টারজান তার ঘাড়টা এবার ছেড়ে দিয়ে বলল, যাও, আমি রাজা হব না, তুমিই হবে রাজা। যদি তোমাকে কেউ বাধা দেয় তাহলে তোমাকে সাহায্য করব।
আকুৎ ধীরে ধীরে উঠে তার দলের কাছে চলে গেল।
এবার টারজান দেখল তার একটা অস্ত্র চাই।
এরপর দিনকতক ধরে অস্ত্র তৈরির কাজে মন দিল টারজান। মরা হরিণের চামড়া দিয়ে তার ধনুকের ছিলা তৈরি করল আর তার কৌপীন তৈরি করতে লাগল। সেই সঙ্গে শুকনো ঘাস দিয়ে একটা লম্বা দড়ি তৈরি করল। সে একটা তৃণ আর বেল্টও তৈরি করল।
একদিন পথে যেতে যেতে টারজান গাছের উপর বসেছিল কিছুক্ষণের জন্য। হঠাৎ সে বাতাসে একদল বাঁদর-গোরিলার গন্ধ পেল। আবার দেখল যে গাছটায় সে বসে আছে সেই গাছেরই নিচের ডালে একটা চিতাবাঘও আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে টারজান দেখল বাঁদর-গোরিলাদের দলটা সেই গাছটার কাছে এসে পড়েছে এবং তাদের নেতা আকুৎ সেই গাছের তলায় খুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে আছে। ঠিক সেই সময় চিতাবাঘটা আকুতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্যত হচ্ছে।
কিন্তু চিতাটা সামনের পা দুটো তুলতেই টারজান তার পাথরের ছুরিটা তার গায়ে বসিয়ে দিয়ে তার ঘাড়ে একটা জোর কামড় দিল। আকুৎ উপর দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা। এখন চিতাটা আর টারজান দু’জনেই গাছ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। টারজান তখন তার পাথরের ছুরিটা বারবার বসাতে লাগল চিতাটার গায়ে। অবশেষে লুটিয়ে পড়ে গেল চিতাটা। তার উপর দাঁড়িয়ে টারজান বিয়জগর্বে একটা বিকট চীৎকার করে উঠল।
টারজান এবার আকুৎকে লক্ষ্য করে বলল, আমি হচ্ছি বাঁদরদলের টারজান। বিরাট শক্তিশালী যোদ্ধা। কিছুদিন আগে আকুতের প্রাণ নিতে নিতে বাঁচিয়ে দিই। আজ চিতার কবল থেকে তাকে রক্ষা করলাম। তোমরা বিপদে পড়লে টারজানকে ডাকবে। আর টারজান যদি কখনো বিপদে পড়ে তোমাদের ডাকে তাহলে তোমরা সবাই ছুটে আসবে। বুঝলে ত?
