টারজান আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, অন্য দল! কোন্ দল?
কাভিরী বলল, দুবৃত্ত শ্বেতাঙ্গটা আসার তিনদিন আগে আর একটা দল এসেছিল। সেই দলে ছিল একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা, একটা ছেলে আর ছ’জন মুসলমান নাবিক। তারা মনে হয় সেই দুর্বত্ত শ্বেতাঙ্গটার দল থেকে পালিয়ে আসে। তাই দুবৃত্ত শ্বেতাঙ্গটা তাদের খোঁজ করছিল। এই দলটা একটা নৌকা করে এই নদী দিয়ে পালিয়ে যায়।
টারজান বুঝতে পারল পলাতক দলটির মধ্যে যে ছেলেটি ছিল সে-ই জ্যাক, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ও মহিলা কে তা বুঝতে পারল না।
টারজান আর কাভিরীর নৌকা দুটো কাভিরীদের গায়ের কাছে এসে পড়তেই নৌকা থেকে নেমে পড়ল তারা। কাভিরীদের গায়ে এসে টারজান কিছু খাবার খেয়ে কাভিরীর কাছ থেকে তার নৌকা চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ডজনখানেক লোক চাইল।
কাভিরী বলল, লোক দেব কি বাওনা, আমি ছাড়া গাঁয়ে আর একটি লোকও নেই।
কাভিরী টারজনের সব কথা মেনে নিতে রাজী ছিল, কারণ সে ভাবছিল টারজান তার যত সব ভয়ঙ্কর সঙ্গীদের নিয়ে যত তাড়াতাড়ি তাদের গাঁ থেকে চলে যায় ততই ভাল। কিন্তু টারজনের পশুসঙ্গীদের দেখে গাঁয়ের সবাই জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল গা ছেড়ে। যে দু’চারজন কাভিরীর কাছে ছিল তারাও টারজনের কথা শুনে জঙ্গলে পালিয়ে গেল।
টারজান বলল, ঠিক আছে কাভিরী, আমি তোমার পাশে লোকদের সব এনে দিচ্ছি।
এই বলে সে মুগাম্বিকে কাভিরীর কাছে রেখে শীতা আর বাঁদর-গোরিলাদের নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল টারজান পালিয়ে যাওয়া লোকদের ভেড়ার পালের মত তাড়িয়ে নিয়ে এল। এবার কাভিরীর সামনে টারজান দাঁড়িয়ে বলল, তোমার সব লোক এসে পড়েছে। এবার তুমি আমার সঙ্গে কারা যাবে তাদের বাছাই করে দাও।
কাভিরী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে তার লোকদের ডাকল। কিন্তু কেউাড়া দিল না তার ডাকে।
টারজান তখন কাভিরীকে বলল, তোমার কথায় কেউ রাজী না হলে ওদের বলে দাও আমি আবার জন্তুদের লেলিয়ে দেব তাদের পিছনে।
এই কথা শুনে গাঁয়ের অনেক লোক কাভিরীর চারপাশে এসে দাঁড়াল। কাভিরী তাদের মধ্যে থেকে বারোজন লোককে বাছাই করে তাদের যেতে বলল টারজনের সঙ্গে। লোকগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও টারজনের নৌকায় গিয়ে বসল।
একদিন নৌকা থেকে নদীর ধারে নেমে টারজান মুগাম্বি আর আকুৎকে তার পরিকল্পনার কথাটা বুঝিয়ে বলল। বলল, একজন শ্বেতাঙ্গ নৌকায় করে এই পথেই পালাচ্ছে। তাকে ধরতে চায় সে। কিন্তু আদিবাসীরা তাদের দেখে পালাচ্ছে বলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। তাই সে একাই ওদের গায়ে গিয়ে খোঁজ করতে চায়।
