জেন বলল, তুমি ভয় দেখিয়ে আমাকে বশীভূত করতে পারবে না।
জেনের অনমনীয় মনোভাব দেখে আরো রেগে গেল রোকোফ।
কিন্তু রোকোফ দমে গেল না। উত্তেজনায় কাঁপছিল সে। জেনের দিকে সে ভয়ঙ্করভাবে এগিয়ে গিয়ে তার দু’হাত দিয়ে গলাটা টিপে ধরল।
এমন সময় কেবিনের দরজাটা ঠেলে এ্যান্ডারসন জেনের খাবার নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। রোকোফ তাকে দেখেই বাধা পেয়ে চীৎকার করে উঠল, বিনা অনুমতিতে কেন তুমি ঘরে ঢুকলে? এখনি বেরিয়ে যাও, তা না হলে তোমাকে জলে ফেলে দেব।
এই কথা বলে রোকোফ ভয়ঙ্করভাবে এগিয়ে যেতেই এ্যান্ডারসন তার পোশাকের ভিতর লুকিয়ে রাখা ছুরিটা তার একটা হাত দিয়ে ধরতে গেল।
রোকোফ তা দেখে জেনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ঠিক আছে, আমি তোমাকে আগামীকাল পর্যন্ত সময় দিলাম ভেবে দেখার জন্য। পলভিচ আর আমি ছাড়া এ জাহাজে ইতোমধ্যে কেউ থাকবে না। সকলকেই কূলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। আমার ছাড়া এ জাহাজে থাকবে তুমি আর তোমার ছেলে।
রোকোফ কথাগুলো বলল ফরাসী ভাষায়। ভাবল এ্যান্ডারসন তা বুঝতে পারবে না। কথাটা বলেই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল রোকোফ। এ্যান্ডারসন তখন জেনকে বলল, ও ভাবে আমি বোকা। কিন্তু আসলে ও-ই বোকা।
জেন আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি ওর কথা বুঝতে পেরেছ?
এ্যান্ডারসন বলল, হ্যাঁ। আমি বাইরে থেকেও ওর সব কথা শুনেছি। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। ও আমাকেও কুকুরের মত জ্ঞান করে। আমি আপনাকে সাহায্য করব।
কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে না পারলেও লোকটার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জাগল জেনের। এত সব শত্রুদের মাঝে অন্তত সহানুভূতিশীল একটা বন্ধুকে এতদিনে খুঁজে পেল সে।
সেদিন আর রোকোফের দেখা পেল না জেন। সন্ধ্যের সময় সেভেন এ্যান্ডারসন খাবার দিতে এল। তার উদ্ধারের ব্যাপারে জেন তার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাইলে সেভেন জেনকে বলল, আপনি আপনার জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবেন, আমি এলেই বেরিয়ে পড়বেন।
জেন বলল, কিন্তু আমার ছেলে? তাকে ছাড়া আমি ত যেতে পারব না।
সেভেন বলল, আমি আপনাকে সাহায্য করছি। এর বেশি কিছু জানতে চাইবেন না।
কিছুক্ষণের মধ্যে দরজা ঠেলে সেভেন এসে হাজির হলো। তার হাতে একটা পুঁটলি আর এক হাতে কাপড় ঢাকা কি একটা জিনিস। সেভেন সেটা জেনের হাতে দিয়ে বলল, এই নিন আপনার ছেলে। কোন শব্দ করবেন না।
কাপড় ঢাকা ছেলেটাকে বুকে চেপে ধরল জেন। আনন্দে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। আর দেরী না করে কেবিন থেকে বেরিয়ে মই বেয়ে জাহাজ থেকে নেমে নৌকাতে উঠে পড়ল। নৌকাতে উঠেই নৌকা ছেড়ে দিল সেভেন। নৌকাটা তীরবেগে ছুটে চলল উগাম্বি নদীর উপর দিয়ে।
