স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে টারজান বলল, সিজারের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তোমাদেরই একজনকে তো সিজারের দায়িত্বভার বহন করতেই হবে।
একজন চীৎকার করে বলে উঠল, টারজান জিন্দাবাদ! নতুন সিজার জিন্দাবাদ। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের প্রতিটি স্যাঙ্গুইনারিয়াসের মুখে উচ্চারিত হল সেই ধ্বনি।
টারজান হেসে মাথা নেড়ে বলল, না আমি নই। এখানে এমন একজন আছে যার মাথায় আমি এই রাজমুকুট পরিয়ে দিতে চাই; তবে এক শর্তে।
কে সে? আর কি সেই শর্ত?
ডিয়ন সপ্লেন্ডিডাস, বাইরের গ্রাম থেকে যে সব মানুষ এসেছে তাদের চিরতরে মুক্তি দিতে হবে, তাদের পুত্র-কন্যাদের আর কখনও ক্রীতদাস করে রাখা হবে না। অথবা তাদের মল্লবীরদের কখনও জোর করে মলু-ক্ষেত্রে পাঠানো হবে না-এই শর্তে তুমি কি রাজমুকুট পরতে রাজী আছ?
ডিয়ন সপ্লেন্ডিডাস মাথা নুইয়ে সম্মতি জানাল; আর টারজান রাজমুকুট পরিয়ে নতুন সিজারকে অভিষিক্ত করল।
কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াস থেকে ভায়া মেয়ার পথ ধরে পূর্ব দিকে এগিয়ে চলেছে পাঁচ হাজার মানুষ। টারজনের ঠিক পিছনে উড়ছে ওয়াজিরিদের মাথার সাদা পালক। ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাসের নেতৃত্বে চলেছে। দীর্ঘদেহী ভাড়াটে সৈনিকের দল; আর সকলের পিছনে চলেছে দূর গ্রাম থেকে আগত যোদ্ধারা।
গরম ধুলোভর্তি রাস্তা ভায়া মেয়ার ধরে ওয়াজিরিরা পথ চলছে তাদের নিজস্ব রণ-সংগীত গাইতে গাইতে। ভারী শিরস্ত্রাণ বুকের উপর ঝুলিয়ে, লাঠির মাথায় বোঝাঁপত্তার ঝুলিয়ে কাঁধের উপর ফেলে মুখ খিস্তি করতে করতে চলেছে ভাড়াটে সৈনিকরা। আর দূর গ্রাম থেকে আশা যোদ্ধারা হাসি-ঠাট্টা করতে করতে চলেছে একদল বনভোজনকারীর মত।
কাস্ট্রাম মেয়ারের দুর্গের সম্মুখে সেনা সমাবেশ ও যুদ্ধের যন্ত্রপাতি সাজিয়ে বসাতে এত সময় কেটে গেল যে কাজ শেষ হবার পরে ক্যাসিয়াস হাস্টা বুঝতে পারল সেদিন আর দুর্গ আক্রমণ করা সম্ভব হবে না, কারণ ততক্ষণে অন্ধকার নেমে আসবে। তাই আর একটা মতলব মাথায় নিয়ে টারজান, মেটেলাস ও প্রিক্লেরাসকে সঙ্গে নিয়ে সে দুর্গের ফটকের দিকে এগোতে লাগল। তাদের সামনে চলল একদল মশালবাহী ও শান্তির পতাকা হাতে একদল সৈনিক।
বিপক্ষের সৈন্যদের আগমনের সময় থেকেই দুর্গের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ও কর্মচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল। এখন শান্তির পতাকা হাতে একটি দলকে আসতে দেখে দুর্গাধিপতি একটি বুরুজ থেকে তাদের উদ্দেশ্য জানতে চাইল।
ক্যাসিয়াস হাস্টা বলল, শান্তির ব্যাপারে ভালিডাস অগাস্টাসের কাছে আমার দুটি মাত্র দাবী। এক, মালিয়াস লেপাস ও এরিক ভন হারবেনকে মুক্তি দিতে হবে; দুই, আমাকে কাস্ট্রাম মেয়ারে ফিরে যাবার অনুমতি দিতে হবে এবং আমার পদমর্যাদার অনুকূল সবরকম সুযোগ-সুবিধা আমাকে ভোগ করতে দিতে হবে।
কে তুমি?
