কিন্তু মোমায়া একদিন সন্ধ্যের সময় সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে বুকাবাইয়ের গুহার সামনে এসে হাজির হলো। গুহার ভিতর থেকে হায়েনাদের অট্টহাসির শব্দ আসতে থাকায় ভিতরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছিল না। সে। অবশেষে বুকাবাইয়ের নাম ধরে বারকতক ডাকতে বুকাবাই বেরিয়ে এল গুহা থেকে। বয়সে বৃদ্ধ হলেও বুকাবাইয়ের দেহে শক্তি ছিল প্রচণ্ড।
মোমায়া বলল, বনদেবতা আমার ছেলেকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে।
বুকাবাই বলল, এর জন্য পাঁচটা ছাগল, একটা শোবার মাদুর আর একটা তামার তার দিতে হবে আগে।
মোমায়া বলল, এত কোথায় পাব আমি?
শেষে ঠিক হলো তিনটে ছাগল আর একটা মাদুর দেবে মোমায়া। বুকাবাই বলল, আজ রাতেই ছাগল আর মাদুর নিয়ে আসবে।
মোমায়া বলল, তুমি আগে আমার টিবোকে এনে দাও।
কিন্তু তাতে কিছুতেই রাজী হলো না বুকাবাই। হতাশ হয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে গায়ের পথে রওনা হলো মোমায়া।
এদিকে তখন বুকাবাই যেখানে থাকত সেই পাহাড়টার কাছাকাছি জঙ্গলের এক জায়গায় টারজান ঘুরতে ঘুরতে শিকার করতে এসেছিল। এক সময় সে টিবোকে একটা ঝোপের ধারে রেখে কিছুটা দূরে চলে যায়। এমন সময় হঠাৎ ঝোপের ওধারে কার পায়ের শব্দ পেয়ে ভয় পেয়ে গেল টিবো। কাছে এসে মোমায়া তার ছেলেকে চিনতে পেরে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
এতক্ষণ একটা সিংহ ওদিকে একটা ঝোপের পাশ থেকে লক্ষ্য করছিল তাদের। এবার সিংহটা তাদের সামনে কিছুদূর এসে থমকে দাঁড়াতেই মোমায়া তার হাতের বর্শাটা সজোরে সিংহটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল। বর্শাটা সিংহের গায়ের কিছুটা বিদ্ধ করে পড়ে গেল। তার গায়ের খানিকটা মাংস ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। সিংহটা তাদের আক্রমণ করার জন্য সামনের পা তুলে উদ্যত হলো।
টিবোদের আর্ত চীৎকার কানে যেতে ছুটে এল টারজান। এসেই সে পিছন থেকে তার ছুরিটা সিংহটার পাঁজরে বসিয়ে দিল। এবার টারজনের ছুরির আঘাতে সিংহটা লুটিয়ে পড়তেই টারজনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠল মোমায়া। সে টিবোকে বুকের উপর জড়িয়ে ধরল। ভাবতে লাগল টারজান হয়ত আবার তার ছেলেকে ছিনিয়ে নেবে তার কাছ থেকে। কিন্তু টারজান সে ধরনের কোন ভাব দেখাল না।
টিবো অনুনয় বিনয় করে বলতে লাগল, টারজান, তুমি আমাকে আমার মার সঙ্গে যেতে দাও। তোমার কথা আমরা কোনদিন ভুলব না। তুমি খুব ভাল লোক।
টারজান বলল, যাও। তবে আমি তোমাদের দুজনকে তোমাদের গাঁ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসব, কারণ পথে কোন বিপদ ঘটতে পারে।
টারজনের কথাটা শুনে খুশি হলো মোমায়া। ওরা তিনজনে তখনি রওনা হয়ে পড়ল ওদের গায়ের পথে। এদিকে বুকাবাই তার গুহা থেকে বেরিয়ে মোমায়া কোন্ পথে যায় তা লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখল বনদেবতা টারজান মোমায়ার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং তারা বাড়ি চলে যাচ্ছে। তবু সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, মোমায়াকে যে ছাগল আর মাদুরের কথা বলেছে তা সে আদায় করে ছাড়বেই।
প্রায় দু’দিন পর মবঙ্গাদের গায়ে গিয়ে পৌঁছল ওরা। মোমায়া আর তার ছেলেকে গায়ে পৌঁছে দিয়ে সেখান থেকে চলে এল টারজান।
কিন্তু বাঁদর-গোরিলাদলের মাঝে ফিরে গেল না। প্রায় তিন দিন তার নিঃসঙ্গ জীবনটা খুব একঘেঁয়ে লাগায় সে বিকালের দিকে মবঙ্গাদের গাঁয়ের পথে রওনা হলো। সে ঠিক করল সন্ধ্যের দিকে একটা কি দুটো নিগ্রো যোদ্ধাকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারবে।
গাঁয়ের প্রান্তে বনের ধারে একটা গাছের উপর বসে লক্ষ্য করতে লাগল। সহসা এক নারীকণ্ঠের কান্না শুনে চমকে উঠল টারজান। সে ভাল করে দেখল একটা গাঁয়ের ভিতর একটা কুঁড়েঘর থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসছে মোমায়া।
টারজান এই কান্না দেখে ব্যাপারটা জানার জন্য নির্ভীকভাবে গায়ের মধ্যে সেই কুঁড়েগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাকে দেখে মোমায়া চিনতে পারল। কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, কে তার ছেলে টিবোকে আবার চুরি করে নিয়ে গেছে। তুমি মানুষ নও, দেবতা, একমাত্র তুমিই তাকে খুঁজে আনতে পারবে।
মোমায়ার ভাষা বুঝতে না পারলেও তার বক্তব্যটা মোটামুটি বুঝতে পারল টারজান। সে সেখানে আর না দাঁড়িয়ে গা থেকে বেরিয়ে বনে চলে গেল। টিবোকে সে সত্যিই ভালবাসত। তাকে সে তার মার কাছে এনে দেবেই।
গাছে গাছে কিছু দুর যাবার পর টারজান দেখল পাহাড়ের দিকে যে মাটির পথটা চলে গেছে সে পথে একটা ছেলে আর একটা বয়স্ক লোকের পায়ের ছাপ রয়েছে।
সেই ছাপ অনুসরণ করে সোজা বুকাবাই-এর গুহার সামনে যেতেই দুটো হায়েনা তাকে তেড়ে এল। টারজান গন্ধ শুঁকে বুঝল এই গুহার মধ্যেই টিবো আছে। টিবোকে দুটো হায়েনার পাহারায় রেখে বুকাবাই তার ছাগল আদায় করার জন্য মবঙ্গাদের গায়ে মোমায়ার কাছে গিয়েছিল।
বুকাবাই-এর আগে আর একদিন ঐ গায়ে গিয়ে মোমায়াকে বলে, আমার তুকতাকের জোরেই তুমি তোমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছ। আমার জন্যই বনদেবতা ফিরিয়ে দিয়েছে তোমার ছেলেকে। অতএব আমাকে পাঁচটা ছাগল দিয়ে দাও। আর একটা শোবার মাদুর আর তামার তার।
মোমায়া বলে, তুমি ত আমার জন্য কিছুই করোনি। তুমি ত বললে ছাগল না দিলে কিছুই করবে না।
বুকাবাই তবু শুনল না। কিন্তু মোমায়া কিছু দিতে না চাইলে সে রেগে চলে আসে। পরদিন সে গাঁয়ের বাইরে লুকিয়ে গিয়ে টিবোকে একলা পেয়ে জোর করে তুলে এনে তার গুহায় বন্দী করে রাখে।
