টারজনের কি মনে হতে পলাতক নিগ্রো যোদ্ধাটার পিছু পিছু গিয়ে অনুসরণ করতে লাগল তাকে। লোকটা নৌকাটার কাছে যেতেই পিছন থেকে টারজান বলল, আমি তোমাকে মারব না যদি তুমি আমাকে এই দ্বীপটা থেকে অন্যত্র চলে যেতে সাহায্য করো।
মুগাম্বি বলল, হ্যাঁ, সাহায্য করব। কিন্তু তুমি আমার দলের সব লোকদের মেরে ফেলেছ। দাঁড় বাইবার কোন লোক নেই। কি করে নৌকা নিয়ে যাব?
টারজান দেখল, লোকটার স্বাস্থ্যটা খুবই বলিষ্ঠ এবং দৈত্যের মত। তাকে হাতে রাখতে পারলে অনেক কাজ হবে তাকে দিয়ে। সে তাকে বলল, এখন এস আমার সঙ্গে।
মুগাম্বি যখন দেখল টারজান তাকে সেই ভয়ঙ্কর জন্তুগুলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে তখন সে ভয়ে পিছু হটতে লাগল।
কিন্তু টারজান তাদের সকলকে শান্ত করে মুগাম্বির ভয় ভাঙ্গিয়ে দিল।
সেদিন টারজান, মুগাম্বি, শীতা আর আকুৎ এই চারজনে মিলে একটা হরিণ শিকার করল। মুগাম্বি আগুন জ্বেলে তার ভাগের মাংস পুড়িয়ে খেল। কিন্তু টারজান ও আর সকলে কাঁচা মাংস খেল। তারপর মুগাম্বিকে নিয়ে এখান থেকে মূল মহাদেশে যাবার একটা পরিকল্পনা খাড়া করল টারজান।
টারজনের কথায় মুগাম্বির হুঁস হলো। সে বুঝতে পারল, এ জায়গাটা আসলে একটা ছোট দ্বীপ। সারা দ্বীপটাই জঙ্গলে ভরা। তবে মূল মহাদেশটা এই দ্বীপটা থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
টারজান ঠিক করে ফেলল মুগাষি আর তার কিছু পশু অনুচরদের সঙ্গে করে নৌকাটা করে মূল মহাদেশে চলে যাবে।
অবশেষে একদিন সে মুগাম্বি, আকুৎ, তারা বারো জন বাঁদর-গোরিলা আর শীতা বা চিতাবাঘটাকে সঙ্গে করে নৌকাটা ভাসিয়ে দিল সমুদ্রে।
এইভাবে ক্রমাগত দশ ঘণ্টা যাওয়ার পর ওরা বনভূমি ঘেরা কুল দেখতে পেল। কিন্তু তখন সন্ধ্যার অন্ধকার অনেকটা ঘন হয়ে ওঠায় ওরা উগাম্বি নদীর মোহানাটা দেখতে পেল না।
নৌকাটা কূলে ভিড়তেই ওরা নেমে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল নৌকাটাকে।
টারজান কিন্তু চুপ করে বসে থাকতে পারল না। মুগাম্বিকে সঙ্গে নিয়ে উগাম্বি নদীটা খুঁজতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা একটা বড় নদী দেখতে পেল। সেখান থেকে মাইলখানেক গিয়ে ওরা সেই মোহনাটা দেখতে পেল যেখানে নদীটা সমুদ্রে পড়েছে।
মোহানার কাছে গিয়ে টারজান গতকালের সেই নৌকাটা দেখতে পেল যেটাকে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মুগাম্বি বলল, এইটাই আমাদের উগাম্বি নদী। নদীতে তখন ভাটা চলছিল। তবু ওরা নৌকাটাতে উঠে উজান বেয়ে অতি কষ্টে মোহানার উল্টোদিকে এগিয়ে গেল। টারজান ভাবল আগে প্রথমে ওর দলের কাছে গিয়ে দলের সবাইকে নৌকায় উঠাবে। তারপর মুগাম্বিকে নিয়ে ওদের গায়ে গিয়ে রোকোফের খোঁজ করবে। তার ধারণা রোকোফ বেশি দূর জাহাজে করে তার ছেলেকে নিয়ে যাবে না।
