কিন্তু গান্টো ও দলের সবাই বলল, না, গোমাঙ্গানীরা আমাদের শত্রু। ওকে ছাড়া হবে না। ওর সঙ্গে টারমাঙ্গানী টারজানকেও মারা হবে।
এই বলে ওরা টারজানকে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হলো। নিগ্রো যোদ্ধাটি মবঙ্গার দলের একজন যোদ্ধা। সে বনদেবতা টারজনের নামে অনেক কিছু শুনেছিল। আজ টারজানকে এত কাছ থেকে এই প্রথম দেখল। সে দেখল টারজান যেই হোক, সত্যিই খুব ভাল। সে তার ভাষা বুঝতে না পারলেও বুঝতে পারল সে তাকে বাঁচাবার জন্য লড়াই করতে যাচ্ছে তাই সেও বর্শা হাতে টারজনের সাহায্যে এগিয়ে গেল।
একমাত্র টগ ছাড়া সব পুরুষ বাঁদর-গোরিলাগুলো টারজানকে মারার জন্য উদ্যত হলো। টারজান, টগ আর সেই নিগ্রো যোদ্ধাটি তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। টারজান জোরে একটা শব্দ করল।
এমন সময় গোলমাল শুনে টারজনের হাতিবন্ধু গাছপালা ভেঙ্গে ছুটে এল। হাতিটা ক্ষিপ্রগতিতে আসতেই সব বাঁদর-গোরিলারা ছুটে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিল। টারজান হাতিটাকে বলল, আমাকে তোমার পিঠের উপর চাপিয়ে সমুদ্রের ধারে আমার কেবিনটায় নিয়ে চল।
হাতিটা শুঁড় দিয়ে টারজানকে তার পিঠে চাপালে টারজান বাঁদর-গোরিলাদের বলল, একমাত্র টগ আর টিকা ছাড়া তোমরা কেউ আমার কাছে যাবে না কখনো। আমি তোমাদের দল ছেড়ে চলে যাচ্ছি চিরদিনের মত।
টারজনের পশুসঙ্গীরা (দি বীস্টস অফ টারজান)
লর্ড গ্রেস্টোক একদিন যে বাঁদরদলের রাজা’ নামে পরিচিত ছিল তখন প্যারিসে তার বন্ধু লেফটন্যান্ট পল দার্ণতের বাড়িতে বসে ছিল। সে তখন ভাবছিল তার শত্রু রোকোফের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। তারই সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই রোকোফের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
টারজান বলল, আমি নিজের জন্য ভাবি না পল। অতীতে তার অনেক কু-অভিসন্ধিই ব্যর্থ করেছি আমি। আমার যতদূর মনে হয় সে আমাকে কায়দা করতে না পেরে আমার স্ত্রী পুত্রের মাধ্যমেই আমার উপর প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে এখন। তাই আমাকে ফিরে গিয়ে বাড়িতে থাকতে হবে রোকোফ আবার ধরা না পড়া পর্যন্ত।
টারজান যখন এইভাবে তার বন্ধুর সঙ্গে প্যারিসে বসে কথা বলছিল ঠিক সেই সময়ে লন্ডনের এক বাড়িতে দু’জন কুটিলদর্শন লোক কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে। তাদের মধ্যে একজনের মুখে ছিল বড়। দাড়ি আর একজনের মুখে ছিল মাত্র কয়েকদিনের অল্প দাড়ি।
কম দাড়িবিশিষ্ট লোকটি দাড়িওয়ালা লোকটিকে বলল, তোমার দাড়িটা কামিয়ে ফেলতে হবে। এ্যালেক্সি। তা না হলে ওরা তোমায় চিনে ফেলবে। এখন আমাদের এখানেই ছাড়াছাড়ি হবে। এরপর যখন আমাদের কিনসেড জাহাজে দেখা হবে তখন আমাদের সম্মানিত অতিথি দু’জনও এসে পড়বেন। যাদের জন্য আমাদের এই সমুদ্র যাত্রার পরিকল্পনা।