আমি ক্যাসিয়াস হাস্টা। আমাকে তো তোমার ভাল করেই চেনা উচিত।
দুর্গাধিপতি বলল, ঈশ্বর করুণাময়।
ক্যাসিয়াস জিন্দাবাদ! ফুলবাস ফুপাস মুর্দাবাদ! বহুকণ্ঠ একসঙ্গে গর্জে উঠল।
কয়েকজন ছুটে এসে দুর্গের ফটক খুলে দিল। দুর্গাধিপতি হাস্টার পুরনো বন্ধু। ছুটে বেরিয়ে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
হাস্টা বলল, এ সবের অর্থ কি? কি হয়েছে?
ভালিডাস অগাস্টাসের মৃত্যু হয়েছে। আজই মল্ল-ক্ষেত্রে গুপ্তঘাতকের হাতে সে নিহত হয়েছে। ফুলবাস ফুপাস এখন বসেছে সিজারের আসনে। বড় ভাল সময়ে তুমি এসে পড়েছ। সারা কাস্ট্রাম মেয়ার তোমাকে স্বাগত জানাবে।
দুর্গ থেকে হ্রদের তীর পর্যন্ত এবং ভাসমান সেতু হয়ে দ্বীপ পর্যন্ত এগিয়ে চলল প্রাচ্যের নতুন সম্রাটের বাহিনী। খবরটা ছড়িয়ে পড়ল সারা শহরে। জনসাধারণ উল্লাসে ফেটে পড়ল; ক্যাসিয়াস হাস্টাকে জানাল স্বাগত সম্ভাষণ।
অফিসার বাইরে থেকেই চীৎকার করে বলল, তোমরা সকলেই বেরিয়ে রাজপথে চলে এস। প্রাচ্যের সম্রাট ক্যাসিয়াস হাস্টার এই সব বন্ধুদের গায়ে কেউ হাত তুলো না।
ফেবোনিয়া, ভন হারবেন, লেপাস ও গাবুলা একসঙ্গে পড়-বাড়িটার সিঁড়ি বেয়ে নেমে রাজপথে এসে দাঁড়াল।
মালিয়াস লেপিস বলল, ঐ তো ক্যাসিয়াস হাস্টা। কিন্তু বাকি ওরা সব কারা?
ফেবোনিয়া বলল, ওরা নিশ্চয় স্যাঙ্গুইনারিয়াসের মানুষ। কিন্তু দেখ, ওদের মধ্যে একজনের কেমন বর্বরদের মত পোশাক। আরও দেখ, তার পিছনে যে যোদ্ধারা আসছে তাদের মাথায় পাখির পালক উড়ছে।
মালিয়াস লেপিস বলল, এ রকম দৃশ্য আমি জীবনে কখনও দেখি নি।
ভন হারবেন বলল, আমিও না। তবু ওদের আমি চিনতে পেরেছি। কারণ ওদের খ্যাতি ও বিবরণ আমি হাজার বার পড়েছি।
ওরা কারা? ফেবোনিয়াস শুধাল।
শ্বেতকায় দৈত্যটি হল অরণ্যরাজ টারজান, আর যোদ্ধারা হল তারই ওয়াজিরি সেনাদল।
পুরনো বন্ধুকে আলিঙ্গন করে হাস্টা বলল, ঈশ্বরের জয় হোক! কিন্তু জার্মানিয়ার যে বর্বর দলপতির খ্যাতি কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে গেছে সে কোথায়?
লেপিস বলল, এই তো সে। নাম এরিক ভন হারবেন।
টারজান আরও কাছে এগিয়ে গেল। ইংরেজিতে বলল, তুমিই এরিক ভন হারবেন?
ভন হারবেনও ইংরেজিতে বলল, আর তুমি তো অরণ্যরাজ টারজান, আমি জানি।
টারজান হেসে বলল, তোমাকে দেখাচ্ছে মোল আনা একজন রোমকের মত।
ভন হারবেন মুচকি হেসে বলল, আমি কিন্তু ষোল আনা একজন বর্বর।