যাই হোক, সকলকে নিয়ে নৌকায় গিয়ে উঠল টারজান। দুপুরের দিকে আহার আর বিশ্রামের জন্য বনের ধারে নদীতীরে এক জায়গায় নৌকা থামানো হলো। তখন কিছুটা দূরে গাছের আড়াল থেকে একটা নগ্ন আদিবাসী ওদের দেখেই ছুটে ওদের গায়ে গিয়ে খবর দেয়। বলে, আবার একজন শ্বেতাঙ্গ একটা নৌকায় করে কয়েকজন যোদ্ধা নিয়ে আমাদের গাঁয়ের দিকে আসছে।
ওদের গায়ের নেতার নাম ছিল কাভিরী। এই গাঁয়েই কিছুদিন আগের দাড়িওয়ালা এক শ্বেতাঙ্গ অর্থাৎ রোকোফ এসে খুব খারাপ ব্যবহার করে যায়। তাই আর কোন শ্বেতাঙ্গকে ওদের গায়ে আসতে দিতে চায় না কাভিরী। সে ঢাক বাজিয়ে গায়ের যোদ্ধাদের ডাক দিতে বলল। তারপর বড় ড় বর্শা আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোদ্ধারা সাতটা ডিঙ্গিতে গিয়ে উঠল। কাভিরী উঠল অন্য একটা ডিঙ্গিতে।
কিছুদূর নদীপথে যাওয়ার পর কাভিরী তার নৌকা থেকে যখন টারজান আর তার পশুসঙ্গীদের দেখল তখন সে ভয় পেয়ে গেল।
দেখতে দেখতে কাভিরীদের নৌকাগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল টারজানদের নৌকাটাকে।
নিগ্রোদের নৌকাগুলো টারজনের নৌকাটার খুব কাছে আসতেই টারজান আকুৎ আর শীতাকে কি বলল। সঙ্গে সঙ্গে তারা নিগ্রোদের দুটো নৌকাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা কয়েকজন নিগ্রো যোদ্ধাকে কামড়ে ঘায়েল করে দিল। কয়েকজন মারা গেল।
টারজান বুঝতে পারল কাভিরীই নিগ্রো যোদ্ধাদের দলনেতা। সে তাই তাকে প্রাণে মারতে চাইল না। সে বেঁচে থাকলে তার থেকে কিছু খবরাখবর পাওয়া যেতে পারে। কাভিরী আহত ও অচেতন হয়ে নৌকার পাটাতনের উপর পড়ে গেলে সে তার হাত পা বেঁধে ফেলল। যে কয়জন নিগ্রো যোদ্ধা বন্দী হয়েছিল তাদেরও হাত পা বেঁধে দিল।
কাভিরীর চেতনা ফিরে এলে সে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল তার পাশে দৈত্যাকার এক নগ্নপ্রায় শ্বেতাঙ্গ আর একটা বিরাট আকারের চিতাবাঘ থাবা গেড়ে বসে আছে। টারজান তাকে বলল, তোমার লোকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম তোমার নাম কাভিরী।
কাভিরী বলল, হ্যাঁ।
টারজান বলল, কেন তুমি আমাদের আক্রমণ করতে এলে?
কাভিরী বলল, কিছুদিন আগে অন্য এক শ্বেতাঙ্গ আমাদের গাঁয়ে আসে। আমরা তাকে অনেক উপহার দিয়ে খাতির করলেও সে তার বন্দুক দিয়ে আমাদের কিছু লোককে হত্যা করে আমাদের গায়ের কয়েকজন পুরুষ ও নারীকে ধরে নিয়ে যায়।
টারজান জিজ্ঞাসা কলল, তার সঙ্গে একটা ছেলে ছিল?
কাভিরী বলল, না মালিক। একটা শ্বেতাঙ্গ ছেলে ছিল অন্য দলে।
