বুকাবাই টারজানকে বলল, আমি হচ্ছি এক বিরাট যাদুকর বৈদ্য। আমার ওষুধ খুবই জোরাল। তোমার ওষুধের কোন জোর নেই। তোমার ওষুধের যে কোন জোর নেই তার প্রমাণ হলো এই যে তুমি এখন এখানে বলির ছাগলের মত বাঁধা আছ।
কিন্তু তার ভাষা টারজান বুঝতে না পারায় সে গুহায় চলে গেল হায়েনাগুলো আনার জন্য।
এবার বুকাবাই তার গুহার ভিতরে গিয়ে হায়েনা দুটোকে তাড়িয়ে নিয়ে এল টারজনের কাছে। তারপর সে গিয়ে গুহার মুখে পাতা মাদুরের উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ভাবল হায়েনাগুলোর খুব ক্ষিদে না পেলে তারা টারজনের মাংস ছিঁড়ে খাবে না। এই অবসরে সে তাই কিছুটা ঘুমিয়ে নেবে।
হায়েনা দুটো টারজনের কাছে এসে তার পা দুটো শুঁকতে লাগল। টারজান তার ছাড়া হাত দিয়ে হায়েনা দুটোকে সরিয়ে দিল। টারজান এদিকে গাছের গুঁড়ির গায়ে বাধনের দড়িগুলো ঘষতে ঘষতে সেগুলো আলগা করে ফেলল।
অবশেষে বিকালের দিকে হায়েনাগুলো ক্ষুধিত হয়ে উঠল। একটা হায়েনা টারজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। টারজান তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে টান দিতেই আলগা বাধনগুলো ছিঁড়ে গেল। সে তখন একটা হাত দিয়েই একটা হায়েনার গলা টিপে ধরল। আর একটা হাত বাড়িয়ে অন্য হায়েনাটাকে ধরতে গেল, এমন সময় বুকাবাই জোর চীৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে এল। টারজান তখন দুটো হায়েনাকে দু’হাতে ধরে একে একে বুকাবাই- এর মাথার উপর ছুঁড়ে দিল। একটা হায়েনা বুকাবাই-এর মুখটা কামড়ে দিল। আর একটা হায়েনা লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ে পালিয়ে গেল।
হায়েনার কামড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল বুকাবাই। এবার উঠে টারজনের দিকে এগিয়ে গেল তাকে আক্রমণ করার জন্য। কিন্তু টারজান এক ধাক্কায় ফেলে দিল তাকে। তারপর তাকে তুলে নিয়ে যে গাছটায় তাকে বেঁধে রেখেছিল সেই গাছের সঙ্গে খুব শক্ত করে বেঁধে রাখল।
টারজান আপন মনে বলল, এক সময় না এক সময় হায়েনাগুলো ফিরে আসবে।
সে জানত, হায়েনাগুলো ক্ষিদের জ্বালা অনুভব করলেই বুকাবাইকে এইভাবে বাঁধা অবস্থায় দেখলেই তাকে জীবন্ত ছিঁড়ে খাবে। সত্যিই ফিরে এসেছিল তারা। এক সময় ক্ষুধার জ্বালায় তারা তাদের প্রভুর জীবন্ত বুকাবাই-এর দেহটা ছিঁড়ে খুড়ে খেতে লাগল।
আজ প্রায় এক পক্ষকাল হলো টারজান মোটেই শিকার পাচ্ছে না। দিনকতক হলো সে এক রকম না খেয়ে আছে। সে তাই খাবার পাবার আশায় মবঙ্গাদের গায়ের কাছে গিয়ে দেখল মবঙ্গাদের গায়ের মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার এক জোর উৎসব চলছে। একটা বিরাট হাতির মাংস তারা সব লোক মিলে আগুনে। ঝলসিয়ে খাচ্ছে। তাই দেখে ক্ষিদের জ্বালায় সেই মাংস খাবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল টারজনের। টারজান দেখল যে বিরাট পাত্রটাতে হাতির মাংস সিদ্ধ করা ছিল তার চারদিকে গাঁয়ের যোদ্ধারা ভিড় করে ছিল। তারা। সেই পাত্রটা থেকে মাংস নিয়ে খাচ্ছিল আর মাঝে মাঝে এক চুমুক করে তাদের দেশী মদ পান করছিল।
