টারজনের ক্ষিদে পাওয়ায় সে হাতিটার পিঠ থেকে আবার গাছের উপর উঠে পড়ল। তারপর শিকারের সন্ধানে চলে গেল।
শিকারের সন্ধানে প্রায় এক ঘণ্টা ঘুরে বেড়াল টারজান। তারপর হঠাৎ তার একটা কথা মনে পড়ে গেল। কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রো যোদ্ধারা কি কারণে বনের মধ্যে পথের ধারে সেই বিরাট গর্তটা খুঁড়ে রেখেছে। সে বুঝল তার প্রিয় বন্ধু ট্যান্টরকে ফাঁদে ফেলার জন্য সে খালটা করেছে তারা। হাতিটা ঘুরতে ঘুরতে এতক্ষণে হয়ত সেই খালে এসে পড়েছে। সে জানে মূল্যবান দাঁত আর বেশি মাংসের লোভে হাতি শিকার করে নিগ্রোরা।
গাছের ডালে ডালে তীর বেগে যেতে লাগল টারজান।
কিছুটা এগিয়ে টারজান দেখল হাতিটা শিকারীদের তাড়া খেয়ে এই দিকেই ছুটে আসছে। টারজান তখন গাছ থেকে নেমে হাতিটার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দেখিয়ে বলল, থাম।
হাতিটা তাকে এবার চিনতে পেরে থামল। টারজান তখন চোরা গর্তটার উপরকার লতাপাতাগুলো তাড়াতাড়ি সরিয়ে হাতিটাকে গর্তটা দেখিয়ে দিয়ে তাকে সরে যেতে বলল। হাতিটা তখন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সরে গেল সেখান থেকে।
টারজান তখন তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে যেতে গিয়ে পড়ে গেল গর্তটার মধ্যে। হঠাৎ পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগায় সে অচৈতন্য হয়ে পড়ল।
এদিকে নিগ্রো শিকারীরা হাতিটার লোভে গর্তের মধ্যে উঁকি মেরে দেখে হাতিটাকে দেখতে পেল না। দু-তিনজন শিকারী গর্তের মধ্যে নেমে টারজানকে অচৈতন্য অবস্থায় দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল। তারা টারজানকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসে তার হাত পা বেঁধে ফেলল। তারপর তাকে ওরা গাঁয়ের। দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
মবঙ্গার নির্দেশে কয়েকজন যোদ্ধা টারজানকে একটা কুঁড়ে ঘরের দিকে নিয়ে গেল। টারজনের দূরে জঙ্গল থেকে একটা শব্দ কানে এল। টারজান সে শব্দ শুনতে পেয়ে মুখ তুলে জোরে অদ্ভুতভাবে একটা চীৎকার করল। টারজান বুঝতে পারল তার প্রিয় হাতিটা তাকে ডাকছে।
একটা কুঁড়ে ঘরের মধ্যে টারজানকে বন্দী করে রাখল ওরা।
সারাটা বিকেল ধরে টারজান তার হাত পায়ের বাঁধনগুলো খোলার চেষ্টা করতে লাগল। বাঁধনগুলো ক্রমে আলগা হয়ে এল। সন্ধ্যে হতেই একজন যোদ্ধা এসে টারজানকে তুলে ওদের উৎসবের মাঝখানে নিয়ে গেল। কিন্তু টারজনের হাত পায়ের বাঁধনগুলো তখন খুলে যাওয়ায় টারজান একটা লাফ দিয়ে। যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল খালি হাতে। সে ঘুষি মেরে অনেক যোদ্ধাকে ঘায়েল করল। একজন যোদ্ধা একটা বর্শা উঁচিয়ে টারজনের বুকটা লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে থাকলে গাঁয়ের প্রান্তে বনের ধারে ডালপালা ভাঙ্গার শব্দ হলো। টারজান বুঝত পারল তার প্রিয় ট্যান্টর এতক্ষণে মুক্ত করতে আসছে তাকে।
