সারারাত ধরে ক্রমাগত উত্তর দিকে এগিয়ে চলল ইবন জাত তাদের দলের লোকদের নিয়ে।
শেখ সদলবলে এগিয়ে যেতে থাকল। এক দিকে ধনরত্ন আর এক দিকে এক সুন্দরী যুবতী। শেখের দারুণ ভয় হচ্ছিল। তার কেবলি ভয় হচ্ছিল কোন লুণ্ঠনকারী হয়তো এগুলো লুণ্ঠন করে নিয়ে যাবে। পথ চলার সুবিধার জন্য শেখ ধনরত্নগুলো ভাগ করে কয়েকটা বস্তায় ভরে বিশ্বস্ত কয়েকজন অনুচরের হাতে দিয়ে দেয়। জিনালদার ভার দেয়ে ফাঁদের হাতে। স্টিম্বলের জ্বর হয়েছিল। দুর্বল ও রুগ্ন অবস্থায় পথ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল তার। তবু সে ফাঁদের পাশাপাশি অতি কষ্টে হেঁটে যাচ্ছিল।
পাহাড়টার পাদদেশে এসে আবার ইবন জাদ পূর্ব দিকের একটা পথ ধরল। কারণ সে বাতান্দোদের গায়ের কাছ দিয়ে যেতে চাইছিল না। তাতে নতুন বিপদ দেখা দিতে পারে।
সেদিন রাত্রিতে শিবিরে খুব তাড়াতাড়ি রান্নার কাজটা সারা হয়ে গেল। আতিজা একটু দূর থেকে দেখল ফাঁদ সবার অলক্ষ্যে শেখের খাবারে কি একটা জিনিস ফেলে দিল। তা দেখে সন্দেহ হলো আতিজার। সে ভাবল ফাঁদ হয়ত বিষ মিশিয়ে দিয়েছে তার বাবার খাবারের মধ্যে। তাই যেই খাবার জন্য তার বাবা মুখে তুলতে গেল সে এসে খাবারের থালাটা ছিনিয়ে নিল তার বাবার হাত থেকে। শেখ এর কারণ জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবার ভয়ে ফাঁদ তার বন্দুকটা নিয়ে চলে গেল। সে প্রথমে মেয়েদের তাঁবুতে গিয়ে জিনালদাকে ধরে তাকে টানতে টানতে তার তাবুতে নিয়ে গেল। সেখানে। স্টিম্বলকে ডেকে বলল, শেখ তোমাকে হত্যা করার হুকুম দিয়েছে। বাঁচতে চাও ত এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে পালিয়ে চল।
এদিকে আতিজা যখন শেখকে বলল ফাঁদ তার খাবারে বিষ মিশিয়ে পালিয়ে গেছে তখন শেখ ফাঁদকে ধরে আনার হুকুম দিল। একজন লোক ফাঁদকে ধরার জন্য তার শিবিরের দিকে গিয়ে দেখল, ফাঁদ জিনালদা আর স্টিম্বলকে সঙ্গে করে পালাচ্ছে। তারা তাকে ধরতে গেলে ফাঁদ গুলি করল বন্দুক থেকে। ওদের হাতে তখন অস্ত্র না থাকায় ওরা ফিরে এল। ফলে অবাধে শিবিরের সীমানা ছেড়ে পালিয়ে গেল ফাঁদ।
এদিকে টারজান দক্ষিণ দিকে গিয়ে শেখের আবদেল আজিজের দলটাকে ধরে ফেলল। কিন্তু যখন দেখল তাদের দলে কোন মেয়ে বন্দী নেই তখন সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিকে ফিরে পথ চলতে লাগল।
শেখের দল সেপালকার নগরীর সীমান্তবর্তী পাহাড়টার পূর্ব প্রান্ত থেকে আবার দক্ষিণ দিকে যেতে টারজান তাদের দেখতে পেল। কিন্তু সে দলে স্টিম্বল আর জিলানদাকে দেখতে পেল না।
শেখকে দেখে প্রচণ্ড রাগ হলো টারজনের। শেখ তাকে বরাবর মিথ্যা কথা বলে ঠকিয়ে এসেছে।
