কিন্তু দেহটা তার শীর্ণ হলেও মনে তখনো জোর ছিল। আশা ছিল বার্টনের।
একদিন সকালের দিকে পাহাড়ের ধারে বসেছিল সামনে উপত্যকাটার দিকে তাকিয়ে। সহসা দেখতে পেল উপত্যকাটার উপর থেকে একদল যাত্রীর একটা সফরী এগিয়ে আসছে তার দিকে।
বহুদিন পর আজ প্রথম মানুষের দেখা পেল আফ্রিকার জঙ্গলের মধ্যে। আনন্দে চীৎকার করে উঠল বার্টন। দেখল সফরীতে রয়েছে একদল শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর দু’জন শ্বেতাঙ্গ মহিলা। কুলিরা মালপত্র বয়ে নিয়ে আসছিল পিছনে। রোদের তাপ থেকে মাথা বাঁচানোর জন্য শ্বেতাঙ্গদের মাথায় ছিল শিরস্ত্রাণ। সামনেই একজন স্থানীয় পথ-প্রদর্শক ছিল।
সফরীর কাছে ছুটে গেল বার্টন। তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, আনন্দে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সে হাত বাড়িয়ে ডাকতে লাগল তাদের।
তার ডাকে থেমে গেল চলমান সফরীটা। কিন্তু বার্টন দেখল তার প্রতি পথিকদের কারো কোন উৎসাহ বা আগ্রহ নেই।
বার্টনের ছেঁড়া ময়লা পোশাক আর শীর্ণ চেহারা দেখে একটি মেয়ে বলে উঠল, কি ভয়ঙ্কর!
বার্টন মেয়েটিকে চিনত। সে বলল, তোমার আচরণে আমি দুঃখিত বারবারা। তুমি শুধু উপরের পোশাকটাকেই দেখলে, কিন্তু সে পোশাক যে মানুষটা পরে আছে তাকে দেখলে না।
মেয়েটি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বলল, তুমি চেন আমাকে?
বার্টন বলল, ভালভাবেই চিনি। তুমি হচ্ছ বারবারা রামসগেট। লর্ড জন রামসগেট নামে ঐ ভদ্রলোক তোমার ভাই। অন্যদের আমি চিনি না।
পথিকদের একজন বলল, লোকটা বোধহয় আমাদের এই সফরীর কথা কারো কাছে শুনেছে। যাই হোক, তোমার কথা বল। তুমি কি তোমাদের সফরীর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছ? তুমি কি ক্ষুধার্ত? তুমি কি আমাদের যাত্রীদলে যোগ দিতে চাও?
লর্ড জন বলল, থাম বাল্ট ওকে ওর কথা বলতে দাও।
বার্টন বলল, আজ যদি তোমাদের একজন কুলির সঙ্গে আমার দেখা হত, তাহলে সে আগে আমায় কিছু খাদ্য ও পানীয় দিত।
মেয়েটি লজ্জিত হয়ে বলল, আমি দুঃখিত। আমি খাবার ও জল আনতে বলেছি।
বার্টন বলল, তাড়াতাড়ি করতে হবে না। আমি আগে তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেব। আমি লন্ডন থেকে একটি বিমানে করে কেপটাউন যাচ্ছিলাম। পথে নামতে বাধ্য হই। তারপর থেকে আমি বঙ্গানির দিকে এগিয়ে চলেছি। এবার আমি আমার পরিচয় দিচ্ছি। আমার নাম লেফটেন্যান্ট সিসিল গাইলস বার্টন। আমি সরকারি বিমানবাহিনীতে কাজ করি।
লেডি বারবারা বলল, অসম্ভব! এ কখনই হতে পারে না।
লর্ড জন বলল, আমরা বার্টনকে চিনি। তোমাকে তার মত দেখতে লাগছে না।
তার জন্য দায়ী আফ্রিকা। তোমরা কাছ থেকে খুঁটিয়ে দেখলে অবশ্যই চিনতে পারবে। প্রতি সপ্তার শেষে আমি তোমাদের রামসগেট প্রাসাদে অতিথি হিসেবে যেতাম।
