রোমকই হও, আর বর্বরই হও, তোমাকে যখন তোমার বাবার হাতে ফিরিয়ে দেব তখন সে খুব খুশি হবে।
ভন হারবেন শুধাল, অরণ্যরাজ, তুমি কি আমার খোঁজেই এখানে এসেছ?
টারজান বলল, একেবারে ঠিক সময়েই এসে পড়েছি।
কি কলে যে তোমাকে ধন্যবাদ জানাব? ভন হারবেন বলল।
আমাকে নয় বন্ধু, টারজান বলল, ধন্যবাদ জানাও ছোট্ট নকিমাকে।
স্বর্ণ-শহরে টারজান (টারজান এ্যাণ্ড দি সিটি অফ গোল্ড)
বর্ষাকাল শেষ হতে চলেছে; সময়টা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি; কিন্তু নদীতে এখনও অনেক জল, সাম্প্রতিক বর্ষণের ফলে মাটি বেশ নরম।
এরই মধ্যে সুদূর কাফা পর্বতশ্রেণীর বাসিন্দা একটি ছোট দস্যুদল ঘোড়ায় চেপে চলেছে নিঃসঙ্গ পথিক দলবদ্ধ যাত্রী ও গ্রামবাসীদের লুট করার ধান্ধায়।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে একটা শিকারী শিকারকে তাড়া করে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে শিকারীটি মোটেই শিকারী প্রাণীর মত দেখতে নয়, অথচ সে তো শিকারী প্রাণীই বটে; কারণ একমাত্র শিকার ধরেই সে তার পেট ভরায়; আবার একজন বিশিষ্ট ব্রিটিশ লর্ডের যে ছবি আমাদের চোখে। ভাসে সে তার মতও নয়, অথচ সে তো একজন ব্রিটিশ লর্ডই বটে-সে হল বানরদলের টারজান।
দুদিন যাবৎ বৃষ্টি পড়ছে; ফলে টারজান ক্ষুধার্ত। একটা হরিণ-শিশু ঝোপ ঝাড় ও লম্বা নলবনের আড়ালে দাঁড়িয়ে জল খাচ্ছে। আর টারজান হেঁটে এমনভাবে এগিয়ে চলেছে যাতে হরিণটাকে আক্রমণ করতে পারে। সে বুঝতেই পারেনি যে একদল অশ্বারোহী তার পিছনে উঁচু জায়গায় ঘোড়া থামিয়ে। নিঃশব্দে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
সাদা পোশাক পরা দস্যুরা নিচে নামতে লাগল; তাদের হাতে বর্শা ও লম্বা নলের গাদা বন্দুক। তারাও অবাক হয়ে গেছে। এ ধরনের কোন সাদা মানুষকে তারা আগে কখনও দেখে নি।
হরিণটা মাঝে মাঝে মাথা তুলছে। হঠাৎ তার দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য নর-বানরটির উপর পড়তেই সে এক পাক ঘুরে ছুট দিল। সঙ্গে সঙ্গে টারজানও পিছন ফিরে তাকাল; দেখল, আধ ডজন অশ্বারোহী ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে; সে বুঝতে পারল এরা কারা, আর এদের উদ্দেশ্যই বা কি। এরা সব দস্যু, লুণ্ঠন ও হত্যাই এদের একমাত্র কাজ-শত্রু হিসেবে এরা নুমা-র চাইতেও নির্মম।
দস্যুরা যখন বুঝল টারজান তাদের দেখতে পেয়েছে তখন তারা হাতের অস্ত্র ঘোরাতে ঘোরাতে চীৎকার করে জোর কদমে সবেগে তার দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু টারজান না মুখ ফেরাল, না ছুট দিল। সে ভাল করেই জানত যে ছুটে পালিয়ে অশ্বারোহীদের হাত থেকে পার পাওয়া যাবে না। তাই বলে সে যে খুব ভয় পেয়েছে তাও নয়।
দীর্ঘ সুসামঞ্জস দেহ, মাংসপেশী হারকিউলিসের মত নয়, অনেকটা এপোলোর মত; পরনে একটিমাত্র সিংহের চামড়া; পিঠের উপর ঝুলন্ত তীরভর্তি তূণীর ও একটা ছোট হাল্কা বর্শা; কোমরে ঝুলছে বাবার শিকারী ছুরিটা; তার বাঁ হাতে রয়েছে ধনুক, আর আঙুলের মাঝখানে চারটি বাড়তি তীর।
যে মুহূর্তে সে বুঝতে পারল যে পিছন থেকে এগিয়ে আসা অশ্বারোহীদের হাতে তার বিপদের সম্ভাবনা আছে, সঙ্গে সঙ্গেই সে লাফ দিয়ে উঠে ধনুকে টংকার দিল। দস্যুরা আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সচেতন হবার আগেই টারজান ধনুকটাকে বাঁকিয়ে তীর ছুঁড়ল।
