পলভিচ বলল, আমাদের এভাবে অপমান করবেন না। আমরা কথা দিচ্ছি এটাই যথেষ্ট। আমরা আপনাকে এখনি হত্যা করতে পারি, কিন্তু তাতে আপনাকে শাস্তি দেয়ার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
টারজান বলল, একটা কথার উত্তর দাও। আমার ছেলে কি এই জাহাজেই আছে?
পলভিচ বলল, না আপনার ছেলে অন্যত্র নিরাপদেই আছে। আপনি আমাদের দাবি মানতে অস্বীকার করলে আপনাকে হত্যা করা হবে আর আপনাকে হত্যা করা হলেই আপনার ছেলেকেও হত্যা করতে হবে। সুতরাং আমার কথামত চেকটা লিখে দিয়ে আপনার নিজের জীবন ও আপনার ছেলের জীবন রক্ষা করুন।
টারজান বলল, ঠিক আছে। কত টাকা চাও?
পলভিচ বিরাট একটা টাকার পরিমাণ বলল। টারজান তখন চেকে একটা মোটা টাকার অঙ্ক লিখে দিল। কিন্তু অত টাকা তার ব্যাংকে ছিল না।
টারজান চেকটা পলভিচের হাতে দিয়ে বাইরে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল অদূরে জঙ্গলঘেরা তীর দেখা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে জাহাজটা উপকূলে গিয়ে ভিড়ল।
জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে পলভিচ বলল, ওইখানে আপনাকে মুক্তি দেয়া হবে।
পলভিচ টারজনের হাত থেকে চেকটা নিয়ে তাকে বলল, নাও, তোমার পোশাকটা খুলে ফেল। কারণ জঙ্গলে পোশাকের কোন দরকার হবে না।
জাহাজ থেকে একটা নৌকায় করে টারজানকে নামিয়ে দেয়া হলো। নাবিকরা টারজানকে কূলে রেখে জাহাজে ফিরে আসার জন্য নৌকাটা ছেড়ে দেবার সময় টারজনের হাতে একটা চিঠি দিয়ে গেল। নৌকাটা চলে গেলে টারজান কুলে দাঁড়িয়ে দেখল জাহাজের ডেকে রোকোফ তার ছেলেটাকে দুহাতে করে মাথার উপর তুলে ধরে টারজানকে দেখাচ্ছে। টারজান তখন বুঝল বিরাট ভুল করেছে সে। ভেবেছিল এ জাহাজে তার ছেলে নেই।
টারজনের পিছনে তখন কতকগুলো ছোট বাঁদর কিচমিচ করছিল। টারজান আপন মনে বলল, থাক, একটা সান্ত্বনা, জেন এখন লন্ডনে আছে। এই সব শয়তানদের কবলে সে এখনো পড়েনি।
পরে সে চিঠিটা খুলে যতই পড়তে লাগল ততই রোকোফদের চক্রান্তের ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠল তার কাছে। চিঠিটাতে লেখা ছিল, তোমার সম্বন্ধে আমার আসল মতলবটা কি তা এই চিঠিটা পড়ে বুঝতে পারবে। তুমি একদিন জঙ্গলে জন্তু জানোয়ারদের মত নগ্নদেহে বাস করতে। কিন্তু তোমার সন্তান তা করবে না। সে প্রথম থেকে মানুষের সমাজে মানুষের মতই বেড়ে উঠত। কিন্তু তাকে সে সুযোগ দেয়া হবে না। সে নরখাদক এক বর্বর আদিবাসীদের সমাজে পরনে কৌপীন, পায়ে তামার গয়না আর নাকে আংটি পরে তাদের মত বেড়ে উঠবে। আমি তোমাকে হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হত্যা করতে পারতাম। কিন্তু তাতে যে শাস্তি তুমি ভোগ করেছ এতদিন আমার হাতে সে শাস্তি দীর্ঘায়িত হত না এতখানি। অথচ এমন একটা জায়গায় তোমাকে নির্বাসন দেয়া হলো যেখান থেকে তুমি তোমার ছেলেকে উদ্ধার করার কোন চেষ্টাই করতে পারবে না। রোকোফের বিরুদ্ধে যাওয়ার এই হলো শান্তি। ইতি-নিকোলাস রোকোফ।