ওদের কূলের উপর রেখে টারজান বলল, দু-একদিনের মধ্যেই তোমাদের কাছে ফিরে আসব আমি।
এই বলে বনের মধ্যে দিয়ে একাই চলে গেল টারজান।
টারজান ভেবে পেল না কিভাবে গঁয়ে গিয়ে যোগাযোগ করবে লোকগুলোর সঙ্গে। অবশেষে সে একটা বুদ্ধি খাটাল। গাছের উপর পাতার আড়াল থেকে চিতাবাঘের মত জোর একটা গর্জন করল সে। তখন গাঁয়ের লোকেরা গেটের কাছে ছুটে এসে গাছটার দিকে তাকাতে লাগল। টারজান তখন গাছ থেকে নেমে আদিবাসীদের ভাষায় বলল, আমাকে তোমাদের গায়ের মধ্যে ঢুকতে দাও। আমি একজন শ্বেতাঙ্গ, তোমাদের বন্ধু। অন্য যে একজন শ্বেতাঙ্গ এখানে এসে তোমাদের অত্যাচার করেছিল তাকে ধরে আমি শাস্তি দিতে চাই।
গাঁয়ের লোকগুলো গেটটা খুলে দিতেই টারজান ভিতরে ঢুকে গাঁয়ের সর্দারকে রোকোফের কথা জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু সে যা বলল তার সঙ্গে কাভিরীর কথা মিলল না। গায়ের সর্দার বলল, রোকোফ নামে শ্বেতাঙ্গটা তাদের গায়ে এক মাস ছিল। তবে দ্বিতীয় দলটার কথা দু’জনেরই এক হলো। রোকোফের আগেই একটা দল আসে। সে দলে এক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, এক শ্বেতাঙ্গ মহিলা, এক শিশু আর কয়েকজন মুসলমান মালবাহী কুলী ছিল।
গাঁয়ের সর্দার রাতে শোবার জন্য একটা কুঁড়ে ঘর ছেড়ে দিতে চাইল। কিন্তু টারজান বলল, আমি গাঁয়ের বাইরে ঐ গাছতলাটায় ঘুমাব। তবে আমার দলের লোকরা আগামীকাল নৌকায় করে এখানে এসে পড়বে। দলে কতকগুলো জন্তু থাকলেও তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করবে না। সঙ্গে মুগাম্বি নামে। একজন নিগ্রো আদিবাসীও থাকবে।
টারজান কিন্তু ঘুমোল না গাছতলাটায়। সেই রাতেই উগাম্বি নদীর ধারে ধারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল। পথে দু-একটা আদিবাসী বস্তি দেখতে পেল। তাদের কাছ থেকে জানতে পারল রোকোফ এই পথেই গেছে।
দুদিন এইভাবে যাওয়ার পর উগাম্বি নদীর ধারে একটা বড় গায়ে এসে উঠল টারজান। কিন্তু সে গাঁয়ের সর্দারকে দেখে নরখাদক বলে মনে হলো তার। লোকটাকে দেখে ভাল না লাগলেও অতিশয় ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ায় কিছু আহার ও বিশ্রামের জন্য কয়েক ঘণ্টা কাটাতে চাইল সে সেখানে। তবে সে বুঝল সর্দারটা মুখে তাকে খাতির করলেও ভিতরে ঘৃণা অনুভব করছে তার প্রতি।
টারজান অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা কুঁড়ে ঘরের পাশের ছায়ায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সর্দার টারজনের এই উপস্থিতির ব্যাপারটা একেবারে গোপন রাখল গাঁয়ের লোকদের কাছে। তারপর সে গোপনে। জনকতক লোককে রোকোফকে খবর দেবার জন্য নদীর ধার দিয়ে পূর্ব দিকে পাঠিয়ে দিল।
ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই কতকগুলো ডিঙ্গি এগিয়ে আসতে লাগল গাঁয়ের ঘাটের দিকে। একটা নৌকাতে ছিল রোকোফ আর তার পাঁচজন শ্বেতাঙ্গ সহচর।