ক্ষিদের জ্বালায় জর্জরিত হয়ে গাছের উপর নীরবে বসে রইল টারজান। সে দেখল একে একে যোদ্ধারা সব মাংস আর মদ প্রচুর খাওয়ার পর ঘুমে কাতর হয়ে চলে যাচ্ছে। সবাই চলে গেলে একটা বুড়ো তখনো সেখানে মাংসের পাত্রটার পাশে বসে মাংস খাচ্ছিল। টারজান তাই আর অপেক্ষা না করে গাছ থেকে নেমে সোজা সেখানে চলে গেল। বুড়োটার গলাটা দুহাত দিয়ে টিপে ধরে তাকে হত্যা করে। পাত্রটা থেকে বেশকিছু মাংস নিয়ে বনের মধ্যে চলে এল সে।
বনের মধ্যে যেতে যেতে গাঁ থেকে মাইলখানেক দূরে এক জায়গায় থেমে কিছুটা মাংস খেল সে। এবার একটা গাছের উপর ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগল টারজান। ঘুম ভাঙ্গলে দেখল অনেক আগেই সকাল হয়ে গেছে, রোদ উঠেছে। গাছের তলায় একটা সিংহ দাঁড়িয়েছিল।
সিংহটা টারজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর গাছে উঠতে লাগল।
টারজান ক্রমশই যত উঁচু ডালে উঠতে থাকে সিংহটাও তাকে ধরার জন্য তত উপরে উঠতে থাকে। অবশেষে গাছের মাথায় শেষ ডালটায় উঠে টারজান ভাবল, এবার তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। কারণ আর কোন দিকে এগোন সম্ভব নয়।
এমন সময় অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটল। একটা বিরাটকায় পাখি কোথা থেকে উড়তে উড়তে এসে গাছটার মাথায় না বসেই টারজনের কাছে এসে ঠোঁট দিয়ে ঘাড়ে একটু ঠুকরে দিল আর টারজান সঙ্গে সঙ্গে সিংহের কবল থেকে বাঁচার জন্য পাখিটার পা দুটো দু’হাত দিয়ে ধরল শক্ত করে। পাখিটা টারজানকে নিয়েই উড়তে লাগল। এত বড় পাখি বইয়ে দেখলেও জীবনে কখনো চোখে দেখেনি সে।
এইভাবে পাখিটা অনেকদূর উড়ে যাবার পর টারজান একটা গাছের মাথা লক্ষ্য করে পাখিটার পা দুটো ছেড়ে দিয়ে সেই গাছটার উপর পড়ল।
টারজান দেখল আজ কয়েকদিন ধরে তার শরীরটা ভাল নেই। তাই বিশ্রামের আশায় সমুদ্রোপকূলে তার সেই কেবিনটায় চলে গেল। তারপর আপন মনে বই পড়তে লাগল।
সহসা তার মনে হলো কে যেন ঘরে ঢুকল। টারজান দেখল একটা বিরাট বাঁদর-গোরিলা ঘরে ঢুকে এগিয়ে আসছে তার দিকে। টারজান তার ছুরিটা শক্ত করে ধরে তৈরি হতে না হতেই গোরিলাটা তাকে জোর করে ধরে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কেবিন থেকে কিছুটা দূরে যেতেই নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে টারজান তার ছুরিটা অতর্কিতে গোরিলার পেট ও বুকের উপর বসিয়ে দিল। তখন টলতে টলতে ধড়াস করে পড়ে গেল গোরিলাটা।