প্রথম তীরটি সোজা এসে বিঁধল সামনের সদ্যুটার বুকে; দুই হাত উপরে তুলে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে পড়ে গেল। ততক্ষণে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এল আরও চারটি তীর; কোনটিই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল না। মাটিতে ছিটকে পড়ল আরও এক দস্যু; তিনজন আহত হল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চার অশ্বারোহী এসে তাকে ঘিরে ফেলল। আহত তিনজন নিজেদের শরীর থেকে পালকওয়ালা তীর টেনে তুলতেই ব্যস্ত, কিন্তু চতুর্থ অনাহত দস্যুটি বর্শা উঁচিয়ে সশব্দে টারজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
টারজানও ধনুকের ছিলাটাকে গলা থেকে খুলে নিয়ে সেটা দিয়ে প্রাণপণ শক্তিতে আঘাত করল শত্রুর বর্শার হাতলে; তারপর লোকটির হাত চেপে ধরে এক লাফে তারই ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল।
মুহূর্তকাল পরেই টারজান ঘোড়ার পিঠে চেপে নদী পেরিয়ে ওপারের শক্ত মাটিতে পা দিল। এবার সে নিরাপদ। ওপারের ক্রুব্ধ দস্যুদের লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়ল। তীরটা গিয়ে বিধল আহত দস্যুটার উরুতে।
বনের মধ্যে ঢুকবার পরেই মাথার উপরকার একটা গাছের ডাল ঝুলে পড়ে টারজান ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিল। সে খুব রেগে গেছে; দস্যুরা এসে পড়ায় তার মুখের খাবার হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন আবার নতুন করে তাকে খাবার খুঁজতে হবে। তাই সে অন্য জীবের খোঁজ করতে করতে অচিরেই তা। পেয়ে গেল এবং ভোজন পর্ব সমাধা করল।
এবার বেশ হৃষ্ট চিত্তে টারজান নদীর দিকেই ফিরে চলল। নদীটা পার হয়ে দস্যুদের পথটাই ধরল। তাদের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া করতেই হবে।
টারজান যখন বনের প্রান্তে পৌঁছে গেল একটা সিংহ তখন তার দক্ষিণে সামান্য দূরে এগিয়ে চলেছে। তাই টারজান গাছে চড়ে ডাল থেকে ডালে চলে নিঃশব্দে দস্যুদের শিবিরের দিকে এগিয়ে চলল।
টারজান শিবিরের ঠিক মাথার উপরকার একটা গাছে পৌঁছে গেল। নিচে জনাবিশেক লোক এবং তাদের ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র দেখতে পেল। বন্য জন্তুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য ডালপালা ও ঝোপঝাড় দিয়ে একটা বেড়ামতন তৈরি করা হয়েছে।
এবার চকিতে চোখ বুলিয়েই টারজান নিচেকার সব কিছু ভাল করে দেখে নিল; কিন্তু তার সাগ্রহ দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ হল একটি জিনিসের উপর; অগ্নিকুণ্ডের কিছু দূরেই একটি সাদা মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে মনে হচ্ছে এতকাল যত সাদা মানুষ সে দেখেছে তাদের চাইতে এই বন্দী সাদা মানুষটি স্বতন্ত্র। গোড়ালি, কব্জি, গলা ও মাথার অলংকার ছাড়া তার সারা দেহের একমাত্র আচ্ছাদন হাতির দাঁতের গোলাকার চাকতি পর পর সাজিতে তৈরি একরকম গ্রীবা ও বক্ষস্ত্রাণ। এ ছাড়া তার দুই বাহু ও দুই পা সম্পূর্ণ উলফঙ্গ।
