রোকোফ নৌকা থেকে নেমেই সর্দারকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার লোকরা যার কথা বলল, সেই শ্বেতাঙ্গ কোথায়?
সর্দার বলল, আমাদের গায়েতেই আছে, ঘুমোচ্ছে। সে তোমার বন্ধু না শত্রু জানি না। তবে সে তোমার খোঁজ করছিল।
সর্দারের পিছু পিছু রোকোফ আর তার দলের লোকেরা পা টিপে টিপে টারজান যেখানে ঘুমোচ্ছিল সেখানে গিয়ে হাজির হলো। সর্দার গিয়ে দেখল টারজান তখনো ঘুমোচ্ছে। রোকোফ দেখেই চিনতে পারল টারজানকে। এক কুৎসিত শয়তানি হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। সর্দার যখন বুঝতে পারল ঘুমন্ত টারজান রোকোফের শত্রু তখন সে তার লোকদের টারজান জেগে ওঠার আগেই তার হাত পা বেঁধে ফেলার হুকুম দিল। টারজানকে রোকোফ বলল, শুয়োর কোথাকার! রোকোফের পথ থেকে দূরে সরে। দাঁড়াবার মত সুবুদ্ধি এখনো আসেনি তোমার মাথার মধ্যে?
এই কথা বলে টারজনের মুখে একটা লাথি মারল রোকোফ।
টারজান বলল, তোমাকে অভ্যর্থনা করার জন্যই সে বুদ্ধি আমার মাথায় আসেনি।
রোকোফ বলল, ঠিক আছে আজ রাতে আমার নরখাদক ইথিওপ বন্ধুরা তোমাকে খেয়ে ফেলার আগেই তোমার স্ত্রী ও ছেলের কি অবস্থা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কি হবে বলবে তাকে।
যে গাঁটায় হাত পা বাঁধা অবস্থায় বন্দী ছিল টারজান সেই গাঁয়ের দিকে অন্ধকার বনভূমি নিঃশব্দ পদক্ষেপে পার হয়ে একটি চিতাবাঘ তার জ্বলন্ত চোখ দুটো নিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। গন্ধ এঁকে এঁকে সে একটা কুড়ে ঘরের বাইরে এসে হাজির হলো। তারপর ঘরটার চালের উপর উঠে খড়পাতার ছাউনি। সরিয়ে কিছুটা ফাঁকা করে ঘরের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল।
টারজানও এতক্ষণ একটা পরিচিত গন্ধ পেয়ে সচকিত হয়ে ওঠে। মেঝের উপর লাফিয়ে পড়ার পর টারজনের গা-টা শুঁকতে লাগল শীতা।
এমন সময় একজন নিগ্রো যোদ্ধা বাইরে উৎসবের জায়গাটা থেকে টারজানকে সেখানে তুলে নিয়ে যাবার জন্য ঘরে এসে ঢুকল। বাইরে তখন উৎসবের জন্য এক বিরাট প্রস্তুতি চলছিল গ্রামবাসীদের।
অন্ধকারে সে চিতাবাঘটাকে দেখতে পায়নি। সে বর্শা দিয়ে টারজনের গায়ে একটা আঘাত করতেই টারজান চীৎকার করে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে চিতাটা আদিবাসীদের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলাটা কামড়ে ধরল। লোকটা রক্তাক্ত দেহে লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর। চিতাটার গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে আহত লোকটার আর্তনাদ শুনতে পেয়ে উৎসব ছেড়ে বাইরের লোকরা ছুটে আসতে লাগল।
প্রথমে রোকোফের দলের দু’জন শ্বেতাঙ্গ একটা টর্চ নিয়ে ঘরের ভিতরটা দেখতে লাগল। আদি বাসীরা ঘরের ভিতরে তাদের একজনকে রক্তাক্ত ও ছিন্ন-ভিন্ন দেহে মরে পড়ে থাকতে দেখে দারুণ ভয় পেয়ে গেল। তারা ভয়ে ঘরের ভিতর কেউ ঢুকল না। এদিকে ঘরের দরজার সামনে অনেক লোক দেখে চিতাটা গর্জন করতে করতে লাফ দিয়ে চালের উপর উঠে সেই ফাঁকটা দিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে।