টারজান দেখল পাঁচজন লোক বস্তাভরা ধনরত্নগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বোঝাভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ধীর গতিতে পথ হাঁটছিল তারা।
সহসা সবার অলক্ষ্যে একটা বিষাক্ত তীর এসে শেখের পাশে হাঁটতে থাকা একজন মালবাহকের গলাটাকে বিদ্ধ করল ভীষণভাবে। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল লোকটা। শেখরা অবাক হয়ে গেল। কোথাও কোন শত্রুকে দেখতে পেল না ওরা। শুধু পোকামাকড়ের ডাক ছাড়া আর কোন সাড়াশব্দ নেই।
সন্ধ্যা হতে পার্বত্য অরণ্যের মাঝখানেই পথের ধারে এক জায়গায় শিবির স্থাপন করল শেখ। মৃত দেহটাকে পথের উপর ফেলে এসেছে তারা।
এদিকে আতিজার তাঁবুর পিছন দিকের পর্দাটা সরিয়ে সহসা একজন অন্ধকারে ঢুকে একটা হাত তার মুখে আর একটা হাত তার ঘাড়ের উপর দিয়ে কে বলল, কোন শব্দ করো না। চেঁচিও না, আমার কথার উত্তর দাও। তোমার কোন ক্ষতি হবে না।
আতিজা বুঝল, এ নিশ্চয় কোন জিন বা অপদেবতার কাজ।
টারজান বলল, বল ইবন জাদ উপত্যকা হতে যে মেয়েটিকে ধরে এনেছিল সে এখন কোথায়?
আতিজা বলল, ফাঁদ তাকে নিয়ে পালিয়েছে।
টারজান আবার বলল, জায়েদকে যদি বাঁচাতে চাও তাহলে সত্যি কথা বল আমায়। তারা কোথায়?
আতিজা বলল, সত্যি বলছি, গতরাতে মঞ্জিল থেকে তারা পালিয়েছে। এখন কোথায় তা জানি না।
কারাগারের মধ্যে যে দু’জন নগ্নদেহি বন্দী ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল ব্লেক।
সহসা কার পদশব্দ শুনে সচকিত হয়ে উঠল ব্লেক। সঙ্গে সঙ্গে একটা বাতির আলো এগিয়ে আসতে লাগল কারাগারের অন্ধকারে। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্লেক দেখল বাতি হাতে সেখানকার দু’জন নাইট তার সামনে এসে দাঁড়াল। ব্লেক তাদের চিনতে পারল। তারা হলো স্যার গী আর স্যার উইলডারর্ড।
উইলডারর্ড বলল, স্যার গী আর আমি শুনলাম আগামীকাল তোমাকে পুড়িয়ে মারা হবে? আমরা তাই তোমাকে মুক্ত করার জন্য এসেছি। তোমার মত একজন বীর নাইটকে এভাবে হত্যা করলে এখানকার সব নাইটদের সারাজীবন ধরে এক অনপনেয় কলঙ্কের বোঝা বয়ে যেতে হবে।
এই কথা বলেই উইলডারর্ড ব্লেকের হাত পায়ের লোহার শিকলের বাঁধনগুলো খুলে দিল।
ব্লেক বলল, তোমরা আমায় মুক্ত করে দিচ্ছ, একথা বোহান জানতে পারলে তোমাদের প্রাণ যাবে।
উইলডারর্ড বলল, না, জানতে পারবে না। স্যার গী তোমার সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে গিয়ে নগরপ্রান্তে পৌঁছে দিয়ে আসবে তোমায়। সেখান থেকে তুমি নিমুরে চলে যাবে।
স্যার গী এবার ব্লেককে বলল, একটা কথার উত্তর দেবে? তুমি রাজকন্যা জিনালদাকে নিজের হাতে উদ্ধার করেছিলে। কিন্তু আরবরা তাকে কিভাবে ধরে নিয়ে গেল?
ব্লেক তখন যা যা ঘটেছিল সব কথা খুলে বলল তাদের।