রাত তিনটের সময় নদীর ধারে একটুখানি ফাঁকা জায়গায় কতকগুলো কুঁড়ে ঘরের একটা আদিবাসী বস্তি দেখে সেইখানে নৌকা ভেড়াল এ্যান্ডারসন। জেনকে নৌকা থেকে নামিয়ে নৌকাটা একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখল। তারপর দুজনে ঘরগুলোর দিকে এগিয়ে এল।
এ্যান্ডারসন বারকতক ডাকাডাকি করতেই সর্দার আর তার স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গাঁয়ের গেট খুলে দিল। এ্যান্ডারসন আবিদাসীদের ভাষায় সর্দারের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলল। সর্দারের স্ত্রী তাদের থাকার জন্য একটা ঘর দিতে চাইল। কিন্তু ঘরটা নোংরা হবে ভেবে সে বলল, তারা বাইরেই শোবে।
সকালে ঘুম ভাঙ্গলে জেন দেখল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। আদিবাসী মেয়েরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে তার চারদিকে।
সর্দারের নির্দেশে আদিবাসীরা সবাই সরে গেল জেনের কাছ থেকে। এ্যান্ডারসন কিছুটা দূরে কথা বলতে লাগল সর্দারের সঙ্গে। জেন বুঝল এ্যান্ডারসনকে এর আগে যতখানি অযোগ্য ভেবেছিল ততখানি অযোগ্য সে নয়। গত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সে তার যোগ্যতা আর বিচক্ষণতার যথেষ্ট পরিচয় দিয়েছে। জেন দেখল ইংরেজি, ফরাসী আর পশ্চিম উপকূলের আদিবাসীদের ভাষায় ভালভাবেই কথা বলতে পারে এ্যান্ডারসন।
এমন সময় জেনের কোলে ছেলেটা কেঁদে উঠতেই কাপড়টা সরিয়ে তার মুখটা দেখল জেন। কিন্তু দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভূত দেখার মত চমকে উঠল ভয়ে। তারপরই সেখানে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেল।
নিগ্রো যোদ্ধারা তখন সবাই ঘরটার পানে তাকিয়ে দেখল একটা চিতাবাঘ গর্জন করতে করতে এই দিকে আসছে। তার উপর টারজনের গলার স্বর শুনে একদল বাঁদর-গোরিলা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গায়ের দিকে আসছে। গাঁয়ের সর্দারই প্রথমে গোরিলাদের নেতা আকুৎকে দেখতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজে জঙ্গলের দিকে ভয়ে ছুটে পালাতে থাকে। তার দেখাদেখি গাঁয়ের অন্য সব লোকেরাও প্রাণভয়ে ছুটতে থাকে।
আকুৎ তার দলের গোরিলাদের নিয়ে টারজনের পাশে ছুটে এসে দাঁড়াল। তখন শীতাও এসে পড়েছে। টারজান তখন তার দুই পায়ের বাঁধনগুলো থেকে মুক্ত হতে চাইছিল। কিন্তু ওর কথা বাদর গোরিলারা বা শীতা বুঝতে পারছিল না কেউ।
সারাটা রাত এমনিভাবে কেটে গেল। টারজান হাত পা বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল সেইখানে। গাঁ থেকে সব লোক পালিয়ে জঙ্গলে চলে গিয়েছিল। সকাল হতেই তারা আবার গাঁয়ে আসার চেষ্টা করতে লাগল।
এমন সময় হঠাৎ কোথা থেকে ছুটতে ছুটতে মুগাম্বি এসে হাজির হলো। মুগাম্বি এসেই ছুরি দিয়ে টারজনের সব বাঁধন কেটে দিল। টারজান তখন মুগাম্বিকে সঙ্গে নিয়ে একটা মৃত আদিবাসীর বর্শাটা নিয়ে আদিবাসীদের তেড়ে গেল। আদিবাসীরা আগের থেকে আরো বেশি ভয় পেয়ে গেল। কয়েকজন আদিবাসী বন্দী হলো টারজনের হাতে।
