রাত্রিবেলায় শেখ ভাবল এই প্রাসাদের শীর্ষদেশ থেকে সে আজ দেখেছে উপত্যকাটা যেখানে গিয়ে দূরে একটা পাহাড়ের পাদদেশে মিশেছে সেই পাহাড়ের কোলে এই ধরনের আর একটা নগরী আছে। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেলল কাল সকালেই সে সদলবলে যাবে সেখানে।
এদিকে সেদিন রাত্রিতে শেখের শিবির হতে বেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল থেকে ব্লেকের খোঁজ করতে থাকে টারজান।
টারজান নিমুরের উপত্যকায় পাথরের বিরাট ক্রসটার কাছে এসে দু’জন প্রহরীকে দেখে একটা ঝোপের ধারে লুকিয়ে পড়ল। একজন প্রহরীকে সে অতর্কিতে আক্রমণ করে মাটিতে ফেলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তোমরা কোন রাজ্যের লোক? তোমাদের রাজ্যে একজন শ্বেতাঙ্গ এসেছে? আমার কথার যদি ঠিক ঠিক জবাব দাও তাহলে তোমার কোন ক্ষতি করব না।
প্রহরীটি ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে উত্তর করল, আমাদের এই রাজ্যের নাম নিমুর। এখানে কিছুদিন আগে এক শ্বেতাঙ্গ আসে। তার নাম স্যার জেমস ব্লেক।
টারজান বলল, এখন সে কোথায়? কি করছে?
প্রহরী বলল, এখন সে একজন বীর নাইট হয়েছে। আমাদের নিমুরের সম্মান রক্ষার জন্য সে এখন সেখানকার নগরীর সঙ্গে আমাদের যে যুদ্ধ-ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হচ্ছে তাতে অংশগ্রহণ করেছে।
অনুষ্ঠানের মাঠে ওরা পৌঁছে দেখল সেখানে দারুণ গোলমাল চলছে। এইমাত্র বোহান নিমুরের রাজকন্যা জিনালদাকে জোর করে নিয়ে পালিয়ে গেছে। সে যাবার পর সেপালকারের নাইটরাও তার পিছু পিছু পালিয়ে গেছে। একথা জানতে পারার সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকসহ নিমুরের নাইটরাও তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে।
কথাটা শুনে বাট্রাম টারজানকে বলল, যাবে আমার সঙ্গে?
টারজান নীরবে তার ঘোড়াটা বাট্রামের পিছু পিছু ছুটিয়ে দিল।
ব্লেক সোজা গিয়ে যে নাইটটা জিনালদাকে নিয়ে যাচ্ছিল তার পাঁজরে তরবারিটা আমূল বসিয়ে দিল। নাইটটা ঘোড়া থেকে পড়ে যেতেই ব্লেক জিনালদার হাত ধরে তাকে নিজের ঘোড়াটার উপর চাপিয়ে নিল। তখন পাশের অন্য নাইটদুটো ব্লেককে আক্রমণ করতে এলে ব্লেক তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা রিভলবার বার করে গুলি করল পর পর দুটো।
গুলি খেয়ে দুটো নাইটই পড়ে গেল ঘোড়া থেকে এবং তাদের দলের অন্য সব নাইটরা পালিয়ে গেল ব্লেককে ছেড়ে দিয়ে। নিমুরের নাইটরা তখন তাড়া করে নিয়ে যেতে লাগল। এই অবকাশে ব্লেক জিনালদাকে নিয়ে পাশের একটা বনে গিয়ে প্রবেশ করল।
জিনালদা তাকে বলল, সত্যিই তুমি বীর। তুমি যেভাবে আমাকে উদ্ধার করেছ তা কল্পনা করাও যায় না।
ব্লেক তখন সত্যিই বড় ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। সে জিনালদাকে বলল, আমি আজ সকাল থেকে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তুমি আমাদের ঘোড়াটাকে এনে গাছের সঙ্গে বেঁধে দাও।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাই করল জিনালদা। তারপর বনের মধ্যে চারদিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল সে। তার মনে হলো এখনি হয়তো কোন হিংস্র জন্তু বেরিয়ে এসে আক্রমণ করবে তাদের।
জিনালদা এবার ব্লেককে বলল, চল রওনা হওয়া যাক। তোমার এ আগ্নেয়াস্ত্রটা দিয়ে কত জন্তু তুমি মারবে?