হাতিটা তীরবেগে এসে টারজনের চারপাশে ঘিরে থাকা যোদ্ধাদের একে একে গুঁড় দিয়ে জড়িয়ে। ধরে দূরে ফেলে দিতে লাগল। দুই-একজন হাতিটার পায়ের তলায় পড়ে মরল। অনেকে প্রাণভয়ে ছুটে পালাল। অবশেষে টারজানকে খুঁড় দিয়ে তার পিঠের উপর চাপিয়ে হাতিটা গাঁয়ের গেট পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে গেল।
কিছুদিন পর টারজান যখন ঘাস দিয়ে একটা দড়ি তৈরি করছিল, টিকার ছেলে গজন তখন তাকে প্রায়ই বিরক্ত করছিল।
নতুন দড়িটা তৈরি হয়ে গেলে টারজান সেটা নিয়ে একা শিকারে বেরিয়ে যেতেই সেদিন কিন্তু অদ্ভুত এক খেয়াল চাপল তার মাথায়। সে মনে মনে ঠিক করল এবার থেকে সে এক মানব সন্তানকে কাছে রেখে তাকে পালন করবে, তাতে সে কৃষ্ণকায় হলেও চলবে। টিকার ছেরে তার মত মানুষ নয়, এক জন্তু। সে তার মনের কথা ঠিক বুঝতে পারে না। তাই এক কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর খোঁজে মবঙ্গাদের গাঁয়ের পথে রওনা হলো সে।
মবঙ্গাদের গাঁয়ের কাছে নদীর ঘাটে এক নিগ্রো যুবতী মাছ ধরছিল। তার বয়স তিরিশ। নদীর পারে তার বছর দশেকের একটা ছেলে দাঁড়িয়েছিল।
গাছ থেকে নেমে পাশের একটা ঝোপ থেকে লক্ষ্য করল টারজান, ছেলেটা কালো হলেও দেখতে ভাল। টারজান তার দড়ির ফাসটা ছেলেটার গায়ের উপর ছুঁড়ে দিল। তারপর দড়িটা ধরে টান দিতেই ফাসটা ছেলেটার দুটো হাত সমেত গাটাতে আটকে গেল। এবার সে ছেলেটাকে টানতে টানতে গাছের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। ছেলেটার জোর চীৎকারে তার মা মাছ ধরা ফেলে ছুটে এল।
কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটাকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে মুহূর্ত মধ্যে গাছের মধ্য দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল টারজান।
ছেলেটাকে নিয়ে অনেকটা দূরে গিয়ে টারজান তাকে বলল, শোন, কেঁদো না। আমার নাম টারজান। আমি তোমার ক্ষতি করব না। আমি একজন বড় শিকারী।
কিন্তু টারজনের কোন কথা বুঝতে পারল না ছেলেটা। সে টারজানকে বনদেবতা মনে করে ভয় করছিল।
টারজান কিন্তু ছেলেটাকে সোজা তার দলের বাঁদর-গোরিলাদের কাছে নিয়ে গেল। তারা নিগ্রো আদিবাসীদের শত্রু ভাবত বলে নিগ্রো ছেলেটাকে ‘গোমাঙ্গানী বলে দাঁত বার করে তেড়ে এল। তখন টারজান তাদের সাবধান করে দিয়ে বলল, এ হচ্ছে টারজনের ছেলে। এর কোন ক্ষতি করো না তোমরা। তাহলে তোমাদের মেরে ফেলব। এ টিকার ছেলে গজনের সঙ্গে খেলা করবে। এর নাম টিবো।
টারজান টিকার ছেলে গজনকে এনে টিবোর সঙ্গে খেলা করতে দিল। কিন্তু টিবো কিছুতেই সহজ হতে পারছিল না।
এদিকে টিবোর মা মোমায়া তার ছেলেকে টারজান নিয়ে যাওয়ার পর সে তাদের গায়ের যাদুকর পুরোহিতকে ডেকে তার ছেলেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তুকতাক করতে বলে। তাকে তার জন্য দুটো ছাগল দেয়। কিন্তু কোন কাজ না হওয়ায় তার থেকে বড় যাদুকর বুকাবাইয়ের কাছে যাবার কথা ভাবে। কিন্তু গাঁয়ের সর্দার মবঙ্গা মোমায়াকে বুকাবাই-এর কাছে যেতে নিষেধ করল। বুকাবাই সেখান থেকে অনেক দূরে একটা পাহাড়ের গায়ে একটা গুহার মধ্যে থাকে। তার কাছে সব সময় দুটো হায়েনা থাকে। তাছাড়া সেখানে যেতে গেলে পথে বিপদ ঘটতে পারে।
