সবকথা শেষ করে সব রহস্যের সমাধান করে টারজান বলল, বিদায় বন্ধুগণ, আমি এবার আমার বাড়ি যাচ্ছি। মাঝে মাঝে আমার নিজের লোকদের দেখতে বাড়ি যাই বটে, কিন্তু জঙ্গলের ডাক না শুনে পারি না, তার টানে ধরা না দিয়ে পারি না।
টারজনের জঙ্গল জীবন (জাঙ্গল টেলস অফ টারজান)
সেদিন জঙ্গলের ঘন ছায়ার তলায় আরামে বিশ্রাম করছিল বাঁদর-গোরিলা টিকা। অদূরে একটা গাছের ডালের উপর বসে দোল খাচ্ছিল টারজান।
টিকা ছিল তার ছেলেবেলাকার খেলার সাথী। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বও বেড়ে যায়।
কিন্তু আজ সহসা টারজান যখন গাছের উপর থেকে দেখল টগ টিকার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার ঘাড়ের উপর একটা পা তুলে দিয়ে আদর করছে তাকে তখন মনটা বিগড়ে গেল টারজনের।
টারজান দাঁতগুলো বার করে গর্জন করে উঠল। তার পানে তাকাল টগ। টিকা মুখ তুলে তাকাল টারজনের পানে। সে এর কারণ কিছু বুঝতে পারল না। এবার সে টগের আদরের বিনিময়ে তার পিঠটা। চুলকে দিচ্ছিল।
এই দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরে গেল টারজনের। তার মনে হলো এই মুহূর্তে টিকাকে সারা জগতের মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বস্তু বলে মনে হচ্ছিল।
টারজান এগিয়ে এসে টগকে বলল, টিকা আমার।
টগ বলল, টিকা টগের, আর কারো নয়।
দু’জনেই এবার লড়াই-এর জন্য প্রস্তুত হলো। দু’জনেই দাঁত বার করে তেড়ে এল দু’জনকে। কিন্তু হঠাৎ সেখানে একটা চিতাবাঘ এসে পড়ায় টগ পালিয়ে গিয়ে একটা গাছের উপর উঠে পড়ল। টিকা তখনো গাছের তলায় মাটির উপরেই ছিল। কিন্তু চিতাবাঘটা তাকে সামনে পেয়ে তাকেই তাড়া করল। অন্য সব বাঁদর গোরিলাগুলোও গাছের উপর উঠে এক নিরাপদ আশ্রয় থেকে ঘটনাটা দেখে মজা পাচ্ছিল।
একা টারজান এগিয়ে গিয়ে চিতাবাঘটার সামনে দাঁড়াল। গর্জন করে চিতাবাঘটার দৃষ্টি টিকার উপর থেকে সরিয়ে তার নিজের উপরে নিবদ্ধ করার চেষ্টা করল। তার ঘাসের দড়ির ফাঁসটা চিতাবাঘটার গলায় ঠিক সেই মুহূর্তে আটকে না দিলে টিকাকে ধরে ফেলতো সে। চিতাবাঘটা গলার ফাঁসটা নিয়ে টানাটানি করতে থাকলে সেই অবসরে একটা গাছের উপর উঠে পড়ল টিকা।
সুযোগ পেয়ে টারজানও কাছাকাছি একটা গাছের উপর উঠে পড়ল। বাঘটা এবার দাঁত আর নখ দিয়ে ঘাসের দড়িটা ছিঁড়ে বনের ভিতর পালিয়ে গেল। চিতাবাঘটা পালিয়ে যেতেই বাঁদর-গোরিলাগুলো সব একে একে নেমে এল গাছ থেকে। টিকা দেখল টগ নয় টারজানই তার উদ্ধারকর্তা। তাই সে ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতার বশে টারজনের কাছে সরে এল।
টারজান এরপর সোজা গাছে গাছে মবঙ্গাদের গায়ের কাছে চলে গেল। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। দেখল শিকারীরা বনপথের উপর পশু শিকারের জন্য একটা বড় খাঁচা পেতে রেখে সব গাঁয়ে ফিরে এসেছে।
রাতটা মবঙ্গাদের গায়ের কাছে একটা গাছে কাটিয়ে সকাল হতেই সেখান থেকে ফিরে আসতে লাগল টারজান। ফেরার পথে দূর থেকে বাঁদর-গোরিলার ক্রুদ্ধ গর্জন শুনতে পেল সে।
এদিকে সকাল হতেই মবঙ্গাদের গায়ের যেসব শিকারী খাঁচাটা পেতে রেখে গিয়েছিল তারা তাতে কোন জন্তু ধরা পড়েছে কি না তা দেখতে এল। এসে তারা দেখল একটা বিরাটকায় বাঁদর-গোরিলা ধরা পড়েছে তাতে। তাদের দেখে গোরিলাটা ছটফট করছে বার হবার জন্য। তা দেখে বেশ মজা পেল তারা। টারজান সেখানে এসে গাছের উপর থেকে সবকিছু দেখে তার দলের কাছে ফিরে এল।
টিকা বলল, টগ কোথায়?
