সে সোপানে পা রাখল; কিন্তু ফাস্টাসের মত পুরোহিতের কাছে না থেমে সে সোজা উপরে উঠে গেল। সাবলেটাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, রোমের নাগরিক হিসেবে আমি আবেদন রাখছি সিজারের কাছে।
সিজার বলল, বেশ, বল তুমি কি অনুগ্রহ চাও?
আমি কোন অনুগ্রহ চাই না; আমি দাবী করছি আমার অধিকার। ফাস্টাসের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার আগে ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাসকে আমি এইখানে জীবিত ও মুক্ত দেখতে চাই। তুমি তো ভালই জান যে সেই শর্তেই আমি এ বিয়েতে রাজী হয়েছি।
সিজার সক্রোধে উঠে দাঁড়াল। বলল, তা হতে পারে না।
দরবার-কক্ষের এক পাশের অলিন্দ থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠস্বর, হ্যাঁ, নিশ্চয় হতে পারে, কারণ আমার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস।
সকলেরই দৃষ্টি পড়ল অলিন্দের দিকে। এক সঙ্গে অনেকে বলে উঠল, সেই বর্বর লোকটা! ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাস!
অলিন্দ থেকে এক লাফে একটা উঁচু স্তম্ভকে আঁকড়ে ধরে টারজান দ্রুত নেমে গেল মেঝের উপর। তার পিছন পিছন নেমে এল ছ’টি লোমশ গোরিলা।
সিজার চীৎকার করে ডাকল, রক্ষী! রক্ষী!
টারজান ও ছ’টি গোরিলা ধেয়ে গেল সিংহাসনের দিকে। রক্ষীদের হাতে ঝলসে উঠল দশ-বারখানা তরবারি। মেয়েরা আর্তনাদ করে মূৰ্ছা গেল। ভয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় সিজার স্বর্ণ-সিংহাসনে এলিয়ে পড়ল। ফাস্টাস আর্তনাদ করে পালিয়ে গেল। এক লাফে টারজান হাজির হল ডিলেক্টার পাশে। গোরিলারা সিঁড়ি বেয়ে সিংহাসনের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সিজার লুটিয়ে পড়ল তার মহত্ব ও শক্তির প্রতীক সিংহাসনেরই পিছনে।
ওদিকে ভায়া প্রিন্সিপ্যাসিস-এর উপর প্রচণ্ড ঢেউয়ের মত একের পর এক আছড়ে পড়ছে ক্রুদ্ধ জনতার দল। ফটক ভেঙ্গে তারা ভিতরে ঢুকে পড়েছে। তাদের পায়ের নিচে অনেক রক্ষী চাপা পড়ে মরল।
এমন সময় পোর্টা ডেকুকামার দিক থেকে অনেক দূরে শোনা গেল ভেরীর আওয়াজ। সকলে আনন্দে উল্লাস-ধ্বনী করে উঠল। নিশ্চয় গ্রাম থেকে যোদ্ধার দল এসে পড়েছে তাদের সাহায্য করতে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা তা নয়। বল্লম ও তারবারি উঁচিয়ে ধেয়ে এল সম্রাটের সৈন্যদল। ভীতত্রস্ত জনতা ছুটে পালাতে শুরু করল। আর দুর্ধর্ষ সেনাদল রক্তাক্ত তরবারি ও জ্বলন্ত মশাল হাতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল।
দুই পক্ষের রণ-কোলাহলকে ছাপিয়ে বাগানের দূর প্রান্ত থেকে ভেসে এল এক বর্বর চীৎকার। সে চীৎকার উভয় পক্ষের সেনানীদেরই ক্ষণতরে স্তব্ধ করে দিল। টারজান সাগ্রহে মাথা তুলে তাকাল। বাতাসের গন্ধ শুঁকতে লাগল। পরিচয়, আশা, বিস্ময়, অবিশ্বাস- সব যেন এক সঙ্গে তার বুকের মধ্যে। উত্তাল হয়ে উঠল।
