তখন বিকালবেলা। বাঁদর-গোরিলাদের রাজা তোয়াৎ তার দলের গোরিলাদের নিয়ে বনের মধ্যে আহার অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছিল। তাদের দিকে ধীর গতিতে তিনজন লোক আসছিল। একজন আরব, একজন শ্বেতাঙ্গ আর একজন নারী।
আগন্তুক তিনজনের মধ্যে একজন শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধ জ্বরে ভুগছিল। রুগ্ন অবস্থায় সে একটা গাছের ডাল লাঠির মত করে ধরে তার উপর ভর দিয়ে পথ হাঁটছিল। আরব লোকটির হাতে একটা বন্দুক ছিল। মেয়েটির পোশাকটা জমকালো হলেও তা ময়লা এবং ছেঁড়া।
জিনালদাকে তার লোমশ হাত দিয়ে ধরে ফেলল তোয়াৎ। সে, তাকে নিয়ে পালাতে চাইল। কিন্তু গোয়াদ নামে আর একটা বাঁদর-গোরিলা দাঁত বার করে তোয়াতের দিকে তেড়ে এল জিনালদাকে কেড়ে নেবার জন্য।
তোয়াৎ জিনালদাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু সে বেশিদূর যেতে পারল না। গোয়াদ তাকে তাড়া করল। তখন জিনালদাকে নামিয়ে দিয়ে গোয়াদের সঙ্গে লড়াইয়ে মত্ত হয়ে উঠল তোয়াৎ।
ওরা যখন দু’জনে জোর লড়াই করছিল জিনালদাকে হাত করার জন্য তখন চেষ্টা করলে সেই অবসরে পালিয়ে যেতে পারত জিনালদা। কিন্তু সে তখন অত্যন্ত ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ায় পালাতে পারল না।
এমন সময় সেখানে কালো কেশরওয়ালা সোনালী রঙের একটা সিংহ এসে পড়ায় লড়াই ছেড়ে পালিয়ে গেল তোয়াৎ আর গোয়াদ। সিংহের গায়ের সোনালী চামড়াটা শেষ বিকালের সূর্যের আলোয়। চকচক করছিল।
সিংহটা কাছে এসে পড়ায় জিনালদা কোন উপায় না দেখে শুয়ে পড়ল। সিংহটা এসে জিনালদার শায়িত দেহটা শুঁকতে লাগল।
এদিকে জায়েদের নেতৃত্বে টারজনের একশোজন ওয়াজিরি যোদ্ধা উত্তর দিকে আরবদের খোঁজ করে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ এক জায়গায় তারা তিনজনের পায়ের ছাপ দেখতে পায়। তিনজনের পায়ের ছাপের মধ্যে একজন মহিলার চটির ছাপ ছিল। জায়েদ তা দেখে বুঝল ওটা আতিজার চটির ছাপ।
এমন সময় ওরা দু’জন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। লোকদুটো সেই দিকেই আসছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল ফাঁদ। ফাঁদকে চিনতে পেরে তার কাছে ছুটে গিয়ে জায়েদ জিজ্ঞাসা করল, আতিজা কোথায়?
ফাদ ভয় পেয়ে গেল। বলল আমি জানি না।
জায়েদ রেগে গিয়ে তার ছোরাটা ফাঁদের বুকে আমূল বসিয়ে দিল। ফাঁদ সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ল। জায়েদ তখন তার ওয়াজিরি দল নিয়ে আবার উত্তর দিকে চল গেল।
এদিকে টারজান জিনালদার খোঁজ করতে করতে তার গন্ধসূত্র ধরে উত্তর দিক থেকে এসে সেই বনটায় ঢুকল। অবশেষে এক জায়গায় তোয়াতের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় তোয়াতের কাছ থেকে জানল জিনালদাকে একটা সিংহ ধরেছে।
টারজান জিজ্ঞাসা করল, কোথায়?