চিঠিটা পড়া শেষ করেই নিজের বাস্তব অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠল টারজান। সে ঘুরে দেখল। এক দুর্ধর্ষ পুরুষ-গোরিলা তাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়ে উঠেছে।
টারজান দেখল শুধু একটা নয় প্রায় ডজনখানেক বাঁদর-গোরিলা তার পিছনে রয়েছে। কিন্তু সে বুঝল সব বাদর-গোরিলাগুলো এক সঙ্গে আক্রমণ করে না। তাদের দলের রাজা হিসেবে একটা গোরিলাই তাকে আক্রমণ করবে।
আক্রমণকারী বাঁদর-গোরিলাটা তাকে আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসতেই টারজান আগের মত সরাসরি তাকে না ধরে সে তার তলপেটে একটা জোর ঘুষি মেরে দিল। গোরিলাটা ঘুরে পড়ে গেল মাটিতে। সে অতি কষ্টে উঠে দাঁড়াতেই টারজান তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। টারজান এবার তার সাদা ঝকঝকে দাঁতগুলো গোরিলাটার লোমশ ঘাড়ের উপর বসিয়ে দিল। গোরিলাটা কামড়াতে এলে টারজান এমন একটা জোর ঘুষি মেরে দিল যে তার মুখটা ভেঙ্গে গেল।
অন্য গোরিলাগুলো টারজানদের চারপাশে দাঁড়িয়ে শ্বাসরুদ্ধ হৃদয়ে তাদের লড়াই দেখতে লাগল। অবশেষে টারজান যখন তাদের রাজার ঘাড়টা মটকে দিল তখন তার শব্দটা শুনতে পেল তারা। তখন তার নিস্পন্দ দেহটার উপর দাঁড়িয়ে উপর দিকে মুখ তুলে চীৎকার করে তার বিজয়-উল্লাস প্রকাশ করল টারজান।
টারজান বুঝল, এরপর গোরিলাদের মধ্য থেকে আর একজন তার কাছে এসে যুদ্ধের আহ্বান জানাবে। হলোও ঠিক তাই। একজন বলিষ্ঠ যুবক গোরিলা টারজনের দিকে এগিয়ে এসে গর্জন করতে থাকলে টারজান বলল, কে তুমি, বাঁদর-দলের রাজা টারজানকে ভয় দেখাচ্ছ?
গোরিলাটা বলল, আমি হচ্ছি আকুৎ। মোনাক মারা গেছে। এখন আমিই হচ্ছি রাজা। এখান থেকে চলে যাও, তা না হলে খুন করব তোমায়।
টারজান বলল, তুমি দেখেছ কত সহজে আমি মোনাককে মেরেছি। আমি যদি রাজা হতে চাইতাম তাহলে আমি তোমাকেও মারতে পারতাম। কিন্তু টারজান আকুৎদের দলের রাজা হতে চায় না। আমি তোমাদের বন্ধু হয়ে শান্তিতে এ দেশে বাস করতে চাই।
আকুৎ বলল, তুমি আকুৎকে মারতে পারবে না। আকুতের সমান শক্তিশালী কেউ নেই।
একথার কোন উত্তর না দিয়ে টারজান আকুতের একটা হাতের কব্জি ধরে হাতটা জোরে ঘুরিয়ে তাকে ফেলে দিল। টারজান তাকে প্রাণে বধ না করে হার মানাতে চাইল শুধু। তাই সে ঘাড়টার উপর চাপ দিয়ে বলল, কা গোদা? অর্থাৎ হার মানছ?
আর একটু চাপ দিলেই আকুতের ঘাড়টা ভেঙ্গে যেত। আকুৎ বলল, কা গোদা অর্থাৎ হার মেনেছি।
