সকলেই একবাক্যে টারজনের নেতৃত্বকে মেনে নিল।
টারজান বলল, আমরা সকলে হয়তো জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে যেতে পারব না, কিন্তু যারা পারবে তারা অবশ্যই সিজারের অবিচারের প্রতিশোধ নেবে।
জনৈক যোদ্ধা বলল, তুমি ন্যায় করেছ কি অন্যায় করেছ জানি না; আমরা বাঁচব কি মরব তাও বুঝি না; শুধু বুঝি লড়াই–যুদ্ধ।
টারজান বলল, যুদ্ধ তোমরা পাবে–প্রচুর যুদ্ধ।
তাহলে আমাদের পরিচালনা কর।
টারজান বলল, কিন্তু তার আগে আমার বাকি বন্ধুদের মুক্তি দিতে হবে।
প্রিক্লেরাস বলল, সব সেল আমরা খালি করে দিয়েছি; আর কেউ কোথাও নেই।
আছে বন্ধু আছে, টারজান বলল; এখনও বাকি আছে আমার গোরিলা বন্ধুরা।
কাস্ট্রাম মেয়ারে ভালিডাস অগাস্টাসের কারাগারে এরিক ভন হারবেন ও মালিয়াস লেপাস সুদিনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু সুদিন কি আসবে?
লেপাস বিষণ্ণ গলায় বলল, মৃত্যু ছাড়া আর কিই বা আমরা আশা করতে পারি। আমাদের বন্ধুরা, ক্ষমতাচ্যুত, কারাগারে বন্দী, না হয় নির্বাসিত।
আর সব দোষ আমার, ভন হারবেন বলল।
নিজেকে অকারণে দোষী করো না। ফেবোনিয়া তোমাকে ভালবেসেছে সেটা তো তোমার অপরাধ নয়। আসল অপরাধী কুচক্রী ফুপাস।
ভন হারবেন তবু বলতে লাগল। আমার ভালবাসাই ফেবোনিয়ার বিপদ ডেকে এনেছে, তার বন্ধুদের বিপন্ন করেছে। আর আমি এখানে পাথরের দেয়ালে শিকলে বন্দী হয়ে আছি। কিছুই করতে পারছি না।
লেপাস বলে উঠল, আহা, এ সময় ক্যাসিয়াস হাস্টা যদি এখানে থাকত! একটা মানুষের মত মানুষ। সিজার পোষ্যপুত্র নিয়েছে ফুপাসকে। এ পরিস্থিতিতে হাস্টার নেতৃত্ব পেলে গোটা শহর ভালিডাস অগাস্টাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত।
সেই সময়ে উপত্যকার অপর প্রান্তে কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াস শহরে সাবুলেটাসের দরবার-কক্ষে নিয়ন্ত্রিত লোকেরা একে একে জড় হতে শুরু করেছে, কারণ সেই সন্ধ্যায়ই সিজার-পুত্র ফাস্টাসের বিয়ে হবে ডিয়ন সপ্লেন্ডিডাসের কন্যার সঙ্গে।
রাজপথে, এমন কি রাজপ্রাসাদের ফটকের ভিতরেও প্রচণ্ড ভিড় জমে গেছে। ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি, হৈ-হল্লার শেষ নেই। জনতার চোখে-মুখে প্রচণ্ড ক্রোধ। আর সে ক্রোধ প্রকাশের মন্ত্র-অত্যাচারীর পতন হোক! সাব্লেটাস মুর্দাবাদ! ফাস্টাস মুর্দাবাদ!।
ওদিকে প্রাসাদের উপরের ঘরে ক্রীতদাসী-পরিবৃত হয়ে বসে আছে বিয়ের কনে, মা তাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
ডিলেক্টা বলছে, তা হবে না; কিছুতেই আমি ফাস্টাসের স্ত্রী হব না। ঘাঘরার নিচে দৃঢ়মুষ্টিতে সে ধরে আছে একটা সরু চুরির হাতল।