তোয়াৎ জায়গাটা দেখিয়ে দিলে টারজান সেখানে গিয়ে দেখল একটা মেয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রয়েছে। মরার মত আর তার পাশে একটা সোনালী সিংহ বসে রয়েছে থাবা গেড়ে।
জিনালদা কার পায়ের শব্দ শুনে শুয়ে শুয়েই চোখ মেলে তাকাল।
টারজান সিংহটাকে দেখেই তাকে ডাক দিল, জাদ-বাল-জা, চলে এস এদিকে।
জিনালদা আশ্চর্য হয়ে দেখল এক দৈত্যাকার শ্বেতাঙ্গ মানুষটি ডাক দিতেই সিংহটা তার কাছে পোষা কুকুরের মত ছুটে গেল।
টারজান এবার জিনালদার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, তুমিই রাজকন্যা জিনালদা?
জিনালদা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
টারজান তাকে বলল, তুমি কি আহত? আর ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি তোমার বন্ধু। তোমার সঙ্গীরা কোথায়?
জিনালদা সব ঘটনার কথা বলল একে একে। পরে প্রশ্ন করল, কে তুমি, আমাকে চিনলে কি করে?
টারজান বলল, আমি টারজান জেমন ব্লেকের বন্ধু। সে আর আমি তোমারই খোঁজ করছিলাম।
জিনালদা উৎসাহিত হয়ে বলল, আপনি তার বন্ধু হলে আমারও বন্ধু।
টারজান হাসিমুখে বলল, আমি তোমাদের চিরকালের বন্ধু।
জিনালদা বলল, আচ্ছা স্যার টারজান, আমি বুঝতে পারছি না, সিংহটা আপনার কোন ক্ষতি করল না কেন এবং কেনই বা সে আপনার কথা শুনল।
টারজান বলল, ও হচ্ছে জাদ-বাল-জা বা সোনালী সিংহ। ওকে আমি বাচ্চাবেলা থেকে পালন করেছি। ও মানুষের কাছে বেশি থাকে বলে তোমার কোন ক্ষতি করেনি এবং আমাকে ভালবাসে।
জিনালদা বলল, আপনি কি নিকটেই কোথাও থাকেন?
টারজান বলল, না, আমি অনেক দূরে থাকি। আমার লোকজনরা কাছে কোথাও আছে বলেই সিংহটা তাদের সঙ্গে এসেছে।
সিংহটার কাছে টারজান জিনালদাকে রেখে তার জন্য কিছু ফল নিয়ে এল। জিনালদা তা খেয়ে সুস্থ হলো। তারপর জিনালদার হাঁটার শক্তি না থাকায় তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে নিমুরের পথে রওনা হলো। নগরের বাইরে সেই পাথরের ক্রসটার কাছে জিনালদাকে নামিয়ে দিল টারজান। তারপর জাদ-বাল-জাকে নিয়ে ব্লেকের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
আরবদের খোঁজ করতে করতে ব্লেকও ঢুকে পড়ল বনের মধ্যে। ঘোড়ায় চেপে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে দেখল একটা লোক শুয়ে আছে আর তার পাশে একটা চিতাবাঘ ওৎ পেতে বসে আছে। লোকটা মড়ার মত পড়ে থাকায় সে অপেক্ষা করছে লোকটা নড়লেই তাকে ধরবে।
ঘোড়র উপর থেকেই তার হাতের বর্শাটা চিতাবাঘের গায়ে সজোরে ছুঁড়ে দিল ব্লেক। বাঘটা সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল। ব্লেক তখন ঘোড়া থেকে নেমে লোকটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গিয়ে বলল, একি স্টিম্বল তুমি?
স্টিম্বল বলল, আমি এখন মরতে বসেছি ব্লেক। মৃত্যুর আগে সব কথা বলে যেতে চাই তোমায়। তুমি, এখানে কি করছিলে? নাইটদের মত বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্রই বা পেলে কোথায়?
