তারপর আবার পরদিন টিবোকে গুহার ভিতর হায়েনা দুটোর পাহারায় রেখে মবঙ্গাদের গায়ে চলে আসে বুকাবাই। সে মোমায়াকে বলে, আমি তোমার ছেলে যাতে ফিরে আসে তার ব্যবস্থা করব। আমাকে ছাগলগুলো দিয়ে দাও।
মোমায়া বলে, তুমিই আমার ছেলেকে চুরি করে নিয়ে গেছ।
বুকাবাই বলে, তোমার ছেলেকে আমি চুরি করে নিয়ে যাইনি। আমি জানি সে এক জায়গায় ভালই আছে। তবে দেরি হলে তার বিপদ ঘটতে পারে।
মোমায়া তখন তার ঘরে তার স্বামীকে ডাকতে গেল। সেখানে মবঙ্গা আর গাঁয়ের যাদুকর পুরোহিত রাব্বা কেগাও ছিল।
মবঙ্গা, মোমায়ার স্বামী ইবেতো আর যাদুকর কেগা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বুকাবাইকে বলল, তুমি যাদুর কি জান? কি ওষুধ তৈরি করবে? কোন যাদু এখনি দেখাতে পারবে?
বুকাবাই বলল, হ্যাঁ পারব। আমাকে কিছুটা আগুন এনে দাও।
মোমায়া একটা পাত্রে করে বেশ কিছুটা আগুন আনল। বুকাবাই সেই আগুন থেকে কিছুটা নিয়ে মাটিতে ফেলে তার কোমরে বাঁধা একটা থলে থেকে কিছু পাউডার জাতীয় একটা বস্তু আগুনটায় ছড়িয়ে দিল। তার থেকে প্রচুর ধোয়া বার হতে লাগল। তখন বুকাবাই চোখ বন্ধ করে কি বিড় বিড় করে বকতে বকতে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ার ভান করল। মবঙ্গা ও উপস্থিত সকলে তা দেখে অবাক বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে গেল।
রাব্বা কেগা তা দেখে ঘাবড়ে গেল। সে তখন তার নিজের কৃতিত্ব দেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। যে পাত্রটাতে আগুন ছিল তার উপর গোটাকতক শুকনো পাতা ফেলে দিল সে। তার থেকে ধোঁয়া বার হতে লাগল। কেগা তখন চোখ বন্ধ করে মুখটা পাত্রের উপর নামিয়ে অপদেবতাদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
বুকাবাই এবার তার ভান করা মূৰ্ছা ভেঙ্গে উঠে একবার গর্জন করে উঠল। তারপর সে হাত দুটো শক্ত করে টান করে ছড়িয়ে বসে বলল, আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি। তবে শয়তান বনদেবতা তাকে ধরতে পারেনি। আমাকে দশটা ছাগল দিলে এখনো উদ্ধার করা যাবে তাকে।
এবার কেগা বলল, আমিও তাকে দেখতে পাচ্ছি। তবে সে এখন মৃত। সে এখন নদীর তলায় পড়ে রয়েছে।
এদিকে টারজান বুকাবাই-এর গুহার মধ্যে ঢুকে দেখল টিবো কাঁদছে আর তার দুদিকে দুটো ক্ষুধিত হায়েনা তাকে ছিঁড়ে খাবার জন্য উদ্যত হয়েছে। টারজান ঢুকতেই হায়েনা দুটো টিবোকে ছেড়ে টারজানকে তেড়ে এল। টারজান একে একে হায়েনা দুটোর ঘাড় ধরে ছুঁড়ে দিতে লাগল। হায়েনা দুটো তখন ছুটে পালাল। টারজান তখন টিবোকে কাঁধে তুলে নিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে বনে চলে গেল। তারপর গাছে। গাছে তাদের গাঁয়ের দিকে উধ্বশ্বাসে এগিয়ে চলল।
মবঙ্গাদের গাঁয়ে যখন দু’জন যাদুকর তাদের আপন আপন যাদুর খেলা দেখিয়ে গ্রামবাসীদের মন জয় করার চেষ্টা করছিল ঠিক তখনি টারজান টিবোকে নিয়ে তাদের সামনে গিয়ে হাজির হলো। টিবোর। কাছে তার মা মোমায়া ছুটে যেতেই টিবো তাকে সব কথা বলল। এবার মোমায়া বুকাবাই-এর শয়তানির কথা জানতে পেরে তাকে ধরবার জন্য ছুটে গেল। কিন্তু তার আগেই বুকাবাই সরে পড়েছে। মোমায়া তখন কেগাকে রেগে বলল, আমার ছেলে নদীর তলায় মরে আছে? এই তোমাদের যাদু? ভণ্ড কোথাকার!
টারজান মবঙ্গাদের শত্রু হলেও টারজনের প্রতি কোন শত্রুতার ভাব দেখাল না মবঙ্গা। বরং তার উদারতা দেখে তারা সবাই খুশি হলো। কিন্তু টারজান টিবোকে তার মার হাতে তুলে দিয়েই সেখানে আর দাঁড়িয়ে চলে গেল।
বুকাবাই দেখল এখন তার একমাত্র শত্রু হলো শয়তান বনদেবতা টারজান। তার জন্যই আজ তার এই অপমান। তার জন্যই সে কোন ছাগল পেল না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল সে টারজনের উপর প্রতিশোধ নেবেই।
সেদিন ঘুরতে ঘুরতে টারজান যখন আনমনে বুকাবাই-এর গুহার কাছে এসে পড়ল তখন সমস্ত আকাশটা মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। একটু পরেই বৃষ্টি নামল।
টারজান একটা গাছের তলায় আশ্রয় নিল। পরে ঝড় শুরু হলে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না টারজান। প্রচণ্ড ঝড়ের আঘাতে বিরাট একটা গাছ পড়ে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে টারজানও ডাল পালাগুলোর তলায় চাপা পড়ে গেল। তার আঘাত তেমন গুরুতর না হলেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে।
ঝড় বৃষ্টি থামলে বুকাবাই তার হায়েনা দুটো নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কিছুটা এগিয়ে যেতেই একটা ভেঙ্গে পড়া গাছের তলায় একটা লোককে মরার মত পড়ে থাকতে দেখে হায়েনা দুটো তাকে ছিঁড়ে খাবার জন্য ছুটে গেল। বুকাবাই তার হাতে হাড়ের যে একটা লাঠি ছিল তা দিয়ে হায়েনাগুলোকে মেরে তাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখল যার উপর প্রতিশোধ নেবার কথা আজ সে দিনরাত ভাবছে এ সেই শয়তান বনদেবতা। সে টারজনের বুকের উপর কান পেতে দেখল এখনো জীবিত আছে টারজান। সে ভাঙ্গা গাছের ডালপালাগুলো সরিয়ে অচৈতন্য টারজানকে তুলে নিয়ে তার গুহার বাইরে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিল।
এরপর একটা পাহাড়ের ধারে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে তাকে বেঁধে রাখল বুকাবাই। কিন্তু তার হাত দুটো বাধল না।
এবার গুহার ভিতরে গিয়ে এক পাত্র জল নিয়ে এসে টারজনের চোখে মুখে ছিটিয়ে দিতেই চেতনা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকাল টারজান। বুকাবাই ঠিক করল সে হায়েনা দুটোকে এনে ছেড়ে দেবে টারজনের কাছে। তারা জীবন্তা টারজনের মাংস ছিঁড়ে খাবে। এইভাবে সে প্রতিশোধ নেবে টারজনের উপর।