রোকোফ তখন সর্দারকে বলল, এস, ওকে এবার বাইরে নিয়ে গিয়ে আমাদের কাজ শেষ করে ফেলি। তা না হলে আবার কোন বিপদ ঘটতে পারে।
চারজন নিগ্রো যুবক টারজানকে তুলে নিয়ে গিয়ে সেই নাচের জায়গাটায় একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিল দাঁড় করিয়ে। রোকোফ এবার একজন আদিবাসীর হাত থেকে একটা বর্শা নিয়ে টারজনের দেহে আঘাত করতে গেল। কিন্তু সর্দার তার হাত থেকে বর্শাটা কেড়ে নিয়ে বলল, আমাদের প্রথামত নাচ না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা চলবে না। তাছাড়া বন্দীকে আমরা মারব। আমাদের বিধিমত না চললে তোমারও ঐ অবস্থা করব।
রোকোফ সরে গেল। সে টারজানকে বলল, ঠিক আছে, নাচ হয়ে গেলে আমি নিজে তোমার হৃৎপিণ্ডটা খাব।
এবার নরখাদক আদিবাসীদের নাচ শুরু হলো। নাচ শেষ হয়ে এলে ওদের সর্দার প্রথমে তার বর্শার ফলা দিয়ে একটা খোঁচা দিল টারজনের গায়ে। সেই সময় জঙ্গলের ভিতর থেকে কার একটা চীঙ্কার শুনে টারজানও সাড়া দিল সেইভাবে।
আদিবাসীরা ভয়ে ভয়ে তাকাতে লাগল চারদিকে।
কিনসেড জাহাজ থেকে টারজানকে যখন নামিয়ে নৌকায় করে জঙ্গলাকীর্ণ সেই দ্বীপটায় নিয়ে যাওয়া হয় তখন একটা কেবিনের জানালা দিয়ে তা দেখতে পায় ক্লেটন। কিন্তু জায়গাটার নাম কি, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় তা সে জানতে পারল না কোনক্রমেই। একমাত্র সেভেন এ্যান্ডারসন নামে একজন সুইডেনবাসী রাঁধুনি ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেল না। এ্যান্ডারসন রোজ দু’বার করে খাবার দিয়ে যেত জেনের কেবিনে। তাকে জেন কোন কথা জিজ্ঞাসা করলে সে শুধু ইংরেজিতে একটা কথাই বলত, আমার মনে হয় এরা শিগগির একটা অঘটন ঘটাবে।
টারজানকে সেই দ্বীপটায় নামিয়ে দেবার তিন দিন পর কিনসেড জাহাজটা সমুদ্র থেকে উগাম্বি নদীর মুখে গিয়ে পড়ল।
সেইদিনই সেখানে জাহাজটাকে থামিয়ে রোকোফ জেনের কেবিনে এসে বলল, আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে এসে পড়েছি। এবার তোমাকে সহজেই মুক্তি আর নিরাপত্তা দুইই দেব। আর আমি তোমাকে ভালবাসি জেন। তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বললেই তোমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেব।
এবার জেন রোকোফকে বলল, আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি তোমার কথা শুনে। এতদিন তোমাকে একজন কাপুরুষ আর শয়তান বলে ভাবতাম, কিন্তু এখন দেখছি তুমি নির্বোধ।
রোকোফের চোখ দুটো ছোট হয়ে গেল। রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠল তার মুখখানা। সে জেনের দিকে কিছুটা এগিয়ে ভীতি প্রদর্শনের সুরে বলল, শেষে দেখা যাবে কে বোকা। তোমার সামনে যখন তোমার ছেলের বুকের ভিতর থেকে হৃৎপিণ্ডটা উপরে নেয়া হবে তখন বুঝবে নিকোলাস রোকোফকে অপমান করার অর্থ কি।
