এরপর দূরে একটা গাছের উপর উঠে রাতটা কাটাল টারজান। রাত্রিতে ঘুমের ঘোরে একবার একটা সিংহের গর্জন শুনেছিল সে। সকালে উঠে খাঁচার কাছে টারজান গিয়ে দেখল খাঁচার মধ্যে সত্যিই একটা সিংহ আটকে পড়েছে। সিংহটা কেগার দেহটাকে ক্ষতবিক্ষত ও বিকৃত করে তাকে বধ করে ফেলে রেখেছে। সিংহটা ছটফট করতে করতে গর্জন করছিল মাঝে মাঝে।
টারজান দেখল শিকারীরা এসে দূর থেকে খাঁচার মধ্যে সিংহ আটকে পড়তে দেখে আনন্দে উল্লাস করছিল। কিন্তু কাছে এসে কেগার মৃতদেহ দেখে বিমর্ষ ও নীরব হয়ে গেল। যাই হোক, খাঁচাটা তারা টেনে নিয়ে গায়ের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
খাঁচাটা গায়ে গেলে কি প্রতিক্রিয়া হয় তা দেখার জন্য টারজানও তাদের পিছু পিছু গাছের ডালে ডালে যেতে লাগল। তারপর গাঁয়ের কাছে একটা গাছ থেকে দেখল, গতকাল শিকারীরা গাঁয়ে গেলে তাদের সঙ্গে কেগা না ফেরায় মবঙ্গা বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। কিন্তু কোথাও না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। আজ সকালে খাঁচাটা গায়ে গেলে তার মধ্যে একটা সিংহের সঙ্গে কেগার বিকৃত মৃত দেহটা দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। এবার তারা উৎসবের জন্য তৈরি হতে লাগল। খাঁচাটার কাছে থেকে দু’জন যোদ্ধা পাহারা দিতে লাগল।
টারজান তখন মনে মনে সিংহটাকে খাঁচা থেকে মুক্ত করার এক ফন্দী আঁটতে লাগল। ও জানে সন্ধ্যে হলেই ওরা সিংহটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারবে। ও ঠিক করল সন্ধ্যে হলেই ও সিংহের চামড়াটা গায়ে পরে সিংহ সেজে ওদের সামনে গিয়ে হাজির হয়ে খাঁচাটা খুলে দেবে।
অন্ধকার হয়ে উঠতেই টারজান সিংহের চামড়া পরে সিংহ সেজে খাঁচাটার কাছে চলে গেল। সিংহের ছদ্মবেশে টারজান সিংহের মত গর্জন করতে করতে খাঁচার কাছে চলে গেল। অন্ধকারে একটা সিংহ দেখে উৎসব ছেড়ে সবাই ছোটাছুটি করতে লাগল। খাঁচার সামনে টারজান মানুষের মত দাঁড়িয়ে খাঁচার দরজাটা খুলে দিয়েই গাছে উঠে পড়ল।
মেয়েরা লক্ষ্য করল বনদেবতা টারজানই সিংহের বেশ ধরে এসে খাঁচা খুলে দেয়। তারা সে কথা যোদ্ধাদের বলতেই তারা টারজনের খোঁজ করতে থাকে। কিন্তু ততক্ষণে খাঁচা থেকে আসল সিংহটা বেরিয়ে গায়ের মধ্যে ছোটাছুটি করে যাকে তাকে আক্রমণ করতে লাগল। যোদ্ধারা হঠাৎ আসল সিংহের গর্জন শুনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। ভয়ে তারা ঠিকমত বর্শা চালাতে পারল না। দশ-বারোজন লোককে মেরে ফেলল সিংহটা। এদিকে টারজান তখন গা থেকে অনেক দূরে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেছে।