সে বর্বর চীৎকার বাড়তে বাড়তে ক্রমে সিজারের বাগানে ঢুকে পড়ল। সম্রাটের ভাড়াটে সৈনিকরা মুখ তুলে দেখল, একটি বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে একদল বীর যোদ্ধা। তাদের মাথার চামড়ার শিরস্ত্রাণে উড়ছে। পাখির পালক, তাদের কণ্ঠেই ধ্বনিত হচ্ছে এই ভয়ংকর রণ-গর্জন-ওয়াজিরিয়া এসে পড়েছে।
টারজান দেখল, সকলের সামনে রয়েছে মুভিরো; তার পাশে লুকেডি। কিন্তু সেই মুহূর্তে টারজনের বা সেখানে সমবেত অন্য কারও নজরে না পড়লেও সেই ওয়াজিরি বাহিনীর সঙ্গেই ছিল কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের নানা গ্রাম থেকে আসা সেই সব যোদ্ধার দল যারা দীর্ঘকালব্যাপী অবিচারের প্রতিহিংসা নিতে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে ছুটে এসেছে সিজারের রাজপ্রাসাদকে লক্ষ্য করে।
শেষ পর্যন্ত সম্রাটের সেনাদল অস্ত্র ত্যাগ করে টারজনের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করল। মুভিরো ছুটে এসে টারজনের সামনে নতজানু হয়ে তার হাতে চুমু খেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছোট বানর ঝুলন্ত ডাল থেকে লাফিয়ে নেমে এল টারজনের কাঁধে।
মুভিরো বলল, ওয়াজিরিদের প্রতি পূর্বপুরুষের অনেক কৃপা না থাকলে আমরা ঠিক সময়ে এসে পৌঁছেতে পারতাম না।
টারজান বলল, নকিমাকে না দেখা পর্যন্ত আমিও তো বুঝতে পারিনি আমার সন্ধান তোমরা কেমন করে পেলে।
মুভিরো বলল, হ্যাঁ, সবই নকিমার কৃতিত্ব। সেই তো ওয়াজিরিদের দেশে গিয়ে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। তাই তো আজ বড় বাওয়ানাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দেশে ফিরে যেতে পারব।
টারজান মাথা নেড়ে বলল, না, আমি তো এখন যেতে পারব না। আমার বন্ধুর ছেলে এখনও এই উপত্যকায় আছে। তোমাদের সকলের সাহায্যে এবার আমি তাকে উদ্ধার করতে পারব।
এই সময় প্রিক্লেরাস এসে বলল, বন্ধু টারজান, গ্রাম থেকে যে সব লোক এসে রাজপ্রাসাদে ঢুকেছে তারা নির্বিচারে সকলকে খুন করছে, লুট চালাচ্ছে। তাদের তো বাধা দিতে হবে। এ সব থামাতে হবে।
টারজান বলল, নিশ্চয় থামাতে হবে। সৈন্য পাঠিয়ে সাবলেটাস ও ফাস্টাসকে এখানে নিয়ে এস।
কিন্তু যাদের পাঠানো হল তারা ফিরে এসে জানাল, সাবলেটাস মারা গেছে, ফাস্টাসও মারা গেছে। দরবার-কক্ষে ও অলিন্দ-পথে সেনেটর, রাজপুরুষ ও অফিসারদের মৃতদেহ স্থূপীকৃত হয়ে আছে।
বিষণ্ণ মুখে প্রিক্লেরাস শুধাল, কেউ কি বেঁচে নেই?
একজন বলল, আছে। কিছু লোক একটা ঘরে আত্মগোপন করেছিল। শুধু তারাই বেঁচে আছে। তাদের আমরা সব কথা জানিয়েছি। তারা এখনই এসে পড়বে।
অলিন্দ-পথে ঘরে এসে ঢুকল সদলে ডিয়ন সপ্লেন্ডিডাস। তাকে দেখেই ডিলেক্টা আনন্দে চীৎকার করে উঠে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