কলোসিয়ামের নিচেকার বারান্দায় টারজান তার সেনা-সমাবেশ নিয়ে ব্যস্ত। লুকেডি ও সহবন্দী জনৈক গ্রাম-প্রধানকে ডেকে বলল, তোমরা পোর্টা প্রিটোরিয়াতে চলে যাও। সেখানে এপ্পিয়াস। এপ্লোসাসকে বলবে, ম্যাক্সিমাস প্রিক্লেরাসের খাতিরে তোমাদের যেন শহর থেকে বেরিয়ে যেতে দেয়া হয়। তারপর গ্রামে গ্রামে গিয়ে যোদ্ধা সংগ্রহ করবে। তাদের বলবে, তারা যদি সিজারের উপর প্রতিশোধ নিতে চায়, যদি চায় স্বাধীন মুক্ত জীবন, তাহলে তাদের অবিলম্বে শহরে এসে এখানকার বিদ্রোহী নাগরিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অত্যাচারিকে ধ্বংস করতে হবে। তাড়াতাড়ি চলে যাও; সময় বড়ই অল্প। সকলকে সঙ্গে নিয়ে পোর্টা প্রিটোরিয়ার পথে শহরে ঢুকে সোজা চলে যাবে। সিজারের প্রাসাদে।
***
দলে দলে লোক আসতে লাগল। বাইরের গ্রাম থেকে অর্ধ-নগ্ন যোদ্ধার দল, শহরের ক্রীতদাসের দল আর সমাজচ্যুত মানুষের দল যাদের মধ্যে আছে খুনী, চোর ও পেশাদার মল্লযোদ্ধা। সকলের আগে আগে চলেছে প্রিক্লেরাস, হাস্টা, মেটেলাস ও টারজান। টারজানকে ঘিয়ে চলেছে গাইয়াট, জুঠো, গো ইয়াড ও অন্য গোরিলারা।
প্রশস্ত রাজপথ ভায়া প্রিন্সিপ্যালিস বড় বড় সব গাছে ঢাকা থাকায় রাতের অন্ধকারে একটা সুড়ঙ্গের রূপ নিয়েছে। সেই পথে কয়েকজন মশালধারীর পিছন পিছন টারজান প্রাসাদের দিকে এগিয়ে চলল অনুগামীদের নিয়ে।
ফটকে শাস্ত্রী চেঁচিয়ে বলল, কে আসে?
আমি অরণ্যরাজ টারজান।
সমবেত জনতা এক কণ্ঠে তার জয়ধ্বনি করে উঠল।
কেন তোমরা এখানে এসেছ? কি চাও?
আমরা এসেছি ফাস্টাসের হাত থেকে ডিলেক্টাকে উদ্ধার করতে, আর কাস্ট্রা স্যাঙ্গুইনারিয়াসের সিংহাসন থেকে অত্যাচারিকে টেনে নামিয়ে নিতে।
হাজার কণ্ঠ এই ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়ে বলল, অত্যাচারী মুর্দাবাদ! প্রাসাদ-রক্ষী মুর্দাবাদ! তাদের হত্যা কর- হত্যা কর!
জনতা দৃঢ়পদক্ষেপে প্রাসাদ-ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
সংবাদ-বাহক ছুটে গেল দরবার-কক্ষে সিজারের কাছে। ভাঙা গলায় বলল, জনতা বিদ্রোহ করেছে। সেনাদল, মল্লযোদ্ধা ও ক্রীতদাসরা তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তারা ফটকের উপর ভিড় করছে। ফটক ভেঙ্গে পড়বে।
তখন সিজারের দরবার-কক্ষের সোপান শ্রেণীতে চলেছে ফাস্টাস ও ডিলেক্টার বিয়ের আয়োজন। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত দাঁড়িয়ে আছে সমবেত দর্শকদের দিকে মুখ করে। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ফাস্টাস। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল বিয়ের কনে। সঙ্গে প্রদীব হাতে কুমারী সখীর দল। ডিলেক্টার মুখখানি ম্লান, কিন্তু পদক্ষেপ ধীর অথচ দৃঢ়। তাকে দেখাচ্ছে সম্রাজ্ঞীর মত। কিন্তু কনের পোশাকের নিচে তার ডান হাতে যে ধরা আছে একখানি সুতীক্ষ ছুরিকা সেটা কেউ দেখতে পেল না।
