ব্লেক বলল, এখন কিছু খাবারের জন্য নিকটবর্তী গায়ে নিয়ে যাব তোমাকে। আমি একবার সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে দেখে গাঁয়ের লোকেরা পালিয়ে যায়।
ব্লেক স্টিম্বলকে নিয়ে সেই আদিবাসীদের গায়ে চলে গেল। এবারেও গাঁয়ের লোকরা তাকে দেখে পালিয়ে গেল। ব্লেক প্রচুর খাদ্য পেল। স্টিম্বলকে পেট ভরে খাইয়ে সে তার ঘোড়াটাকেও খাওয়াল।
এমন সময় টারজনের ওয়াজিরি যোদ্ধারা সেখানে এসে হাজির হলো। তারা এসে ব্লেককে ইংরেজিতে বলল, তারা টারজনের লোক। তারা তাদের মালিকের খোঁজ করছে। যাই হোক, তারা সেই গাঁয়েতেই ব্লেককে নিয়ে রয়ে গেল। স্টিম্বল কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠল। ব্লেক ভাবল এবার তাকে কোন। উপকূলে পাঠাতে আর কষ্ট পেতে হবে না।
শেখ ইবন জাদের দলের অবস্থা ক্রমশই শোচনীয় হয়ে উঠছিল। মালবাহকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তার উপর তাদের পিছনে সর্বক্ষণ একটা সোনালী রঙের সিংহকে আসতে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তার মাঝে থেকে থেকে একটা কণ্ঠস্বর কানে আসছিল। তাদের, প্রতিটি রত্নের জন্য একফোঁটা করে রক্ত দিতে হবে তোমাদের। তবু ধনরত্নের লোভটা ছাড়তে পারছিল না শেখ।
হঠাৎ আবার একটা তীর এসে একজন মালবাহকের বুকে লাগল। লোকটা মারা যেতেই আবার সেই অদৃশ্য মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, শেখ, তুমি নিজের সব ধনরত্ন তুলে নিয়ে বহন করতে থাক। তুমি নরহত্যা করে এই ধন লুণ্ঠন করেছ। তুমি হত্যাকারী। তোমার এই হলো শাস্তি।
বস্তা কাঁধে পথ চলতে পারছিল না শেখ। তার উপর তার পিছনে সিংহটা সমানে আসছিল। সে অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। ..
তার এই অবস্থা দেখে আতিজা একটা বন্দুক হাতে তার বাবার কাছে এসে বলল, ভয় করো না বাবা, আমি তোমার সঙ্গে আছি। আমি তোমাকে রক্ষা করব।
পথে যেতে যেতে ওরা একটা আদিবাসীদের গায়ে এসে উঠল। ওরা আর চলতে পারছিল না। সেই গায়েই ছিল টারজনের ওয়াজিরি যোদ্ধারা, জায়েদ, ব্লেক আর স্টিম্বল।
ওয়াজিরিরা আরবদের দেখে তাদের সব অস্ত্র কেড়ে নিল। ক্লান্ত ও ভীত অবস্থায় বাধা দিতে পারল না তারা। জায়েদ আরবদের বলল, ইবন জাদ কোথায়?
