তাদের গাঁয়ের যাদুকর ডাক্তার বন্দী অবস্থায় না রেখে তখনি মেরে ফেলতে বলল টারজানকে। কিন্তু গাঁয়ের অনেকে টারজানকে ছেড়ে দিতে বলল। কারণ তাকে বধ করলে তার মৃত আত্মা গায়ের অনেক ক্ষতি করবে।
তখন চেমিঙ্গোর বাবা সর্দার পিঙ্গু একটা আপোষ করল।
পিঙ্গু হুকুম দিল, বন্দীকে ভাল করে বেঁধে উপযুক্ত পাহারার মধ্যে রেখে দাও। তার ক্ষত স্থানের চিকিৎসা করো। এর মধ্যে যদি কোন অশুভ ঘটনা না ঘটে তাহলে অন্যান্য বন্দীদের মত তারও অবস্থা হবে। তখন ভোজন উৎসব চলবে।
টারজনের ক্ষত স্থান থেকে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে গেল। সাধারণ মানুষ হলে সেই ক্ষততেই মৃত্যু হত। তার। কিন্তু টারজান সাধারণ মানুষ নয়। এরই মধ্যে সেরে উঠেছে সে। মুক্তির কথা ভাবতে শুরু করে দিয়েছে।
বুইরোরা তাকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল। প্রতিদিন রাতে তারা বাঁধনটা শক্ত করে দিত। আবার টারজান তার পরে একটু একটু করে আলগা করে দিত সে বাঁধন যাতে তার হাতে পায়ের রক্ত চলাচলে কোন অসুবিধা না হয়।
টারজান বুঝতে পারে তারা ওকে খাইয়ে মোটা করতে চাইছে। তার শক্ত পেশীবহুল দেহটার মাংস খেতে ওদের ভাল লাগবে না। তাই তার দেহে চর্বির সঞ্চার করে ওর দেহটাকে নরম করতে চায়।
বন থেকে বাতাসে ভেসে আসা অনেক শব্দই শুনতে পায় সে। শীতা বা চিতা বাঘের ডাক, ভাঙ্গো বা হায়েনার অট্টহাসি, নুমা বা সিংহের গর্জন-অনেক কিছুই শুনতে পায় সে।
সহসা একটা শব্দ শুনে সজাগ হয়ে ওঠে সে। মাথাটা দোলাতে দোলাতে মন্ত্র উচ্চারণের মত মুখ থেকে একটা শব্দ বার করতে থাকে। প্রহারারত রক্ষী তাকে জিজ্ঞাসা করে, কি করছ?
টারজান বলে, আমি প্রার্থনা করছি।
রক্ষী পিঙ্গুর কাছে গিয়ে কথাটা জানালে সে বলে, ঠিক আছে। ওকে প্রার্থনা করতে দাও।
রক্ষী এসে দেখে সেইভাবে প্রার্থনা করতে করতে মাঝে মাঝে চীৎকার করে উঠছে টারজান।
টারজান বুঝতে পারে তার চীৎকারে কাজ হচ্ছে। কানে এক বাঞ্ছিত শব্দ আর নাকে এক আকাঙ্খিত গন্ধ পায় সে। বুইরোরা এসব কিছুই বুঝতে পারে না।
টারজান যখন এক একবার গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে তখন বুইরোরা ভাবে তার গলায় খুব জোর আর সে তার দেবতাদের শোনাবার জন্য এত জোরে চীৎকার করছে।
এদিকে জঙ্গলের গভীরে তখন টারজনের হাতি-বন্ধু ট্যান্টর একদল হাতির সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে ছিল দলপতি। সে হঠাৎ টারজনের ডাক শুনতে পায়। সে তখন চীৎকার করে তার দলের অন্য সব হাতিদের জড়ো করে এক জায়গায়। তারপর একযোগে টারজনের গলার শব্দ লক্ষ্য করে বুইরোদের বস্তির দিকে আসতে থাকে।