এরপর সন্ধ্যা না হতেই বন পথে রওনা হয়ে পড়ল ওরা।
এদিকে ইবন জাদ তার সহচরদের নিয়ে বনের গভীরে এগিয়ে গেল। ওরা পশ্চিম দিক থেকে যেখানে ব্লেক জিনালদাকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে গেল।
শেখ বলল, ওকে এইখানে বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে মেয়েটাকে নিয়ে চলে যাও। ও এখানে মারা গেলে আমাদের কোন দোষী হতে হবে না।
শেখেরা সবাই চলে গেলে ব্লেক হাত পা বাঁধা অবস্থায় সেখানেই পড়ে রইল। সন্ধ্যা হতেই চাঁদ উঠল আকাশে। বনের মধ্যে যে ফাঁকা জায়গাটায় পড়েছিল ব্লেক, সেখানে কিছুটা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা চিতাবাঘ এগিয়ে এল তার দিকে। তার জ্বলন্ত চোখদুটো দেখতে পেল ব্লেক।
কিন্তু চিতাবাঘটা তাকে লক্ষ্য করে একটা লাফ দিতেই ব্লেক দেখল গাছের উপর থেকে একটা মোটা দড়ির ফাঁস এসে তার গলার উপর পড়ল আর তার গলাটা আটকে গেল। বাঘটা শূন্যে ঝুলতে লাগল।
এবার গাছ থেকে এক দৈত্যাকার শ্বেতাঙ্গ নেমে এসে ব্লেকের সামনে দাঁড়াল। তাকে দেখে ব্লেক বিস্ময়ে চীৎকার করে উঠল, টারজান তুমি!
টারজানও বিস্মৃত হয়ে বলল, ব্লেক তুমি! তোমাকে কত খুঁজে চলেছি আমি।
ব্লেকের হাতে পায়ের সব বাঁধন ছুরি দিয়ে কেটে দিল টারজান।
টারজান বলল, কারা তোমায় এভাবে বেঁধে রেখে গেল?
ব্লেক বলল, একদল আরব। একটি মেয়ে আমার কাছে ছিল। তাকে তারা ধরে নিয়ে গেছে।
টারজান প্রশ্ন করল, কখন কোন্ পথে গেছে তারা?
ব্লেক একটা পথ দেখিয়ে বলল, ঘণ্টাখানেক আগে ঐ পথে গেছে তারা।
ওরা দু’জনে সেই পথে কিছুদূর এগিয়ে গেলে টারজান বাতাসে গন্ধসূত্র ধরে বলল, এখান থেকে আরবরা দু’দলে বিভক্ত হয়ে দুদিকে গেছে। একদল গেছে উত্তর দিকে আর একদল গেছে দক্ষিণ দিকে নিমুরের পথে। তবে তুমি যে মেয়ের কথা বলছ তাকে শেখ উত্তর দিকে পাহাড়ের ওপারে নিয়ে গেছে। আমি জানি সেখানেই শেখের মঞ্জিল আছে। অবশ্য এটা আমার অনুমান। তুমি এখন উত্তর দিকে যাও। আমি যাব দক্ষিণ দিকে। আমি তোমার থেকে তাড়াতাড়ি যেতে পারব। আমি দক্ষিণ দিকে তাকে না দেখতে পেলে তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে তোমাকে ধরব। আর তুমি তাকে পেলে দক্ষিণ দিকে আমার কাছে চলে যাবে। এই কথা বলে ব্লেকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল টারজান।
