সহসা পিছন ফিরতেই অস্তম্লান সূর্যের শেষ রশ্মিতে বার্টন এক সময় দেখল তার পিছনে অনেক দূরে একটা উড়ন্ত বিমানের রূপালি পাত চকচক করছে।
তার বিমানের আলো দেখে পিছনের বিমান সারারাত ধরে অনুসরণ করে আসতে লাগল। বিমানটা তার বিমানের থেকেও দ্রুতগামী। তাই তার খুব কাছে কাছে আসছে।
শত্রুদের আসল উদ্দেশ্যের কথা বুঝতে পারল বার্টন। শত্রুরা তাকে চায় না, চায় শুধু সেই নক্সাটা আর তার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র। একবার সে কোন রকমে বঙ্গানিতে পৌঁছতে পারলেই আর তার কোন ভয়ই থাকবে না। তার নক্সা ও সরকারি কাগজপত্র সব নিরাপদে রেখে দিতে পারবে। তার যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে।
কিন্তু তা আর হলো না। সকাল হতেই বার্টন দেখল অনুসরণকারী বিমানটা তার একেবারে কাছে বাঁ দিকে এসে পড়েছে। তার একদিকের পাখাটা প্রায় ঠেকছিল তার বিমানের পাখায়।
বার্টন দেখল সেটা ইতালির বিমানবাহিনীর এক অনুসন্ধানকারী বিমান। ইতালীয় সামরিক বিভাগের একজন অফিসার সেটা চালাচ্ছে। এ ছাড়া সে বিমানে যে দু’জন যাত্রী ছিল তাদের চিনত না বার্টন। তবে তার মনে হলো তারাই হলো জুবানোভ আর ক্যাম্পবেল। তাদের কখনো চোখে দেখেনি এবং চিনত না। তবু তার মনে হলো তারা ছাড়া আর কেউ নয় এই দু’জন যাত্রী।
উড়ন্ত বিমান দুটোর পিছনে ছিল উন্মুক্ত প্রান্তর। অনুসরণকারী বিমানের চালক তাকে প্রায়ই থামতে বলেছিল। কিন্তু বার্টন থামবে না। সে দেখছিল আর মাত্র পঞ্চাশ মাইল পরেই বঙ্গানির বিমানবন্দর। সুতরাং সে ইশারায় জানাল সে থামবে না।
তখন পিছনের বিমান থেকে মেশিনগানের গুলি ছুটে এসে তার বিমানের পিছনে লাগল। বার্টনের হাতে তখন ছিল মাত্র একটা পিস্তল। সেই পিস্তল থেকে সে বিমানের কন্ট্রোলরুমের যাতে ক্ষতি হয় তার জন্য আরো তিন-চারবার গুলি করল সে।
পিছনের বিমানটা তখন তার দিকে পরিবর্তন করল। মনে হলো সেটা নামতে শুরু করেছে। বার্টন তখনো এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যাবার আগ তার শত্রুরা চরম আঘাত হেনে গেল তাকে। মেশিনগান থেকে আবার গুলি করতে সে গুলির আঘাতে তার বিমানের পিছনের রাডার ও স্টেবিলাইজার ভেঙ্গে গেল। বিমানটা ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামতে লাগল।
বার্টন তখন ইঞ্জিন থেকে বেরিয়ে এসে প্যারাসুটে করে মাটিতে নামল। নামার সময় দেখল অনুসরণকারী শত্রু বিমানটা দক্ষিণ দিকে নিচে নামতে নামতে বনের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
একই বনের মধ্যে দু’জায়গায় ভেঙ্গে পড়ে থাকা এই বিমান দুটিকে দেখে টারজান।
প্যারাসুট থেকে বাইরে এসে বার্টন দেখল, চারদিকে শুধু বন আর বন। কোথাও কোন জনবসতি বা জনপ্রাণী নেই। দেখল আফ্রিকার বিশাল গভীর জঙ্গলের মাঝখানে এসে পড়েছে সে। তার মনে হলো এখান থেকে পূর্ব দিকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে পড়বে বাসেলি।
