লোকটাকে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হলো না টারজনের। লোকটা যে আসলে ছদ্মবেশী রোকোফের সহকারী ও সহচর পলভিচ সেকথা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি টারজান।
টারজান বলল, আমার ছেলে কোথায়?
লোকটা বলল, ঐ যে একটা ছোট জাহাজে আলো দেখা যাচ্ছে ঐটাতে আছে। জাহাজটার নাম কিনসেড।
টারজান বলল, ঠিক আছে চল সেখানে।
টারজানকে সঙ্গে করে কিনসেড নামে ছোট জাহাজটাতে নিয়ে গিয়ে লোকটা বলল, ডেকের তলায় এই ঘরটাতে আছে। আপনি নেমে যান ঘরটার মধ্যে।
টারজান তার ছেলেকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরটার মধ্যে নেমে গেল আর মুহূর্তের মধ্যে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে শিকল দিয়ে দিল লোকটা। টারজান এবার বুঝতে পারল ছলনা করে তাকে ঘর থেকে টেনে এনে বন্দী করল রোকোফ।
এমন সময় টারজান দেখল জাহাজটা ছেড়ে দিল। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নারীকণ্ঠের এক ভয়ার্ত চীৎকার শুনে টারজনের মত সাহসী লোকের বুকেও হিমশীতল ভয়ের একটা শিহরণ খেলে গেল।
টারজান সেই লোকটার সঙ্গে কিনসেড জাহাজে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেন একটা গাউন পরে আর মাথায় ওড়না দিয়ে নাবিকদের সেই বাড়িতে হাজির হলো। গিয়ে দেখল দশ বারোজন নাবিক সেখানে বসে জটলা পাকিয়ে গল্প করছে। জেন তাদের একজনকে বলল, ভাল পোশাক পরা লম্বা একজন ভদ্রলোক এখানে এসে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
নাবিকটি বলল, হ্যাঁ কিছুক্ষণ আগে তিনি একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঐ জাহাজটার দিকে চলে গেলেন।
জেন দেখল দুটো লোক একটা নৌকায় করে জাহাজটায় গিয়ে উঠছে। তখন সে লোকটাকে বলল, তুমি আমাকে একটা নৌকায় করে ঐ জাহাজটায় নিয়ে চল। তোমাকে আমি দশ পাউন্ড দেব।
লোকটা তখন জেনকে নৌকায় করে জাহাজে তুলে দিলে জাহাজটা ছেড়ে দিল। কিন্তু কোন কেবিনেই তোক দেখতে পেলো না। অবশেষে শেষ প্রান্তে একটা কেবিনের দরজা একটু ঠেলা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে একজন লোক ছিল। সে জেনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে জোর করে তাকে ঘরে টেনে এনে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
জেন চিনতে পারল লোকটা নিকোলাস রোকোফ। জেনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, নিকোলাস রোকোফ! মঁসিয়ে থুরান।
সঙ্গে সঙ্গে জেন জোরে চীৎকার করে উঠল এবং সেই ভয়ার্ত চীৎকারটা টারজান তার ঘর থেকে শুনে চমকে উঠল।
রোকোফ বলল, এখন নয়, জাহাজটা কূল থেকে অনেকটা দূরে চলে গেলে তবে চীৎকার করবেন।
এই বলে সে জেনের ঠোঁটের উপর তার হাতটা চাপা দিল। মাথাটা নত করে বলল, আমি হচ্ছি আপনার ভক্ত এবং গুণগ্রাহী।
রোকোফের কথায় কান না দিয়ে জেন বলল, হায়, আমার ছেলে, সে কোথায়? এত নিষ্ঠুর তুমি কি করে হতে পারলে নিকোলাস রোকোফ? বল সে কোথায়? সে কি জাহাজেই আছে? আমাকে আমার ছেলের কাছে দয়া করে নিয়ে চল।
রোকোফ বলল, আমার কথামত আপনি যদি কাজ করেন তাহলে আপনার ছেলের কোন ক্ষতি হবে না।
এই কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা তালাবন্ধ করে দিল। এরপর পর পর দু’দিন রোকোফকে দেখতে পায়নি জেন। এই সময়ের মধ্যে জেন শুধু একটা সুইডেনবাসী লোককে দেখতে পেল। লোকটা খাবার সময় তাকে খাবার দিয়ে যেত।
টারজান তখনো পর্যন্ত বুঝতে পারেনি জেনও এই জাহাজেই বন্দী হয়ে আছে। যে নাবিকটা জেনকে খাবার দিয়ে যেত, সেই নাবিকটাই টারজানকেও খাবার দিত। টারজান লোকটা তার ঘরে এলেই তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করত। কিন্তু কোনক্রমেই কোন কথা বলত না লোকটা।
এইভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। কিন্তু বন্দীরা কেউ বুঝতে পারল না তাদের কোথায় নিয়ে গিয়ে কি করা হবে।
জেনকে সেই ঘরটায় বন্দী করে তালাবন্ধ করে রাখার কয়েকদিন পর রোকোফ একদিন দেখা করল জেনের সঙ্গে। বলল, আমাকে যদি একটা মোটা অঙ্কের চেক দাও তাহলে তোমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তোমায় ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।
কিন্তু জেন বলল, তুমি আমার ছেলে ও স্বামীকে যদি কোন সভ্য দেশের বন্দরে নামিয়ে দাও তাহলে তুমি যা চাইছ তার দ্বিগুণ স্বর্ণমুদ্রা তোমাকে দেব। তা করার আগে তোমাকে একটা কপর্দকও দেব না।
রোকোফ বলল, আমার কথামত যদি চেক না দাও তাহলে তুমি বা তোমার স্বামী বা সন্তান কেউ কোন সভ্য দেশে কোনদিন নামতে পারবে না।
জেন বলল, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না।
রোকোফ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, তোমাকে যা বলছি তাই করো। মনে রেখো, তোমার ছেলে আমার হাতে। যদি তুমি তোমার ছেলের আর্ত চীৎকার শোন তাহলে বুঝতে পারবে তোমার গোঁড়ামির জন্যই তোমার ছেলে কষ্ট পাচ্ছে।
অবশেষে জেন একটা মোটা টাকার চেক লিখে রোকোফের হাতে দিল আর রোকোফ মুখে এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
পরদিন পলভিচ টারজনের ঘরে গিয়ে দেখা করল তার সঙ্গে। সে টারজানকে বলল, লর্ড গ্রেস্টোক, আপনি দীর্ঘকাল ধরে রোকোফের সঙ্গে শত্রুতা করে আসছেন এবং তার সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আপনার জন্যই তাকে অনেক টাকা খরচ করে এই জাহাজ ভাড়া করতে হয়েছে। সুতরাং এর খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে। তাহলে আপনার স্ত্রী সন্তান তাদের অশুভ পরিণাম থেকে মুক্ত হবে এবং আপনাকেও মুক্তি দেয়া হবে।
টারজান বলল, কত টাকা তোমরা চাও? তোমরা যে তোমাদের চুক্তি মেনে চলবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তোমাদের মত শয়তানকে বিশ্বাস করাও ত মুস্কিল।