আরবরা বলল, পিছনে আসছে।
জায়েদ দেখল আতিজা তার বাবা শেখকে সঙ্গে করে সেদিকেই আসছে। সে ছুটে গিয়ে আতিজাকে জড়িয়ে ধরল। ওয়াজিরি যোদ্ধাদের দেখে ভয়ে মাটির উপর বসে পড়ল শেখ। ধনরত্ন ভরা বড় বস্তাটা পড়ে গেল তার হাত থেকে।
এমন সময় শেখের স্ত্রী হিরফা ভয়ে চীৎকার করে উঠল। সে দেখল একটা বড় সিংহকে নিয়ে দৈত্যাকার এক শ্বেতাঙ্গ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
টারজানকে দেখতে পেয়ে ব্লেক ছুটে এসে তাকে ধরল। বলল, দেরী হয়ে গেল টারজান, জিনালদা মারা গেছে।
টারজান হেসে বলল, বাজে কথা। আমি আজ সকালে তাকে নিমুর নগরীতে পৌঁছে দিয়ে এসেছি।
ব্লেক বিশ্বাস করতে চাইছিল না। টারজান তাকে সব ঘটনা একে একে পরিষ্কার করে বললে সে শান্ত হলো।
পরদিন সকালে সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। ব্লেক বলল, সে নিমুর নগরীতে ফিরে যাবে। রাজকন্যা জিনালদ্বাকে নিয়ে নিমুরের রাজপ্রাসাদেই বসবাস করবে। সে আর দেশে ফিরবে না। স্টিম্বলকে চারজন ওয়াজিরি আপাতত টারজনের বাংলো-বাড়িতে বয়ে নিয়ে যাবে। সেখান থেকে তার যাবার ব্যবস্থা করে দেবে টারজান।
জায়েদ আর আতিজাকে টারজনের বাড়িতেই কাজ করতে বলল টারজান। তার বাড়িতে রেখে দেবে তাদের। কিন্তু শেখকে ও বাকি আরবদের ক্ষমা করল না টারজান। ঠিক করল, আপাতত শেখদের ওয়াজিরি যোদ্ধাদের একটি দল একটা গায়ে নিয়ে যাবে। সেখান থেকে ওদের আবিসিনিয়ায় নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হবে।
টারজন ও জঙ্গলে খুন (টারজন এ্যাণ্ড দি জাঙ্গল মার্ডারস)
লেফটেন্যান্ট সিসিল বার্টন ভূ-মধ্যসাগরের উপর দিয়ে দক্ষিণ দিকে আফ্রিকার উপকূলভাগের দিকে উড়ে চলেছিল। সে হঠাৎ পশ্চিমে ফিরে লন্ডনে চলে যেতে পারত। কিন্তু ইংরেজ সরকার থেকে নির্দেশ এসেছে তাকে আফ্রিকার কেপটাউনে যেতে হবে। যাবার পথে বঙ্গানিতে নেমে তার রাখা সেখানকার রেসিডেন্ট কমিশনারের হাতে নক্সাটা দিয়ে যেতে হবে।
বঙ্গানিতে একটা বিমানবন্দর ছিল। কিন্তু সেটা জরুরি অবস্থায় কাজ চালানোর জন্য ব্যবহৃত হত। সেখানে বিমানে তেল নেবার ব্যবস্থা আছে কি না তা না জানায় বার্টন ঠিক করল সে তিউনিসে নেমে ট্যাঙ্কে তেল ভরে নেবে।
সে যখন ট্যাঙ্কে তেল ভরছিল আর অফিসারদের সঙ্গে কথা বলছিল তখন তিউনিসের একজন অধিবাসী তাকে ইংরেজি ভাষায় বলল, ইতালীরা তোমাকে মারতে মারতে কেপটাউনে নিয়ে যাবে যদি বেশিক্ষণ এখানে থাক।
বার্টন বুঝল, ইতালীয় সরকার নিশ্চয় তার খোঁজ করছে এবং তাকে ধরার জন্য পিছু নিয়েছে।
তাই তেল ভরেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিমান ছেড়ে দিয়ে আকাশে উঠল বার্টন। বুঝল তিউনিসের স্থানীয় লোক তাকে সতর্ক করে দিয়ে ভালই করেছে। তার উপকার করেছে।
বারবার পিছন ফিরে আকাশপথে দেখতে লাগল বার্টন কোন অনুসরণকারী বিমান তার পিছু পিছু আসছে কি না। তিউনিসের বিমানবন্দরে তার মোট সময় গেছে আধঘণ্টা। তখন গোধূলিবেলা। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতে তখনো কিছু দেরী আছে। তাই বার্টন ভাবল সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত যদি সে অনুসরণকারীদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকতে পারে তাহলে রাত্রির অন্ধকারে তাকে ধরতে পারবে না। তারা। সে যাচ্ছিল বঙ্গানি বিমানবন্দরের দিকে। কেপটাউনে যাবার আগে সেখানে থামবে সে।