বার্টন দেখল তার বিমানটা এক ফুট দূরে পড়েছে। ইঞ্জিনে আগুন লাগেনি। ইঞ্জিনটা কেটে দিয়েছিল সে শুধু। বিমানে গিয়ে কিছু খাবার আর গুলি নিয়ে এসে তার ধারণামত পথ ধরে বঙ্গানির দিকে রওনা হয়ে পড়ল সে।
সে বুঝতে পারল তার অনুসরণকারীদের বিমানটাও এখান থেকে কিছু দূরে পড়েছে এবং তারা তার খোঁজে বেরিয়ে পড়বে নিশ্চয়। সে ভাবল বঙ্গানি। যদি এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে হয় তাহলে আজ থেকে তৃতীয় দিনের মধ্যে সে পৌঁছবে সেখানে।
কিন্তু বার্টন জানত না যে এ অঞ্চলে সিংহ আছে এবং এখানকার আদিবাসীরা মোটেই বন্ধুভাবাপন্ন নয়। সে আরও জানত না বঙ্গানি এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল নয়, তিনশো মাইল দূরে অবস্থিত।
সিসিল বার্টনের পথে বুইরো নামে এক নরখাদক আদিবাসীদের বস্তি ছিল। কিন্তু সে তাদের দেখা না পাওয়ায় সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পার হয়ে গেল তাদের অঞ্চলটা। অথচ এই আফ্রিকার জঙ্গলের মধ্যে যার জন্ম সেই বাঁদরদলের রাজা টারজান ঘটনাক্রমে বুইরোদের আকস্মিক আক্রমণে আহত ও বন্দী হলো।
টারজান সেদিন প্রতিকূল বাতাসে বনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল তখন অনুকূল বাতাসের অভাবে কোন গন্ধ-সূত্র না পাওয়ায় সে মোটেই জানতে পারেনি প্রায় বিশজন বুইরো তার পথ ধরেই আসছে। তারা শিকার করতে করতে এসে পড়ে সেই দিকে।
তারা খুবই নিঃশব্দে তার দিকে এগিয়ে আসছিল বলে তাদের পদক্ষেপের কোন শব্দ শুনতে পায়নি টারজান।
এমন সময় তার বাঁ দিকে একটা আহত সিংহকে দেখতে পেল সে। সিংহটার গায়ের এক পাশ থেকে রক্ত পড়ছিল। সিংহটা হঠাৎ ঘুরে আক্রমণ করল টারজানকে। টারজান তার ডান কাঁধ থেকে ভারী বর্শাটা নামিয়ে তা দিয়ে সিংহটাকে মারতে উদ্যত হতেই পিছন থেকে বুইরোরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।
তাদের সর্দার পিঙ্গুর ছেলে চেমিঙ্গো চিনতে পেরেছিল টারজানকে। এই চারজনই একবার তাদের গাঁ থেকে তাদের এক বন্দীকে ছিনিয়ে নিয়ে এসে বোকা বানায় তাকে।
চেমিঙ্গো তাই সময় নষ্ট না করে তার বর্শা দিয়ে টারজনের পিঠে আঘাত করল। তবে আঘাতটা তত জোর হয়নি, তেমন আহত হলো না টারজান। টারজানও তার পিঠের তৃণ থেকে একটা তীর নামাল।
এদিকে সিংহটা তখন ঢাল হাতে একজন বুইয়েরা যোদ্ধার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ফেলে দিল। তখন অন্য যোদ্ধারা একযোগে আক্রমণ করে ঘায়েল করে ফেলল সিংহটাকে।
চেমিঙ্গো এবার খুশি হয়ে বন্দী টারজান আর সিংহের একটা মৃতদেহ নিয়ে বিজয়গর্বে তাদের গায়ে গিয়ে হাজির হলো।