গাছপালা ভেঙ্গে গর্জন করতে করতে গায়ের দিকে আসতে থাকা হাতির দলের শব্দটাকে টারজানই। প্রথমে শুনতে পায়। হাসি ফুটে ওঠে টারজনের ঠোঁটে। তার প্রার্থনায় তাহলে কাজ হয়েছে।
টারজান এবার স্পষ্ট শুনতে পায় কাঠের গেট ভেঙ্গে গাঁয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছে মত্ত হাতির দল। সে তখন জোরে চীৎকার করে ওঠে, ট্যান্টর ট্যান্টর, তোমরা আমার কাছে এস, এই যে আমি।
কিন্তু টারজনের ডাক শোনবার কোন প্রয়োজন ছিল না হাতিদের। তার গন্ধ তারা পেয়েছিল।
গোটা গাঁটাকে বিধ্বস্ত করে সব কুঁড়েগুলোকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়ে টারজনের ঘরের সামনে এসে উপস্থিত হল হাতিরা। তারপর ঘরের চালটাকে তুলে ফেলে টারজানকে শুড় দিয়ে পিঠে উঠিয়ে নিল তার বন্ধু ট্যান্টর।
হাতির পিঠে উঠেই টারজান অন্য হাতিদের কি করতে হবে না হবে নির্দেশ দিতে লাগল। গোটা গাটা একেবারে বিধ্বস্ত হলে এবং বুইবোরা হাতিদের অত্যাচারে গা ছেড়ে সাময়িকভাবে পালিয়ে গেলে টারজান হাতির দলকে বনে ফিরে যাবার নির্দেশ দিল। টারজনের হাত দুটো বাঁধা ছিল তখনো। হাতির পিঠে চেপে বনে ফিরে গেলে বাদরেরা খুলে দিল তার হাতের বাঁধন।
ট্যান্টরকে আদর করে হাতিদের কাছ থেকে বিদায় নেবার পর আবার গাছে উঠে যাত্রা শুরু করল টারজান। কিন্তু এবার আর বিদেশী বিমান যাত্রীদের খোঁজে নয়। সেই ইংরেজ বিমানযাত্রী হয়ত এতদিনে আর বেঁচে নেই। হয় সে বনের মধ্যে না খেয়ে মারা গেছে অথবা কোন হিংস্র জন্তুর পেটে গেছে।
যাই হোক, এখন বঙ্গানি যেতে হবে। সেখানকার রেসিডেন্ট কমিশনার তার বন্ধুবর টারজানকে ঢোল সহরৎ করে খবর পাঠিয়েছেন সে যেন অবিলম্বে দেখা করে তার সঙ্গে। বুইরোদের গায়ে বন্দী অবস্থায় থাকার সময়েই এই ঢোল সহরতের কথা শুনতে পায় সে।
আফ্রিকার গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিনের পর দিন ধরে পথ চলাকালে দু’দুবার সিংহের কবলে পড়েছিল বার্টন। কিন্তু দুটোরই কাছাকাছি একটা গাছ পেয়ে যাওয়ায় সেই গাছের উপর উঠে পড়ে প্রাণ বাঁচায় সে। একবার সারাদিন গাছে উঠে বসে থাকতে হয় সিংহের ভয়ে। তৃষ্ণায় একটু জল পর্যন্ত খেতে পায়নি। অবশেষে অধৈর্য হয়ে শিকারের আশা ছেড়ে চলে যায় সিংহটা। আর একদিন আর একটা সিংহের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কিন্তু সিংহটার পেট ভর্তি ছিল বলে সে কোন মনোযোগ দেয়নি বার্টনের দিকে। বার্টন। অবশ্য ভাবত সিংহমাত্রই সব সময় নরখাদক। তারা জীবজন্তুকে দেখলেই বা হাতের কাছে পেলেই খেয়ে ফেলে।
কিন্তু খাদ্যের সমস্যাটা দিনে দিনে প্রকট হয়ে উঠল বার্টনের কাছে। খেতে না পেয়ে তার শরীর রোগা হয়ে যেতে লাগল দিনে দিনে। হাতের কাছে ফলমূল যা পেতে লাগল তাই খেতে লাগল।