রোকোফ বলল, আমাদের চেষ্টা সফল হলে তাতে আমদের লাভ আর আনন্দ দুই-ই হবে। ফরাসীরা কী বোকা! আমার পালিয়ে যাবার খবরটা জেল কর্তৃপক্ষ গোপন রেখেছে। তার ফলে আমার পরিকল্পনাটা কার্যকরী করার প্রচুর সুযোগ পেয়েছি আমি। এখন বিদায়।
এর তিন ঘণ্টা পরই প্যারিসে পল দার্ণতের বাসায় একখানা টেলিগ্রাম এসে হাজির হলো। টারজান সেটা পড়ে দার্ণতের হাতে দিয়ে বলল, পড়ে দেখ পল।
পল পড়ে দেখল, তাতে লেখা আছে, নতুন চাকরের যোগসাজসে কে আমাদের বাগানবাড়ি থেকে জ্যাককে চুরি করে নিয়ে গেছে। অবিলম্বে চলে এস।-জেন।
লন্ডনের বাড়িতে গিয়ে টারজান তার স্ত্রীর সঙ্গে কিছুক্ষণ এখন কি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। এমন সময় হঠাৎ তাদের লাইব্রেরী ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল।
ওদিক থেকে ফোনে বলে উঠল, কে লর্ড গ্রেস্টোক?
টারজান বলল, হ্যাঁ।
আপনার ছেলে চুরি হয়েছে? আমি আপনার ছেলের উদ্ধারের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি। আমি জানি কারা তাকে চুরি করে নিয়ে গেছে। তবে একটা শর্তে আমি আপনার ছেলেকে উদ্ধার করে দেব। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে জড়াবেন না।
টারজান জিজ্ঞাসা করল, কোথায় এবং কখন আপনার সঙ্গে দেখা হবে?
ওপার থেকে উত্তর এল, ডোভারের বন্দরের কাছে নাবিকদের বিশ্রামাগারে। আজ রাত্রেই দশটার সময় চলে আসুন। আপনার ছেলে ততক্ষণ নিরাপদেই থাকবে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা বিভাগে কোন কথা জানাবেন না এবং এবিষয়ে আমি লক্ষ্য রাখব। যদি আপনার সঙ্গে কেউ থাকে তাহলে আমি দেখা করব না আপনার সঙ্গে এবং তার ফলে আপনার সন্তানের উদ্ধারের শেষ আশাটিও নির্মূল হয়ে যাবে।
কথাটা তার স্ত্রীকে সঙ্গে সঙ্গে জানাল টারজান। তার স্ত্রী জেন তার সঙ্গে যাবার জন্য জেদ ধরল। টারজান বলল, অচেনা লোকটি বারবার আমাকে একা যেতে বলেছে।
কথাটা বলেই তৎক্ষণাৎ ডোভারের পথে রওনা হলো টারজান। সে চলে যাওয়ার পর জেন তাদের লাইব্রেরী ঘরে চিন্তিত মনে পায়চারি করতে লাগল। তার কেবলি ভয় হতে লাগল ছেলে উদ্ধারের নাম। করে টারজানকে আবার বিপদে ফেলবে না ত? বলা যায় না, তার স্বামী আর সন্তান একই সঙ্গে দু’জনকেই শয়তান রোকোফের কবলে ফেলার চক্রান্ত চলছে না ত?
জেন আর স্থির থাকতে পারল না। সে ঠিক করল টারজনের পিছু পিছু সেও যাবে ডোভারে।
ডোভারে সমুদ্রের কাছে সেই নির্দিষ্ট বাড়িটায় গিয়ে টারজান যখন পৌঁছল তখন রাত্রি ন’টা পঁয়তাল্লিশ বাজে। দুর্গন্ধওয়ালা একটা ঘরে টারজান ঢুকতেই একটা লোক এসে টারজানকে বলল, আসুন স্যার।