টারজান বলল, তাকে গোমাঙ্গানীরা ধরেছে। তারা তাকে বধ করবে।
একথা শুনে এক অব্যক্ত বিষাদ ফুটে উঠল টিকার চোখে মুখে।
তা দেখে আর বসে থাকতে পারল না টারজান। লাফ দিয়ে গাছের উপর উঠে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল কোথায়।
সোজা মবঙ্গাদের গায়ের দিকে চলে গেল টারজান। গায়ের কাছাকাছি গিয়ে দেখল শিকারী যোদ্ধারা ক্লান্ত হয়ে সবাই ঘুমোচ্ছে। শুধু একজন পাহারাদার খাঁচাটার কাছে বসে পাহারা দিচ্ছে।
টারজান তখন গাছ থেকে নেমে খাঁচাটার কাছে চলে গেল। তারপর পাহারাদারটার গলাটা দু’হাত দিয়ে টিপে ধরল। পাহারাদারটা মরে গেলে খাঁচার কাঠ খুলে টগকে মুক্ত করল টারজান। তারপর খাঁচার ভিতর পাহারাদারের মৃতদেহটা ফেলে রেখে টগকে নিয়ে গাছে উঠে পড়ল।
টারজান এবার টগকে বলল, তুমি টিকার কাছে চলে যাও। সে তোমার। টারজান তাকে চায় না।
টারজান গাছের উপর থেকে দেখল, একদল নিগ্রো যোদ্ধা একটা বড় রকমের গর্ত খুঁড়ছে। গর্তটা খোঁড়া শেষ হয়ে গেলে তার ফাঁকটায় কতকগুলো পাতা আর কিছু ঘাস চাপিয়ে দিল।
যোদ্ধারা সেখান থেকে চলে যেতেই টারজান গাছ থেকে নেমে গর্তটার চারদিকে ঘুরে সেটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। উপর থেকে দেখে সেটাকে গর্ত বলে চেনাই যায় না। তারপর গাছে গাছে তার দলের বাঁদর-গোরিলাদের কাছে চলে গেল।
এইভাবে কিছুটা যাওয়ার পর টারজান তার নাকের মধ্যে এক বিরাটকায় জন্তুর গন্ধ পেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখল একটা হাতি এগিয়ে আসছে সেই দিকে। টারজান গাছের উপর একটা ডাল ভাঙ্গতে তার শব্দে হাতিটা শুড় তুলে উপর দিকে তাকাল।
টারজান হাসতে লাগল। একটা নিচু ডালে নেমে এসে সে হাতিটাকে ‘ট্যান্টর, ট্যান্টর’ বলে ডাকতে লাগল।
এরপর হাতিটা শুধু মুখে একটা শব্দ করল। টারজান এবার গাছের ডাল থেকে হাতিটার পিঠের উপর নেমে পড়ল। হাতিটা টারজনের অনেক দিনের চেনা। ছেলেবেলা থেকে খেলা করে আসছে তার সঙ্গে।
