেন চীৎকার করে বলল, খবরদার, জাহাজে ওঠার চেষ্টা করলেই গুলি করে মারব। রোকোফ এবার জেনকে কোনরকম ভয় না দেখিয়ে অনেক অনুনয় বিনয় করল। কিন্তু তাকে কিছুতেই জাহাজে উঠতে দিল না জেন।
রোকোফ তখন কোন উপায় না দেখে নৌকাটাকে কোনরকমে জাহাজের কাছে ফেলে রেখে কূলের দিকে চলে গেল।
এর আগে রোকোফ জেনের নৌকাটা ধরার জন্য খুব জোরে দাঁড় বাইতে থাকলেও জেন তার থেকে দু’ঘণ্টা আগেই অপেক্ষমান কিনসেড জাহাজটাতে গিয়ে ওঠে। সেও জাহাজটাকে দেখে আশান্বিত হয়ে ওঠে। ভাবে রোকোফ এখন সে জাহাজে না থাকায় নাবিকদের টাকা দিয়ে বশ করে সে জাহাজটাকে সভ্যজগতের কোন বন্দরে নিয়ে যেতে বলবে।
তখন নৌকা থেকেই জাহাজের গায়ে ঝুলতে থাকা শিকলটা ধরে ফেলল জেন। তারপর নৌকাটাকে ছেড়ে দিয়ে কোন রকমে মইটাতে উঠে পড়ল। সোজা ডেকের উপর উঠে গিয়ে জেন দেখল সারা জাহাজটার মধ্যে দু’জন নাবিক ছাড়া আর কেউ নেই। তারা মদ খেয়ে নেশার ঘোরে একটা কেবিনের মধ্যে ঘুমোচ্ছিল। জেন, দরজায় শিকল তুলে দিয়ে ডেকের উপর বসে রাইফেল হাতে পাহারা দিতে লাগল।
একঘণ্টা নিরাপদে কেটে গেল। কিন্তু এমন সময় জেন দেখল কিনসেড জাহাজের যেসব নাবিক কয়লা আনার জন্য কূলে গিয়েছিল তারা কূল থেকে একটা নৌকায় করে উজান বেয়ে জাহাজের দিকে আসছে। তাদের দলে পলভিচও ছিল। জেন এবার ভয় পেয়ে গেল।
জেন আরও দেখল নদীর অপর পার হতে একটা নৌকায় করে পাঁচটা ভয়ঙ্কর বাঁদর-গোরিলা, একটা চিতাবাঘকে সঙ্গে করে একটা নিগ্রো যোদ্ধা এদিকেই আসছে।
এখানে আর থাকা যুক্তিসঙ্গত নয় ভেবে নাবিক দুটোকে কেবিন থেকে মুক্ত করে জাহাজ ছেড়ে দেবার কথা বলল। তার কথা না শুনলে তাদের গুলি করবে বলে ভয় দেখাল। তারা জাহাজ ছাড়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকলে জেন আবার ডেকে এসে পাহারা দিতে লাগল।
এদিকে নাবিকদুটো যখন জাহাজের উপর থেকে দেখল তাদের মালিক আর অন্য নাবিকরা একটা নৌকায় করে জাহাজের দিকে আসছে তখন তারা সাহস পেল। তখন তারা অতর্কিতে জেনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে রাইফেলটা কেড়ে নিল।
টারজান যখন দেখল একটা কুমীরে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তখন সে তার পাথরের ছুরিটা কুমীরের পেটটার নরম অংশ দেখে তার মধ্যে বার বার ঢুকিয়ে দিতে লাগল।
টারজান দেখল কুমীরটা তার ছুরির আঘাতে হাঁপাচ্ছে এবং কিছু পরেই তার দেহটা শক্ত হয়ে গেল। সে যখন বুঝল কুমীরটা মারা গেছে তখন টারজান নদীর ধারে যে গাছের একটা ডাল জলের উপর ঝুলে পড়ে ছিল সেটা ধরে সেই গাছটার উপর উঠে পড়ল।
গাছটার উপর কিছুক্ষণ বসে থেকে বিশ্রাম করতে লাগল টারজান। সে দেখল নদীর যে পার থেকে সে ঝাঁপ দিয়েছিল জলে সেই পারেই সে উঠেছে। তবে রোকোফের নৌকাটাকে আর দেখতে পেল না। গাছ থেকে নেমে কিছু ঘাস থেঁতো করে পায়ের ক্ষতস্থানটায় লাগিয়ে দিল।
নানারকমের চিন্তা হচ্ছিল তখন তার মনে। তম্বুদজা তাকে কথায় কথায় এক সময় বলেছিল তাদের গাঁয়ে জেনের কোলে একটা বাচ্চা ছেলে ছিল সেটা মারা যায়। টারজান ভাবল সেটা হয়ত তারই ছেলে। আবার ভাবল আসলে হয়ত সে জেন নয় এবং ছেলেটাও তার নয়। জেন হয়ত রোকোফের হাতে ধরা পড়েনি এবং সে এখানে লন্ডনের বাড়িতেই আছে।