লর্ড জন ভাল করে বার্টনকে দেখে চিনতে পেরে বলল, হা ভগবান! সত্যিই ত। ক্ষমা করো বন্ধু।
এই বলে করমর্দনের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল তার।
বার্টন কিন্তু সে হাত গ্রহণ করল না। বলল, এই হাত একজন দুর্দশাগ্রস্ত বিপন্ন পথিকের দিকে আগেই বাড়িয়ে দেয়া উচিত ছিল। সুতরাং এখন এ হাত আমি মর্দন করতে পারব না।
লর্ড জন তার বোনকে বলল, ঠিকই বলেছে। ভুলটা আমাদেরই।
আর আপত্তি করল না বার্টন। তারা পরস্পরের করমর্দন করল। বারবারা তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডানকান ট্রেন্ট নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
খাওয়ার পর সফরীর অন্য সব সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হলো বার্টন। সেই দলে মিঃ রোমানফ নামে এক রুশীয় পথিক ছিল। সে দাড়ি কামাতে কামাতে বার্টনকে জানাল বঙ্গানি সেখান থেকে এখনো দুশো মাইল দূরে।
বার্টন আরো জানতে পারল আসলে দুটো সফরী ছিল। একটা ছিলা রোমানফের আর একটা ছিল লর্ড জনদের। পরে যখন ওরা দেখল ওদের গন্তব্যস্থল এক অর্থাৎ ওরা সকলেই বঙ্গানি যাবে তখন এক করে ফেলল দুটো সফরী।
জন বলল, তফাৎ এই যে রোমানরা বন্দুক নিয়ে শিকার করে আর আমরা ক্যামেরা নিয়ে শিকার করি।
ট্রেন্ট বলল, সব বাজে। এর থেকে পশুশালায় গিয়ে জীবজন্তুদের ছবি তুলে আনলেই হলো।
বার্টন আরও জানল জিরাল্ড ছিল আগে রোমানফের পথ-প্রদর্শক। বার্টন জানতে পারল একে একে সে ছাড়া আরো দু’জন বিপন্ন পথিক এই সফরীতে যোগদান করে। তারা হলো স্মিথ আর পিটারসন। তাদের আদিবাসী সঙ্গীরা নাকি তাদের ত্যাগ করে চলে যায়।
বার্টন বলল, ওদের দেখে কিন্তু ভাল মানুষ মনে হচ্ছে না।
লর্ড জন বলল, ওরা নিজেদের কোন কাজই করতে চায় না। তাছাড়া গল্টের আচরণ বড়ই প্রভুত্বমূলক। সে কথায় কথায় সকলকে বিদ্রূপ করে। সবাই তাকে ঘৃণা করে। আমাদের এই সফরীটাকে মোটেই এক সুখী পরিবার বলা যায় না।
ডিনারের পর কফি আর সিগারেট দেয়া হলো সকলকে।
বার্টন বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, আজ সকালেই আমি না খেয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছিলাম। কার ভাগ্যে কি আছে তা কেউ জানে না।
বারবারা বলল, ভবিষ্যতে আমাদের কি আছে সেটা আগে হতে জানতে না পারাটাই বোধ হয় ভাল।
দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল। বার্টনের সঙ্গে জন রামসগেটের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যেতে লাগল। বিশেষ করে সে বারবারাকে ভালবেসে ফেলল। তার লক্ষণ দেখে ডানকান ট্রেন্ট ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।
একদিন গোলমান বাধল সফরীর মধ্যে। বার্টন হঠাৎ সেখানে এসে পড়ায় সে গোদেনস্কিকে একটা ঘুষি মেরে ফেলে দিল। গোদেনস্কিও তার ছুরি বার করল। তখন বারবারা এসে পড়ায় গোদেনস্কি চলে গেল।