আকুৎ ও তার দলের সবাই একযোগে বলল, হুঁ।
এরপর তখনকার মত ওদের সঙ্গেই রয়ে গেল টারজান। একযোগে সকলে মিলে শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
একদিন পথে যেতে যেতে টারজান দেখল একটা বিরাট গাছ পড়ে গেছে আর তার একটা বড় ডালের। নিচে একটা চিতাবাঘ চাপা পড়ে যন্ত্রণায় চীৎকার করছে।
টারজান ইচ্ছা করলেই চিতাটাকে মেরে ফেলতে পারত তখনি। কিন্তু সে ভাবল সে যখন একটু চেষ্টা করলেই তাকে তার জীবন আর স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে পারে তখন কেন সে তা করবে না? টারজান কাছে যেতেই মুক্তির আশায় তার পানে সকরুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল চিতাটা। টারজনের চেষ্টায় ডালটা তার দেহের উপর থেকে উঠে যাওয়ায় সে এবার মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
টারজান ভেবেছিল, চিতাটা মুক্ত হয়েই হয়ত আক্রমণ করবে তাকে দাঁত বার করে। কিন্তু টারজান তার পাশ দিয়ে যখন চলে যাচ্ছিল তখন সে কিন্তু তাকে কামড়াতে এল না। উল্টে তার পিছু পিছু পোষা কুকুরের মত আসতে লাগল।
বিকালের দিকে চিতাটা টারজনের কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে বসেছিল শিকারের আশায়। টারজান ছিল একটা গাছের ডালে বসে। গাছের তলায় একটা হরিণকে আসতে দেখেই টারজান তার ঘাসের দড়ির ফাঁসটা হরিণটার গলায় আটকে দিল। তারপর শীতা শীতা’ বলে চিতা বাঘটাকে ডাকতে লাগল। বাঁদর-গোরিলাদের ভাষায় চিতাবাঘকে শীতা বলে।
টারজনের ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঝোপঝাড় ভেঙ্গে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল চিতাটা। ঝাঁপিয়ে পড়ল হরিণটার উপর। হরিণটা মরে গেলে টারজান গাছ থেকে নেমে এসে দু’জনে মিলে তার মাংস খেতে লাগল। এরপর থেকে তাদের দুজনের একজন কোন শিকার পেলেই আর একজনকে তা না দিয়ে খেত না।
একদিন টারজান আর তার সঙ্গী চিতাবাঘটা পথে যেতে যেত আকুতের গোরিলা দলটার কাছে এসে পড়ল। চিতাবাঘটাকে দেখেই আকুত্রা ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু টারজান তাদের সাহস দিয়ে ডাকতেই কাছে এল তারা।
একদিন একদিকে চিতাবাঘটা আর একদিকে আকুৎ তার দলবল নিয়ে শিকার করতে গিয়েছিল। টারজান তখন একা একা সমুদ্রের ধারে বেলাভূমির উপর চিৎ হয়ে শুয়েছিল। সে একমনে কি ভাবছিল।
এমন সময় কোথা থেকে একদল নিগ্রো যোদ্ধা টারজনের কাছে এসে পড়ে তাকে লক্ষ্য করতে থাকে। তারা খুব কাছে এসে পড়ায় তাদের পদশব্দ শুনে চমকে উঠে পড়ে সে। নিগ্রো যোদ্ধারাও তাকে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হয়ে ওঠে।
টারজান উঠেই তার হাতের লাঠিটা দিয়ে মাথায় জোর আঘাত করে একজন নিগ্রোকে মেরে ফেলল। তখন অন্যান্য নিগ্রোরা ভয়ে বিহ্বল হয়ে সরে গেল কিছুটা। কিন্তু এরপর ওরা টারজানকে তিন দিক হতে ঘিরে ফেলে তার উপর এক সঙ্গে অনেকগুলো বর্শা ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল।
টারজান দেখল তার পিছনেই সমুদ্র এবং একমাত্র এই দিকটা দিয়েই পালাতে পারে সে। কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ দিয়ে জোরে অদ্ভুত একটা শব্দ করে কাদের ডাকতে লাগল।
এমন সময় কোথা থেকে ঝোপঝাড় ভেঙ্গে একদল বাঁদর-গোরিলা আর একটা চিতাবাঘ ছুটে এসেই একযোগে আক্রমণ করল নিগ্রোদের। নিগ্রোদের বর্শার ঘায়ে কয়েকটা বাঁদর-গোরিলা মারা গেল। কিন্তু ক্ষতি হলো নিগ্রোদেরই বেশি।
টারজান অবশেষে দেখল, মাত্র একজন নিগ্রো যোদ্ধা নিরাপদে পালিয়ে গেল সমুদ্রের কূলের দিকে। সেখানে একটা নৌকা ছিল। বাকি সব নিগ্রো যোদ্ধারা মারা গেছে। তাদের মৃতদেহগুলো চিতাটা আর বাঁদর-গোরিলাগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল।
