তাদের কাছে টারজান জানতে পারল রোকোফ আগের দিন রাত্রিবেলাতেই তার শ্বেতাঙ্গ সহচরদের নিয়ে নৌকায় করে পালিয়ে গেছে।
টারজান আর বৃথা লড়াই করল না। সে তার দলের সবাইকে নিয়ে নৌকায় করে রোকোফের খোঁজে চলে গেল।
এবারেও টারজান দেখল কোন গাঁয়ে গেলে পশু-সঙ্গীদের ভয়ে কোন আদিবাসী কথা বলছে না তার সঙ্গে। সে তাই এক জায়গায় তার দলের সবাইকে মুগাম্বির হাতে ছেড়ে রেখে একাই বেরিয়ে পড়ল রোকোফের খোঁজে।
একদিন বন পথে যেতে যেতে একটা দৃশ্য দেখে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল টারজান। একটা ঝোপের মধ্যে একজন অসুস্থ ও রুগ্ন শ্বেতাঙ্গ শুয়েছিল আর একজন নিগ্রো যোদ্ধা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছিল।
টারজান নিগ্রোটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার হাতের বর্শাটা কেড়ে নিল। নিগ্রোটা আত্মসমর্পণ না করায় টারজান তাকে মেরে ফেলল। তারপর দেখল এই শ্বেতাঙ্গটাই রোকোফের কিনসেড জাহাজে রাঁধুনীর কাজ করত। টারজান তাই ভাবল এও নিশ্চয় রোকোফের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল এবং সব খবর জানে। লোকটার নাম সেভেন এ্যান্ডারসন।
টারজান তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, আমার স্ত্রী আর ছেলে কোথায়?
সেভেন কাশছিল। তার বুকে তীরটা তখনো বিধে ছিল। তার বুক থেকে রক্ত ঝরছিল। কাশিটা থামলে সেভেন বলল, আমি তোমার স্ত্রী আর ছেলেকে রোকোফের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য পালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রোকোফ এসে আমাদের ধরে ফেলে। আমাকে এইখানে ফেলে রেখে তারা চলে যায়। তোমার স্ত্রী ও ছেলে আবার ধরা পড়েছে তার হাতে। তুমি তার খোঁজে চলে যাও।
একটু আগে রাগের মাথায় তাকে হত্যা করতে যাচ্ছিল টারজান। কিন্তু এখন এবার সব কথা শুনে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তার কাছে ক্ষমা চাইল। কিন্তু সেভেন একবার জোর কেশে তখনি মারা গেল।
সেদিন সন্ধ্যা হতেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। সাত দিন ধরে বৃষ্টি সমানে চলতে লাগল।
সাত দিনের দিন মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঠল আকাশে। কিন্তু টারজান কোন দিকে রোকোফের খোঁজে যাবে তা ঠিক করতে পারল না।
অনেক ভাবার পর অবশেষে উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। পরের দিন সে একটা আদিবাসী গাঁয়ে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে গাঁয়ের লোকেরা ছুটে পালাত লাগল। কিন্তু টারজানও ছাড়ল না। সে তাড়া করে একজন যুবককে ধরে ফেলল। যুবকটা তাকে দেখে এতখানি ভয় পেয়ে গেল যে সে তার হাত থেকে সব অস্ত্র ফেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল টারজনের পায়ের কাছে।
টারজনের অনেক প্রশ্নের উত্তরে নিগ্রো যুবকটি যা যা বলল তার থেকে বুঝতে পারল টারজান। দিনকতক আগে কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ এসেছিল। তারা বলে গেছে এক ভয়ঙ্কর শ্বেতাঙ্গ শয়তান পরে তাদের গাঁয়ে আসবে। তার সঙ্গে থাকবে একদল হিংস্র জন্তু।
কিন্তু টারজনের সঙ্গে কোন হিংস্র জন্তু জানোয়ার না দেখে সাহস হলো যুবকটির।
টারজান যুবকটিকে সঙ্গে করে তাদের গায়ে চলে গেল।
ওদের সর্দারকে ডেকে আনাল। সে দেখল সর্দার লোকটা বেঁটে এবং বলিষ্ঠ চেহারার। তার মুখটা কুটিল প্রকৃতির। টারজান বুঝল এরাও নরখাদক। টারজনের প্রশ্নের উত্তরে সর্দার যা বলল তার থেকে। বোঝা গেল একজন শ্বেতাঙ্গ দিনকতক আগে তাদের গায়ে এসেছিল বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে কোন নারী বা শিশু ছিল না। এতে টারজনের সন্দেহ হলো সর্দার ঠিক বুলছে না। তবু টারজান সে রাতটা তাদের গাঁয়েই কাটাবার কথা বলল।
সর্দার এ কথায় উৎসাহিত হয়ে তার একটা ঘর ছেড়ে দিল। কিন্তু সে ঘরে আর এক বুড়ি স্ত্রী ছিল। বুড়িকে রাত্রিতে ঘর থেকে বার করে দিলে ঠাণ্ডায় কষ্ট হবে তার একথা ভেবে টারজান সেই ঘরে রইল না। সে অন্য ঘরে থাকার জন্য জেদ ধরলে তাকে অন্য একটা ঘর দেওয়া হলো।
সন্ধ্যার পর যখন ওদের নাচ শুরু হলো এবং গাঁয়ের সবাই যখন উৎসবে মেতে ছিল তখন টারজান সেই কুঁড়ে ঘরটার মধ্যে একা বসে ভাবছিল। এমন সময় একটা বুড়ি চুপি চুপি সেই অন্ধকার ঘরটায় ঢুকে টারজানকে চুপি চুপি বলল, আমার নাম তমুদজা। আমি সর্দার মগনওয়াসামের প্রথমা স্ত্রী। আমার কথা শোন। ওরা তোমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে। তুমি ঘুমিয়ে পড়লেই ওরা তোমাকে হত্যা করবে।
মূৰ্ছিত জেন চেতনা ফিরে পেয়ে দেখল, ছেলেটাকে কোলে করে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এ্যান্ডারসন। তার মুখখানা বিষাদে ভরা।
জেন বলল, আমার ছেলে কোথায়? এ ছেলে আমার নয়। তুমি তা জানতে। তুমিও রোকোফের মতই শয়তান।
এ্যান্ডারসন আশ্চর্য হয়ে বলল, তা ত জানি না। তাহলে নিশ্চয় দুটো ছেলে ছিল। কিন্তু আমি তার কিছুই জানতাম না।
তার কথা শুনে জেন বুঝতে পারল আসলে এ্যান্ডারসনের সততায় কোন সংশয় নেই। সে ঠিকই বলেছে।
এমন সময় এ্যান্ডারসনের কোলের মধ্যে শিশুটা কেঁদে উঠল। হাত বাড়িয়ে এ্যান্ডারসনের কাছ থেকে সেই অসহায় শিশুটাকে নিজের কোলে তুলে নিল জেন। হতাশার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে একটা আশা জাগল, হয়ত বা শেষ মুহূর্তে তার ছেলে জ্যাককে কেউ উদ্ধার করেছে রোকোফের হাত থেকে।
এ্যান্ডারসন বলল, এখন তাহলে কি করব আমরা? আমি কিনসেড জাহাজে ফিরে গেলে রোকোফ আমাকে গুলি করে মারবে। কিন্তু আপনি সেখানে ফিরে যেতে পারেন।
জেন বলল, না আমি মৃত্যুবরণ করব, তবু তার কাছে আর ফিরে যাব না। তার থেকে এই অসহায় শিশুটাকে নিয়ে চল আমাদের সঙ্গে।
