আবার তারা এগিয়ে যেতে লাগল।
পথে দু-একজন পথচারীর কাছ থেকে ওরা জানেত পারল একজন লোক তাদের সন্ধানে তাদের পিছনে পিছনে আসছে। তবে এখনো দূরে আছে।
যেতে যেতে এ্যান্ডারসন জেনকে বলল, মাইলখানেকের মধ্যেই একটা গাঁ আছে। আপনি সেখানে ছেলেটাকে নিয়ে চলে যান। গাঁয়ের সর্দারকে আপনি সব কথা বলবেন। সে আপনাকে জাহাজের ব্যবস্থা, করে দেবে যাতে আপনি সভ্য জগতে চলে যেতে পারেন। আমি এইখানে থাকব। রোকোফকে বলল, আপনি মারা গেছেন। তাহলে ও আর আপনার খোঁজ করবে না। বিদায়, আপনি চলে যান। আমার এই রাইফেলটা আর গুলিগুলো নিয়ে যান।
এই বলে রোকোফের হাতে ধরা দেবার জন্য সেখান থেকে চলে গেল সেভেন এ্যান্ডারসন।
আধ ঘণ্টা পরে গাঁটায় পৌঁছল জেন। তাকে দেখে ঘিরে ধরল গাঁয়ের মেয়েরা। ছেলেটা হঠাৎ দারুণ অসুস্থ হওয়ায় সে কথা তাদের কোনরকমে বোঝাল জেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। মাঝরাতের দিকে জেনের কোলের মধ্যেই মারা গেল শিশুটা।
এমন সময় গায়ের সর্দার মগনওয়াজাম এসে জেনকে নানা কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগল। লোকটাকে দেখে কুটিল প্রকৃতির বলে মনে হলো জেনের।
জেন শুনতে পেল গায়ের গেটের কাছে কারা যেন এসেছে বাইরে থেকে। কথাবার্তার শব্দ আসছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনের কাছে এসে তার নাম ধরে কে ডাকল।
মুখ তুলে আগুনের আলোয় দেখল জেন, তার সামনে রোকোফ দাঁড়িয়ে আছে।
রোকোফ এসেই বলল, ছেলেটাকে এখানে আনার জন্য এত কষ্ট করে এখানে এলে কেন? তার থেকে আমাকে বললেই ত হত। এখন দাও ওকে আমার হাতে।
জেন নীরবে তার হাত থেকে ছেলেটাকে তুলে দিল রোকোফের হাতে। বলল, ও তোমাদের সব পীড়নের বাইরে চলে গেছে।
ছেলেটার মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে রোকোফ দেখল, সত্যি সত্যিই ছেলেটা মারা গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে এক প্রচণ্ড রাগে জ্বলে উঠল রোকোফ।
তার রাগ দেখে জেন বুঝল এটা যে তার ছেলে নয় রোকোফ তা জানে না। না জানাটাই ভাল, তাহলে তার ছেলে যেখানেই থাক নিরাপদে থাকতে পারবে।
রোকোফ বলল, আমার কাছ থেকে ছেলেটাকে ছিনিয়ে নিয়েছ। তা নাও, এবার তোমার পালা। তোমাকে নরখাদক মগনওয়াজামের হাতে তুলে দেব। তুমি হবে নরখাদকের স্ত্রী।
তারপর রোকোফ জেনকে সঙ্গে করে একজন আদিবাসীকে নিয়ে গা পার হয়ে তার শিবিরের পথে যেতে লাগল।
শিবিরে গিয়ে জেন দেখল সেখানে কিসের গোলমাল চলছে। রোকোফ গিয়ে শুনল, তার দলের আরো কিছু লোক তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গেছে শিবির থেকে। কথাটা শুনে রাগে চেঁচামিচি করতে লাগল রোকোফ। পরে জেনের হাত ধরে টানতে টানতে তার ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল রোকোফ। জেন বাধা দিলে তার মুখে একটা ঘুষি মারল রোকোফ।