সেদিন রাত্রিতে একটা গাছের উপর শুয়ে আকাশে চাঁদের পানে তাকিয়েছিল টারজান। হঠাৎ কাদের ভয়ার্ত চীৎকার শুনে উঠে বসল টারজান। দেখল অদূরে ছয়জন নিগ্রো আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে আর একটা সিংহ তাদের কাছে গিয়ে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হয়ে উঠেছে। মাত্র একজন বাদে সব নিগ্রোগুলো ভয় পেয়ে কাছাকাছি গাছের উপর উঠে পড়ল। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র একজন নিগ্রো জ্বলন্ত আগুন থেকে একটা কাঠ নিয়ে সিংহটার দিকে ছুঁড়ে মারতেই সিংহটা তার সাথীকে নিয়ে পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার এল সিংহটা। কিন্তু এবার নিগ্রোটা জ্বলন্ত কাঠটা এমনভাবে সিংহের মুখে ছুঁড়ে দিল যে সিংহটা আর ফিরে এল না।
গোটা ঘটনাটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখল টারজান। তার কাছে আর একটা ডালে টগ শুয়েছিল। টারজান টগকে জাগিয়ে বলল, ঐ যে গোররা দেখছ না, তার মাঝে কালো দাগ রয়েছে। আসলে ঐ দাগগুলো নুমা বা সিংহের চোখ। নুমা গোয়রার দিকে তাকিয়ে আছে। গোরোর চারপাশে আগুন জ্বলছে, ঐ আগুনটা নিভে গেলেই নুমা গোররাকে খাবে।
কথাটা পরে টগ তাদের দলের সবচেয়ে বুড়ো ও বুড়ি গান্টো আর মুমগাকে বলল। তারা দু’জনেই বলল, নুমা নয়, টারজানই একদিন গোরোকে খাবে। সে আমাদের মত বাঁদর নয়, মানুষ। সে সিংহ মেরে আমাদের খাওয়াবার জন্য নিয়ে আসে। সে তেমনি সিংহকে গোরোর কাছে এনেছে। ঐ সিংহই গোররাকে খাবে। টারজানকে বধ করা উচিত। আমরা ওকে বধ করব।
টিকা আর টগ দু’জনেই ছিল টারজনের পক্ষে। টগ বলল, টারজান আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু। প্রথম প্রথম আমি তাকে সন্দেহ করতাম। ভাবতাম সে টিকাকে কেড়ে নিতে চায় আমার কাছ থেকে। কিন্তু পরে দেখলাম আমার সন্দেহ ভুল। টারজনের মত এমন বন্ধু আমি পাব না।
তবু অন্য সব বাঁদর-গোরিলারা টারজানকে হত্যা করার এক ষড়যন্ত্র করতে লাগল। গান্টো এই ষড়যন্ত্রকে জোরালো করে তুলতে চাইল। টারজান কিন্তু কিছুই জানত না এই ষড়যন্ত্রের।
সেদিন টারজান তার পশু বন্ধু ট্যান্টরের চওড়া পিঠের উপর পা ছড়িয়ে শুয়েছিল। হঠাৎ তার কি মনে হলো সে শুয়ে শুয়েই হাতিটাকে বলল, ট্যান্টর, তুমি কার্চাকের সেই বাঁদর-গোরিলাদের কাছে আমাকে নিয়ে চল।
দলের কাছাকাছি গিয়ে একটা গোলমালের শব্দ শুনতে পেল টারজান। সে হাতির পিঠ থেকে গাছে চড়ে ডালে ডালে চলে গেল ঘটনাস্থলে। গিয়ে দেখল, একটা নিগ্রো যোদ্ধাকে ঘিরে বাঁদর-গোরিলারা উত্তেজিতভাবে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। টারজান ভিড় ঠেলে ভিতরে যেতেই একজন গোরিলা বলল, এ গোমাঙ্গানীটা আমাদের দলের মধ্যে এসে পড়েছে।
টারজান বুঝল সেদিন রাতে এই নিগ্রোটাই একা জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে সিংহগুলোকে তাড়ায়। এ অত্যন্ত সাহসী। সে দলের বাদর-গোরিলাদের বলল, একে ছেড়ে দাও। এ খুব সাহসী বীর। এ আমাদের কোন ক্ষতি করেনি।