হঠাৎ এই সময় ঘরের বাইরে কিসের গোলমাল হতে রোকোফ জেনের উপর থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে সেই দৃষ্টি ছড়িয়ে দিল। সেই অবসরে জেন চোখের পলকে রোকোফের বন্দুকটা টান মেরে হাতে নিয়ে তার বাঁট দিয়ে রোকোফের মাথায় সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল রোকোফ। জেন তখন রোকোফের কোমর থেকে লম্বা ছুরিটা দিয়ে তাই নিয়ে তাঁবুর পিছনের খানিকটা কেটে তার পালাবার পথ করে নিল।
এদিকে বুড়ি তম্বুদজা টারজানকে সঙ্গে করে রোকোফের তাঁবুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। রোকোফের তাঁবুতে গিয়ে দেখল সেখানে খুব গোলমাল চলছে।
সেই দিন সকালে জেন চলে যাওয়ার পর রোকোফের জ্ঞান ফিরে এলে সে দেখে সে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল এতক্ষণ এবং জেন পালিয়ে গেছে শিবির থেকে। এমন সময় মগনওয়াজামের গাঁ থেকে দূত মারফৎ খবর আসে টারজান ঐ গাঁয়ে আটক ছিল এবং আজ রাতেই তাকে হত্যা করা হত, কিন্তু সে পালিয়ে যায় এবং হয়তো এই শিবিরেই সে আসবে রোকোফের সন্ধানে।
এই খবরটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোকোফের নিগ্রো ভৃত্যরা সব টারজনের আসার খবর পেয়েই শিবির থেকে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে গেল। শিবিরে রয়ে গেল শুধু রোকোফ আর তার সাতজন শ্বেতাঙ্গ নাকিব।
এই সব অবাঞ্ছিত ঘটনার জন্য রোকোফ কিন্তু তার শ্বেতাঙ্গ নাবিকদের দায়ী করতে লাগল। এতে নাবিকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠায় রোকোফ শিবির ছেড়ে পালিয়ে যাবে ঠিক করে ফেলল। শিবির থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখতে পায় শিবিরের সামনে দিয়ে টারজান তারই খোঁজে আসছে। তাতে তার ভয় আরো বেড়ে যায়।
এদিকে বুড়ি তদজার সঙ্গে শিবিরে এসে টারজান দেখল রোকোফ বা জেন কেউই সেই শিবিরে নেই। নাবিকদের কাছ থেকে জানতে পারল, বন্দিনী মহিলাটি আগেই পালিয়ে যায়। রোকোফ পালায় তার পরে।
টারজান তখন যে পথে তারা পালিয়েছে সেই পথ ধরে বেরিয়ে পড়ল তাদের খোঁজে।
টারজান জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যে পথে যাচ্ছিল সেই পথেই তার সামনে অনেক দূরে জেন তখন একা উগাম্বি নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে চলছিল।
নদীর ঘাটে গিয়ে জেন দেখল একটা নৌকা কাছেই একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। দড়িটা খুলে নৌকাতে উঠতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখে পড়ল রোকোফ নদীর পাড়ে এসে পড়েছে এবং সে তাকে থামতে বলছে এবং ভয় দেখাচ্ছে না থামলে তাকে গুলি করে মারবে। অথচ জেন দেখল সে একা এবং তার কাছে কোন অস্ত্র নেই।
নৌকাটা নদীর স্রোতের টানে ছুটে যেতে শুরু করতেই জেন দেখতে পেল রোকোফ কোথা থেকে একটা ছোট ডিঙি নৌকা বার করল ঘাটের পাশ থেকে। জেন বুঝতে পারল রোকোফ ঐ নৌকাটা করে ধরতে আসবে তাকে। রোকোফের হাতে আবার ধরা পড়ার ভয়েতে প্রাণপণ শক্তিতে দাঁড় বাইতে লাগল জেন।
